দৃষ্টিহীনতা কোনো বাধা নয়, সেই সূবর্ণা ভর্তি হলেন রাবিতে

ঢাকা, বুধবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২,   ১৪ আশ্বিন ১৪২৯,   ০১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

Beximco LPG Gas

দৃষ্টিহীনতা কোনো বাধা নয়, সেই সূবর্ণা ভর্তি হলেন রাবিতে

আশিক ইসলাম, রাবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩৬ ৭ মার্চ ২০২২  

মায়ের সঙ্গে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সুবর্ণা রানী দাস। -ফাইল ছবি

মায়ের সঙ্গে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সুবর্ণা রানী দাস। -ফাইল ছবি

জন্ম থেকে দুটি চোখ তার অন্ধ। দেখতে পান না পৃথিবীর বর্ণিল রঙ। চোখে আলো না থাকলেও দেখেছেন আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন। ইস্পাত কঠিন মনোবল, অদম্য উৎসাহ, প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর একনিষ্ঠতা, তার কাছে কোনো প্রতিবন্ধকতা বাধা হতে পারেনি। তার সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে দৃষ্টিহীনতা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ভর্তি যুদ্ধে জয়ী হয়ে জায়গা করে নিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বলছিলাম ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সূবর্ণা রাণী দাসের কথা। সব প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে জায়গা করে নিয়েছেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে।

গত বছরের ৫ অক্টোবর রাবিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসেন সূবর্ণা। সে সময় ডেইলি বাংলাদেশ ‘দমে যাননি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সুবর্ণা, ভর্তি পরীক্ষা দিলেন রাবিতে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। সেই সংবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের প্রতিবন্ধকতার কথা বলেন সূবর্ণা।

আজ সোমবার আবারো এই প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ সূবর্ণার। জানালেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পেছনের গল্প, ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা। সুবর্ণার সফলতার পিছনের গল্পটি শুনান নিজের মুখেই। তিনি বলেন, আমি জীবনের সঙ্গে য্দ্ধু করেই এ পর্যন্ত এসেছি। কারণ আমার যখন দুইমাস বয়স তখন আমার বাবা সুবাস দাস মারা যায়। তারপর থেকে আমার মা কণিকা রানী দাস দুঃখ, কষ্ট আর দৈন্যতার সঙ্গে লড়াই করে মানুষের বাসায় কাজ করে, কাঁথা সেলাই এবং হাঁস-মুরগী পালনসহ বিভিন্নভাবে আমার পড়াশোনার খরচ যুগিয়েছেন।

সুবর্ণা বলেন, আমার বাড়ি ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ি জেলায়। বাড়িতে আমি, মা এবং আমার নানু থাকতেন। বাড়ি থেকে আমার স্কুল ছিল অনেক দূরে। প্রায় এক থেকে দেড়শ টাকা ভাড়া লাগত যাতায়াতের জন্য। কিন্তু আমার ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল যে আমি ভবিষ্যতে অনেক বড় কিছু করব। তাই যেটুকু গাড়িতে না গেলেই নয় সেটুকু ব্যতিত বাকি পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে গেছি। আমার মা অনেক কষ্ট করে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আমাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন।

ভবিষ্যতে ম্যাজিস্ট্রেট হতে চায় সুবর্ণা। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আমি একজন ম্যাজিস্ট্রেট অথবা একজন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষিকা হতে চাই। আর আমার এ স্বপ্ন পূরণে রাবি প্রশাসন যদি আমার মতো প্রতিবন্ধীদের পড়াশোনার ফি মৌকুফ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য অ্যাকাডেমিক ভবনগুলোতে লিফটের ব্যবস্থা করেন তাহলে আমাদের জন্য সুবিধা হতো।

সুবর্ণা আরো বলেন, অনার্স লেভেলে আমাদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে কোনো বই নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি এ ব্যাপারে সরকারের কাছে আমাদের হয়ে ব্রেইল পদ্ধতিতে বই তৈরির দাবি জানায় তাহলে আমরা দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা উপকৃত হবো। পাশাপাশি অর্থাভাবে মেসে অবস্থান করা আমার পক্ষে কষ্টকর, এক্ষেত্রে দ্রুত হল পেলে উপকৃত হতাম।

সুন্দর এই পৃথিবীকে আবারও দুচোখ ভরে দেখতে চায় সুবর্ণা। সুবর্ণা বলেন, আমি জন্মান্ধ ছিলাম না। তবে আমার দুচোখে সমস্যা ছিলো। আমি যখন কথা বলতেই শিখিনি তখন রাজধানীর ইসলামীয়া হাসপাতালে আমার বামচোখে অপারেশন করা হয়। তখন ডাক্তার বলেছিল এটি ভালো হয়ে যাবে কিন্তু ভালো না হয়ে সেটি আরো খারাপ হয়ে গেছে। পরবর্তীতে যখন একটু বড় হলাম তখন ডানচোখেও অপারেশনের জন্য তারা প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু আমি এ পথ থেকে সরে দাঁড়াই।

সুবর্ণা জানায়, বর্তমানে তার ডানচোখটিও প্রায় নষ্ট। দিন রাতের পার্থক্য নিরূপন আর সামনে কোনোকিছু থাকলে সেটি অনুভব করতে পারেন তিনি। তবে উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে পৃথিবীকে দুচোখ ভরে দেখতে পাবেন বলে আশাবাদী সুবর্ণা। এজন্য সমাজের বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

সুবর্ণার বিষয়ে ভিসি অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, সুবর্ণা যদি তার দাবিগুলো লিখিত আকারে সরাসরি আমাকে জানায় তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হবে। তার চাহিদাগুলো পূরণ করা যাবে ইনশাল্লাহ। ব্রেইল পদ্ধতি সংযোজনের বিষয়টি আমি অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে উত্থাপন করব। তার আর্থিক বিষয়গুলো সহ অন্যান্য বিষয়ে খেয়াল রাখবো।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম

English HighlightsREAD MORE »