যেখানে হাসির মহামারি ছিল করোনার মতোই

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২,   ১২ আশ্বিন ১৪২৯,   ২৯ সফর ১৪৪৪

Beximco LPG Gas

যেখানে হাসির মহামারি ছিল করোনার মতোই

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:১৪ ২৫ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ১১:১৫ ২৫ ডিসেম্বর ২০২১

হাসির মহামারি। ছবি : সংগৃহীত

হাসির মহামারি। ছবি : সংগৃহীত

পৃথিবীজুড়ে অস্থিরতা। জীবনে যেন হাসির জন্য একটু সময় বের করা খুব কঠিন। সময়ের চক্করে পড়ে আমরা হাসতে ভুলে যাচ্ছি। এসব কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠছে লাফিং ক্লাব। হাসলে যেমন মন ভালো থাকে, তেমনি হাসিতে আটকে থাকে বেঁচে থাকার রসদ। তাইতো ‘প্রভাত সংগীত’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন,
 

“মেঘেতে হাসি জড়ায়ে যায়
বাতাসে হাসি গড়ায়ে যায়
ঊষার হাসি, ফুলের হাসি
কানন মাঝে ছড়ায়ে যায়
হৃদয় মোর আকাশে উঠে
ঊষার মতো হাসিতে চায়”।

কিন্তু হাসি যে মারাত্মক রোগ হতে পারে,তার ইতিহাস কি আমরা জানি? মহামারি যে শুধু রোগ থেকে হয় এমনটা নয়। হাসি থেকেও মহামারি সৃষ্টি হতে পারে-এটা হয়ত অনেকেরই অজানা।

সম্পতি বিশ্বের মানুষ দেখেছে কোভিড পরিস্থিতি। দেশে দেশে ছিল কড়া লকডাউন। করোনা মহামারিতে কার্যত স্তব্ধ ছিল গোটা বিশ্ব। ১৯৬২ সালে এমনই এক মহামারির সাক্ষী ছিল উগান্ডার সীমান্তে অবস্থিত তানজানিয়ার কাশাশা গ্রাম। সে মহামারি ছিল হাসির মহামারি। হাসির রোগে আক্রান্ত হয়ে ওঠে মানুষ। সেই সুন্দর হাসিগুলো ছিল রোগের হাসি। হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরা যাকে বলে, তেমনই অবস্থা হয়েছিল সেখানকার শিশুদের। কাশাশা গ্রাম যেন হেসেই খুন। হাসি হয়ে গিয়েছিল অসুখ। যার চিকিৎসা করানো ছিল অসম্ভব।

হাসির মহামারি। ছবি : সংগৃহীত

তখন সদ্য স্বাধীনতার স্বাদ পায় তানজানিয়া। স্বাধীনতা মানে নিজেকে উজার করে দেওয়া দেশের সংগ্রামে। একইসঙ্গে মুক্তির আনন্দে আনন্দিত থাকবে দেশের সমগ্র মানুষ। এমন হওয়ার কথা থাকলেও সেবার সেই দেশে এর ফল হয়েছিল উল্টো। দেশের শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক অস্থিরতা বেড়ে যায়। স্বাধীনতার পর দেশের ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ কী হবে,কেমন কেরে তারা লেখাপড়া করবে সে বিষয়ে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল পরিবার এবং ছেলে-মেয়েদের ওপর। ওইটুকু বয়সেই তারা বুঝতে পেরেছিল খাদ্য, পোশাক, বাসস্থানের সংকট। তার ফলস্বরূপ মাথা বিগড়ে গিয়েছিল অনেকের। কান্না নয়, হাসিই হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেখানকার অন্যতম বড় রোগ।

এ প্রসঙ্গে আরো একটা মত রয়েছে গবেষকদের। গবেষকরা মনে করেন, দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের প্রতি আশা-প্রত্যাশা বেড়ে যায় শিক্ষক এবং অভিভাবকদের। সেই চাপ পড়েছিল স্কুলের বাচ্চাদের ওপর। এর ফলও হয়েছিল ভয়ানক।

হাসির মহামারি। ছবি : সংগৃহীত

গত কয়েকটি বছরে আমরা সবাই পরিচিত হয়ে উঠেছি অতিমারি, মহামারি, লকডাউন, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন, শারীরিক দূরত্ব এই জাতীয় শব্দগুলির সঙ্গে। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগেই এই শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল উগান্ডার একাংশ। এমন হাসি, যে থামাতে পারছিলেন না কেউই। সামনের জনকে হাসতে দেখে উপস্থিত সবাই হাসতে শুরু করছিলেন। এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা হাসি থামানো যায়নি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই মহামারিটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়েছিল ‘টানগানইকা লাফটার এপিডেমিক’ নামে। কারণ তানজানিয়ার আগে নাম ছিল টানগানইকা। সে সময় জাঞ্জিবারের সঙ্গে যুক্ত ছিল এই দেশ। পরে স্বাধীন হয়।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ১৯৬২ সালের ৩১ জানুয়ারি কাশাশার একটি বোর্ডিং স্কুলের তিন ছাত্রীর মধ্যে প্রথম এই সংক্রমণ দেখা যায়। বিনা কারণে তারা হাসতে শুরু করেন। তাদের থেকে দ্রুত স্কুলের বাকি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সংক্রমণ। স্কুলের মোট ৯৫ জন শিক্ষার্থী, যাদের গড় বয়স ১২ থেকে ২০ বছর। সবাই সংক্রামিত হয়ে পড়েন এই রোগে। তবে রোগ ছড়ায়নি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে। শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। কাশাশা থেকে রোগ ছড়িয়ে পড়ে নসাম্বা নামে একটি গ্রামে। মোটামুটি চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যেই ২১৭ জন আক্রান্ত হন। দীর্ঘ বন্ধের পর মে মাসে ফের স্কুল চালু হয়। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হওয়ায় আবারও স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিনের মধ্যে বুকোবা নামের আরো একটি গ্রাম সংক্রমণটি ছড়িয়ে পড়ে। এইভাবে আক্রান্ত হয় মোট ১৪টি স্কুলের শিশুরা।

হাসির মহামারি। ছবি : সংগৃহীত

রোগের উপসর্গ ছিল টানা ১৬ দিন হাসতে থাকা। সেইসঙ্গে ত্বকে র্যা শ, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া, হাসতে হাসতে কঁকিয়ে কেঁদে ওঠা ইত্যাদি। প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় হাসি রোগে আক্রান্ত ছিল দেশের অধিকাংশ গ্রাম।

আনন্দে সামান্য কেউ হেসে উঠলেই পাশের মানুষটি সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করতেন। ফলে হাসি হয়ে গিয়েছিল কান্নার দোসর। যদিও বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে এমন রোগ আর কখনো দেখা যায়নি।

সে যাই হোক, অবশ্যই আমরা হাসি থামাব না। এমন বিক্ষিপ্ত উদাহরণে আমরা বিচলিত হব না। বরং কঠিন সময়ে একে অপরের পাশে থেকে জানিয়ে দেব হাসিই জীবন। একটা হাসিমুখের সমার্থক হয়ে উঠবে হাজার হাজার হাসিমুখ। তাইত চার্লি চ্যাপলিন বলেছিলেন, ‘যদি তুমি হাসতে পারো, তবেই বুঝবে তোমার জীবন সার্থক। কারণ হাসিই আমাদের প্রেমে পড়তে শেখায়, লড়তে শেখায়, বাঁচতে শেখায়।’

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি

English HighlightsREAD MORE »