শিক্ষকদের চোখে শ্রমিকের দিনকাল

ঢাকা, সোমবার   ২৩ মে ২০২২,   ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,   ২১ শাওয়াল ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

শিক্ষকদের চোখে শ্রমিকের দিনকাল

মো. আবুল কালাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:২৯ ১ মে ২০২২   আপডেট: ১৩:৩১ ১ মে ২০২২

মতামত প্রদানকারী ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষকবৃন্দ। ছবি: সংগৃহীত

মতামত প্রদানকারী ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষকবৃন্দ। ছবি: সংগৃহীত

আজ পয়লা মে। মহান শ্রমিক দিবস৷ ১৮৮৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। 

বাংলাদেশেও এ দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়৷ তবে, স্বাধীনতার ৫১ বছরে এসেও এখনো হরহামেশাই শোনা যায় শ্রমিকদের আর্তনাদের কথা৷ বেতন-বোনাসের দাবিতে রাস্তা অবরোধের কথা। বাংলাদেশের শ্রমিদের জীবনমান, নারী কর্মীদের সুরক্ষা, বেতন-ভাতাসহ নানাবিধ সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির চারজন শিক্ষক৷ তাদের মুখোমুখি হয়েছেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. আবুল কালাম৷ 

শ্রমিকদের জীবন আরো উন্নত হোক 
প্রফেসর সাজ্জাদ হোসেন
সাবেক বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি 


ইতোমধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছে। এটা অবশ্যই আমাদের গৌরব এবং ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিকতা। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি শ্রমিকদের জীবনমান অতীতের তুলনায় বর্তমানে অনেক উন্নত হয়েছে। তবুও শ্রমিকদের আরো উন্নত জীবন প্রয়োজন। শ্রমিকরা সামাজে নিষ্পেষিত, অবহেলিত, নির্যাতিত এবং তারা যথাযথভাবে তাদের শ্রমের মূল্যায়ন পায় না।  

বাংলাদেশের অনেক মেধাবীরা বিদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন পেতে। বাংলাদেশকে এখনই ভাবতে হবে, শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা- সম্মান করা। অতীতের চেয়ে বর্তমানে শ্রমিকদের মূল্যায়ন কোনো অংশেই কম না। গ্রামে-গঞ্জে বর্তমানে কাজের মূল্যায়ন অনেক বেশি। আগে যেখানে শ্রমিক দুই কেজি চাল কিনতে পারতেন, একদিন শ্রমের বিনিময়ে সেখানে বর্তমানের শ্রমিকরা ১০ কেজি চাল কিনতে পারে। 

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ যেন এগিয়ে যেতে পারে। তাই শ্রমিকদের মান উন্নয়ন ও মর্যাদা রক্ষায় কাজ করতে হবে। শ্রমিকরা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে। কাজে কোনো শ্রমিক যদি অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনাজনিত কারণে আহত বা নিহত হয়, সেক্ষেত্রে যে মূল্যায়ন করা হয় সেটা খুবই নগণ্য। 

আহত বা নিহতের পরিবারকে এমনভাবে সাহায্য করা প্রয়োজন, যাতে তার পরিবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। এই বিষয়ে মালিকপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। যাতে করে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন এবং শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা হয়। 


শ্রমিকদের বেতন ভাতার আরো সচ্ছতা আনতে হবে
জামশেদুর রহমান 
সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

বাংলাদেশে বেসরকারি যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে, বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পের ওপর সরকারি হস্তক্ষেপ এবং তদারকি প্রয়োজন। তারা তাদের ইচ্ছেমতো বেতন বোনাস দিচ্ছে। আবার অনেক সময় শ্রমিকদের ন্যয্য পাওনা আটকে দিচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিশেষভাবে নজর দিতে হবে, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকরা যেন সঠিক সময়ে তাদের মজুরি থেকে বঞ্চিত না হয়। 

বাংলাদেশের অর্থনীতি শ্রমবান্ধব হওয়া প্রয়োজন, যাতে করে শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা হয়। আমি দেখেছি, বাংলাদেশের অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক যদি কোনো অসুবিধার কারণে কাজ না করতে পারে, তাহলে তাকে নিয়ম অমান্য করে চাকরি থেকে অব্যহতি দিয়েছে। অনিবার্য কারণবশত কোনো কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা অন্যায়। এটা মানবিক দিক দিয়েও ঠিক না। 

এছাড়াও বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী বেসরকারি চাকরির ওপর নির্ভরশীল। তাই, বেসরকারি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে আলাদা মন্ত্রণালয় বা বোর্ড গঠন করে সুনির্দিষ্ট নজরদারির উদ্যোগ নিতে হবে। 

যদি কোনো শ্রমিক কার্যকালে প্রাণহানি ঘটে বা অঙ্গহানি ঘটে তাহলে হয়তো তার অঙ্গ ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। কিন্তু তাকে যদি অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করা এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে যদি কেউ কাজ করার সামর্থ্য থাকে তবে তার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠান যদি এসব পরিবারের ভরণ-পোষণ করে তাহলে মানুষ বেঁচে থাকার সুন্দর একটি উপায় পাবে। শ্রমিকরা যাতে তাদের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

শিশুশ্রম মারাত্মকভাবে ভাবিয়ে তুলছে 
আনিসুর রহমান 
সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

বর্তমান সময়ে যে কয়েকটা সমস্যা পুরো বিশ্বকে মারাত্মকভাবে ভাবাচ্ছে, তার মধ্যে শিশুশ্রম অন্যতম। গবেষণায় দেখা যায়, পৃথিবীর প্রতি ছয়জন শিশুর মধ্যে একজন শিশুশ্রমিক। 

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা সুনিশ্চিত করা, ২৮ (৪) অনুচ্ছেদে অনগ্রসর শিশুদের অনুকূলে বিশেষ আইন প্রণয়ন করা, ৩৪ (১) অনুচ্ছেদে সব প্রকার জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ ও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। এছাড়াও জাতীয় শিশু নীতি- ২০১১ অনুযায়ী ৫ থেকে ১৮ বছরের শিশুকে দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো যাবে না এবং ৫ থেকে ১৪ বছরের শিশুকে কর্মে নিয়োগ দেওয়াকে দন্ডনীয় অপরাধ বলে উল্লেখ রয়েছে। 

শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন সুস্পষ্ট আইন ও নীতিমালা থাকলেও, তার বাস্তবায়ন খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। শিশুশ্রম রোধ তথা নিরসন করার জন্য এসব আইন ও নীতিমালার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। এ ছাড়াও, অঞ্চল ভিত্তিক শিশুশ্রমের কারণ চিহ্নিতকরণ সাপেক্ষে বিভিন্ন পূর্নবাসন প্রকল্প গ্রহণ, প্রয়োজন অনুযায়ী শিশু ভাতা প্রদান, স্বল্প, মধ্য, ও দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ, গণমাধ্যমে শিশুশ্রম রোধে সচেতনতা প্রচার, এবং শিশুশ্রম নিয়োগকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিশুশ্রম নিরসনে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। 

সর্বোপরি, শ্রম থেকে শিশুদের মুক্তি দিয়ে আলোকিত উন্নত আগামী বাংলাদেশ গড়ার জন্য সব শ্রেণির মানুষের ঐক্যবদ্ধ আকুন্ঠ সমর্থন ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা আবশ্যক।

আইনের যথাযথ কার্যকর করতে হবে
রাবেয়া সরকার 
সহকারী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

যদি কোনো নারী কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, সেক্ষেত্রে সেই প্রতিষ্ঠানকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। যৌন হয়রানি থেকে বাঁচার জন্য প্রতিষ্ঠানে মনিটরিং ব্যবস্থা বৃদ্ধি করা এবং কাউন্সিলিং এর বিশেষ প্রয়োজন। যেহেতু বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে শতকরা ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক কাজ করেন। অন্যসব প্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষ কম-বেশি থাকলেও গার্মেন্টস শিল্পে নারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গার্মেন্টস শিল্পকে কেন্দ্র করে কাউন্সিলিং বিশেষ জরুরি। কারণ, আমাদের যদি মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটে তাহলে কোনোভাবেই এই নির্যাতন থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। 

যদি কাউন্সিলিং এর মধ্যে দিয়ে মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে তাহলে নারীর কার্যক্ষেত্রে এবং কার্যক্ষেত্রের বাহিরেও অনেক অংশে যৌন নিপীড়ন কমে আসবে। যদি কোনো নারী বাহিরের লোক দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয় তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। 

যখন কোনো নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হন তখন মেয়েরা অনেক অংশেই চুপ করে থাকে। তারা কোথায় অভিযোগ করবে সেটাও তাদের কাছে পরিষ্কার না। নারীদের নিয়ে কাজ করে এমন সব বেসরকারি সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি সংস্থার সাহায্যে পুলিশকে জানানো এবং পুলিশ যদি যথাযথ গুরুত্ব সহকারে এবং সততার সঙ্গে বিষয়গুলো দেখে তাহলে অনেক অংশেই নারীদের উপর যৌন নিপীড়ন কমে আসবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি

English HighlightsREAD MORE »