শিক্ষা ও গবেষণায় এগিয়ে যাচ্ছে অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ 

ঢাকা, সোমবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১৩ ১৪২৮,   ১৮ সফর ১৪৪৩

নোবিপ্রবি

শিক্ষা ও গবেষণায় এগিয়ে যাচ্ছে অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ 

নোবিপ্রবি প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৯ ১১ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৩:৩৫ ১৯ জুলাই ২০২১

করোনা ল্যাবের ফোকাল পয়েন্টের দায়িত্ব রয়েছেন অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ

করোনা ল্যাবের ফোকাল পয়েন্টের দায়িত্ব রয়েছেন অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ

দেশে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে করোনা পরীক্ষার ল্যাব চালু করেছিলো নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি)। ভিসি অধ্যাপক ড. দিদারুল আলমের নেতৃত্বে এই ল্যাবের দায়িত্বে রয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা। 

এ পর্যন্ত মোট ৪০ হাজারেরও বেশি নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার দশটি উপজেলার মানুষকে সেবা দিয়ে আসছে। এই করোনা ল্যাবের ফোকাল পয়েন্টের দায়িত্ব রয়েছেন অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ। ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গে এসব নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন তিনি।

মহামারির মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও কিভাবে যাত্রা শুরু হয়েছিল নোবিপ্রবি করোনা ল্যাবের? 

ড. ফিরোজ আহমেদ: বাংলাদেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ে গত বছরের মার্চ মাসে। এরপর সারাদেশে লকডাউন দিয়ে দেয়া হলো। নোয়াখালীস্থ আব্দুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজের পক্ষ থেকে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের আরটিপিসিআর মেশিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। তখন আমাদের ভিসি, কোষাধ্যক্ষ এবং অধ্যাপক ড. নেওয়াজ বাহাদুর আমাকে করোনা টেস্ট করার সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চান। এরইমধ্যে বিভাগের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে আরটিপিসিআর টেস্টিং সহায়তা করতে চলে গেছেন। বিভাগের শিক্ষক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট শরিফুল ইসলাম ও আমিনুলের সঙ্গে কথা বলে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে করোনা পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেই। পরে ভিসি অধ্যাপক ড. দিদারুল আলম ও অধ্যাপক ড. নেওয়াজ বাহাদুরের প্রচেষ্টায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় থেকে অনুমতিপত্র বের করা হয়। আমাদের ল্যাবরেটরিতে একটু দেরিতে অর্থাৎ ২০২০ সালের মাঝামাঝি থেকে করোনা পরীক্ষা শুরু হয়। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ল্যাব প্রতিষ্ঠায় কি কি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন আপনারা? 

ড. ফিরোজ আহমেদ: করোনা টেস্টিং ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে। সরকারের অনুমতি পেতে বড় ধরনের বাধা সামলাতে হয়েছে। এরপর মাত্র সাতদিনের মধ্যে সব প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও মেশিনের ব্যবস্থা করা ও টেস্টিং উপযোগী নেগেটিভ ও পজিটিভ প্রেসার সুবিধাদিসহ ল্যাবরেটরি প্রস্তুত করা বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল। এতোকিছুর পর ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদফতরে টেস্টিং কিট ও আনুষাঙ্গিক সরঞ্জামাদি আনার জন্য নিজে গিয়েছিলাম। সেখানে অতিরিক্ত মহাপরিচালক জানিয়েছিলো মেডিকেল কলেজ ছাড়া অন্যদের টেস্টিং করার ব্যাপারে নানা ধরনের পক্ষ থেকে আপত্তি আছে। আমি তাদেরকে জনস্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে ল্যাবরেটরি প্রস্তুতকরণ, যন্ত্রাংশের ব্যবস্থা করাসহ সামগ্রিক বিষয়টি বুঝিয়ে বলার পর কেবলমাত্র টেস্টিং কিট পেয়েছিলাম। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মাধ্যমে করোনা টেস্টিং কিট ও আনুষাঙ্গিক সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ল্যাবরেটরি পরিচালনার সব ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। এরইমধ্যে তিনবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন করোনা টেস্টিং ল্যাবরেটরির বাজেট চেয়ে পত্র প্রদান করেছে এবং আমরা যথাযথ ভাবে তা প্রেরণ করেছি। যতদূর জানি এখনও পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পক্ষ থেকে আর্থিক বরাদ্দ আসেনি। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগে প্রতিষ্ঠিত এই ল্যাব পরিচালনায় বিভাগের ভূমিকা কতখানি বলে মনে করেন? 

ড. ফিরোজ আহমেদ: অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগ পরিবারের শতভাগ সমর্থন ছাড়া করোনা টেস্টিং ল্যাবরেটরি প্রস্তুত করা সম্ভব হতো না। বিভাগের শিক্ষার্থীদের সেমিনার লাইব্রেরিতে করোনা টেস্টিং ল্যাবরেটরি করা হয়েছে। করোনাভাইরাসটি অতি সংক্রমণশীল হওয়ার বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে ল্যাবরেটরি প্রস্তুত করার কার্যক্রমে সমর্থন দেয়াসহ সার্বক্ষণিক তদারকিতে নিয়োজিত আছে। 

করোনাকালের স্থবিরতায় আপনাদের বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা কি? 

ড. ফিরোজ আহমেদ: মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম করোনা মহামারিকালেও স্বাভাবিকভাবে চলছে। প্রথমত, বিভাগের সব ব্যাচের ক্লাস অনলাইনে নেয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিভাগে করোনা টেস্টিং ল্যাবরেটরিসহ নিজস্ব গবেষণাগার চালু আছে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে তাদের গবেষণা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করতে পারছে। 

আপনাদের অর্জন কতটুকু? নোবিপ্রবিতে করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে আপনাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি? 

ড. ফিরোজ আহমেদ: অনেকেই এরইমধ্যে জেনে গেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বাংলাদেশের বর্জ্য পানিতে করোনার উপস্থিতি সর্বপ্রথম আবিষ্কার করে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল একত্রে দেশের সাতটি বিভাগের ষোলটি জেলায় এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনার বিস্তৃতি, ধরণ ও বর্জ্য পানিতে করোনার পরিমান নির্ণয় করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা নির্ধারণ বিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সাম্প্রতি করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে মানুষের শরীরে নানাবিধ প্রভাব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও ফার্মেসি বিভাগ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের সমন্বয়ে একটি গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। করোনার এই দুর্দিনে আমাদের ল্যাবে ২০০০ বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে বিতরণ করা হয়েছে নোয়াখালীর মানুষের মাঝে। ল্যাব থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছি আমরা। বিভাগের শিক্ষকরা করোনা রোগীদের থেকে প্রাপ্ত নমুনা বিশ্লেষণপূর্বক রোগতত্ত্ব ও রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কিত বেশ কিছু গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেছে। আমাদের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। 

করোনা মোকাবিলায় এই মুহূর্তে সরকার ও জনসাধারণের কি কি করণীয় বলে আপনি মনে করেন? 

ড. ফিরোজ আহমেদঃ এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জনসাধারণকে করোনা দুর্যোগ মহামারি থেকে রক্ষা করতে সবাইকে ভ্যাকসিসের আওতায় আনতে হবে। ভ্যাকসিন প্রয়োগ কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জনগণকে অবশ্যই সাংগঠনিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে হবে। ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সাবধানতার কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে সরকার ও জনসাধারণকে দুর্যোগকালীন সময়ে সহনশীলতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম/জেএস