যুক্তরাষ্ট্রের আই-গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর ও সিইও বাংলাদে

ঢাকা, শনিবার   ৩১ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১৭ ১৪২৮,   ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

যুক্তরাষ্ট্রের আই-গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর ও সিইও হলেন বাংলাদেশি আবুবকর হানিপ

নিজস্ব প্রতিবেদক  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৩০ ২৩ মে ২০২১   আপডেট: ১৯:৩৫ ২৩ মে ২০২১

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় বসবাসরত ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ - ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় বসবাসরত ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ - ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় বসবাসরত ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপকে বলা হয় ‘ম্যাজিক ম্যান’। তার প্রতিষ্ঠিত পিপল এন টেক-এর মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীকে আমেরিকায় মিড লেবেল এবং সিনিয়র লেবেলের চাকরি দিয়েছেন। অড জব কিংবা এন্ট্রি লেবেলের জব থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এবার তিনি দায়িত্ব নিলেন আই-গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির। 

জানা গেছে, এটি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমির মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানোর স্বপ্ন দেখছেন আবুবকর হানিপ। ডেইলি বাংলাদেশকে জানালেন তার পরিকল্পনা ও চিন্তার কথা। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাজেদা হক।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনাকে কেন ম্যাজিকম্যান বলা হয়?

আবুবকর হানিপ: আমি চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি (চুয়েট) থেকে ইউএসএতে গিয়েছি ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে। তারপরও আমাকে ইউএসএতে অড জব করতে হয়েছে। সপ্তাহে ছয় দিন, ঘণ্টায় মাত্র ৫ ডলার, আমার কাছে মনে হলো আমি কেন এই কাজ করতে আসলাম। তখন বুঝলাম দক্ষতা বাড়াতে হবে। ভর্তি হলাম কম্পিউটার সায়েন্সে। আবার মাস্টার্স করলাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চাকরি পেলাম না। তারপর প্রায় ৬ মাস স্কিল ডেভেলপমেন্টের উপরে ট্রেনিং নিয়ে ৭৫ হাজার ইউএস ডলার এর একটা চাকরি পেলাম। তখন আমি ভেবে দেখলাম যে, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলেই হবে না। সঙ্গে থাকতে হবে দক্ষতাও। 

কিভাবে আমেরিকার মেইন স্ট্রিম আইটি জবে বাংলাদেশিদের নিয়ে আসা যায় সেই চিন্তা থেকেই আমি আমার সব পরিচিতদের মধ্যে কথা বলা শুরু করলাম যে, অড জব করার চেয়ে একটু দক্ষতা অর্জন করে চাকরি নেয়া ভালো। সবাইকে বললাম কিন্তু সাড়া দিলো একজন। তার একটা ট্যাক্সি ওয়ার্কশপ ছিলো, দক্ষতা বাড়লে নতুন যে চাকরিতে জয়েন করলেন তার বেতন আমার চেয়েও বেশি হয়ে গেলো। এভাবে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকলো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। প্রায় তিন শতাধিক বাংলাদেশিকে পর্যায়ক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করলাম। তখন প্রতিষ্ঠিত হলো পিপলএনটেক। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী আমেরিকাতে ভালো চাকরি করছে, তার মধ্যে ছয় হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি। 

অন্যদের অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য এই সফল চাকরিজীবীদের নিয়ে মাঝে মাঝেই আমি অনুষ্ঠান করতাম। সেসব অনুষ্ঠানে বেশিরভাগ সময়ই প্রধান অতিথি হতেন বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি উপস্থিত চাকরিজীবীদের মুখে তাদের সফলতার কাহিনী শুনতেন এবং এই সফলতার পেছনে পিপল এন টেকের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে জানতেন। মাত্র চার মাস, ১৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ নিয়ে বছরে ২০-৩০ হাজার ডলার আয় করা নন-টেকনিক্যাল মানুষেরা যখন ১০০ হাজারেরও বেশি বেতনের চাকরি করছেন শোনে, এটা শুনে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। পিপলএনটেকের এই কাজটিকে তিনি ম্যাজিক্যাল কাজ মনে করেন। তার এই বিস্ময় থেকেই তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলতে শুরু করেন যে, আমি একজন ম্যাজিকম্যান। সেই থেকেই কেবল বাংলাদেশীদের কাছেই নয় এখানকার অনেকের কাছেই আমি একজন ম্যাজিকম্যান হিসেবে পরিচিত। 

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় বসবাসরত ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ - ফাইল ছবি

ডেইলি বাংলাদেশ: পিপলএনটেক এর মাধ্যমে তাহলে আপনি দক্ষতা বাড়ানোর কাজ করছেন? আগ্রহীরা আপনাদের কিভাবে খুঁজে পায়?

আবুবকর হানিপ: বেশ কয়েকভাবেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব। প্রথমত: যারা সাধারণ ডিগ্রি নিয়ে আমেরিকা যান, তাদের কোনো না কোনো জব করতেই হয়। সেই জবে হয়তো প্রতি ঘণ্টায় আয় হয় ১০-১৫ ডলার অর্থাৎ বছরে ২০-৩০ হাজার ডলার। কিন্তু ওরাই যখন আমার প্রতিষ্ঠানে চার মাসের কোর্স (সপ্তাহে দুইদিন) করে তখন তারা যে চাকরিতে যোগ দেয় তখন তার আয় বছরে দাঁড়ায় ১০০ হাজার ইউএস ডলার এর উপরে। 

আমাদের এই সাফল্যের কথা আসলে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ একজন এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে ভালো কাজে যোগ দিলো, তখন সে আরেকজনকে বলল, সে আরেকজনকে-এভাবেই ছড়ায়। এছাড়া ওয়েবসাইট www.peoplentech.com-এর মাধ্যমেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।  

ডেইলি বাংলাদেশ: কি ধরণের প্রশিক্ষণ আপনারা দেন?

আবুবকর হানিপ: যাদের আইটি সম্পর্কে কোনো ধারণাই নাই কিংবা বেসিক লেবেল অব কম্পিউটিং যদি কারো জানা থাকে, ইংরেজি মোটামুটি বলতে পারে, তাদেরকে আমরা সফটওয়ার টেস্টিং বা কোয়ালিটি এস্যুরেন্সের উপর ট্রেনিং দেই। এর পরে আছে ডাটাবেইজ এডমিনিস্ট্রেশন, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট প্রফেশনাল, ড্যাব অপস, এডব্লিউএসসহ আরো অনেক কোর্স যেগুলো টেকনিক্যালি ডিমান্ডেবল।  

ডেইলি বাংলাদেশ: সফটস্কিল নিয়েও কি আপনারা কাজ করছেন?

আবুবকর হানিপ: ইউনিভার্সিটি থেকে যখন কেউ পাশ করে সে তখন একটা ডিগ্রি নেয় যার মাধ্যমে সে শুধুই একাডেমিক নলেজ অর্জন করে।  কিন্তু জব করতে গেলে ইন্ডাস্ট্রি নলেজ দরকার পড়ে, প্রয়োজন হয় সফট স্কিলের, জব স্কিল এবং কনফিডেন্সের। সেই সঙ্গে কর্পোরেট ইনভায়রনমেন্টে কিভাবে কাজ করবে সেসব বিষয়ে তার জানা দরকার। পিপলএনটেক এসব বিষয় মাথায় রেখেই তাদের ট্রেনিং প্যাকেজটা রেডি করেছে। এমনভাবে প্রশিক্ষণগুলো ডিজাইন করা হয়, যে প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেকেই মিড লেবেল বা সিনিয়র লেবেলে চাকরি করার দক্ষতা অর্জন করে। পিপলএনটেকের ১৫ বছরের অর্জিত অভিজ্ঞতায় তৈরি এই স্কিল ডেভেলপমেন্টের স্ট্র্যাটেজি সম্পূর্ণরূপে আই-গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিতে সংযুক্ত করা হয়েছে।  

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় বসবাসরত ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ - ফাইল ছবি

ডেইলি বাংলাদেশ: কি চিন্তা করে ইউএসএতে বাংলাদেশি মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেন?

আবুবকর হানিপ: প্রথমত, সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি নিয়ে এন্ট্রি লেবেলের জব খোঁজে। এর মধ্যেই ওইসব শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে ৫০ থেকে ১০০ হাজার ডলারের উপরে স্টুডেন্ট লোন থাকে । এই লোন ঘাড়ে নিয়েও যখন তারা এন্ট্রি লেবেলের জবও পায় না, তখন তারা হতাশ হয়ে পড়ে। 

দ্বিতীয়ত, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে এন্ট্রি লেবেলে নিয়োগ দেয়ার পর অন্তত ৬ মাস থেকে এক বছর কাজ শেখাতে হয়। কাজটা শেখা হয়ে গেলেই ভালো বেতনের আশায় ওই কর্মস্থল পরিবর্তন করে অনেকেই। ফলে এন্ট্রি লেবেলে যে প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়ে কাজ শেখালো, সে প্রতিষ্ঠান তার রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI) ফেরত পায় না। প্রতিষ্ঠানগুলো তখন এন্ট্রি লেবেলে নিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এ কারণে বর্তমানে এন্ট্রি লেবেলে লোক নিয়োগের হার অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো।  

তৃতীয়ত, প্রতি বছর আমেরিকাতে এমপ্লয়মেন্ট বেইজড (এইচ১বি) ভিসা দেয়া হয় ৮৫ হাজার।  যার মধ্যে ৬৫ হাজার ভিসাই হলো ন্যূনতম ব্যাচেলর ডিগ্রিধারীদের। বাকীগুলো সেখানকার স্থানীয় মাস্টার্স ডিগ্রিধারীরা পেয়ে থাকেন। অপরদিকে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাশ করা গ্রীনকার্ডধারী এবং সিটিজেনেরা হন্যে হয়ে এন্ট্রি লেবেলের জব খুঁজে বেড়ান। তার মানে হলো আমেরিকান মার্কেটে প্রচুর জব রয়েছে কিন্তু স্কিলড ওয়ার্কারের অভাব। ফলে আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে এইচ১বি ভিসার ওপর নির্ভর করতে হয়। এই নির্ভরশীলতা কমানোর জন্যই ইউনিভার্সিটিগুলোতে ডিগ্রির পাশাপাশি স্কিলড ডেভলপমেন্ট করা দরকার। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই আমার এই আই-গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির উদ্যোগ নেয়া। 

যাতে ডিগ্রির পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা দক্ষতা অর্জন করে অন্তত মিড লেবেলের চাকরি করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। মূলত, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমির মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটা আন্তর্জাতিক মডেল তৈরি করাই আমার উদ্দেশ্য। 

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনি কিভাবে এই ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমির মেলবন্ধন ঘটাবেন?

আবুবকর হানিপ: আইটি কিন্তু পরিবর্তনশীল। কিন্তু বেশিরভাগ সময় দেখা যায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কারিকুলাম যুগোপযোগী করে না। আমরা ঠিক করেছি, সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় যে কারিকুলাম দেয়া আছে তা তো থাকবেই, সেই সঙ্গে নতুন নতুন শিক্ষাও যাতে যুক্ত করা যায় কারিকুলামে সেই সুযোগও রাখা হয়েছে। কেউ যদি চার বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রি কোর্সে ভর্তি হন, শুরু থেকেই যদি নেটওয়ার্কিং, ডাটাবেইজ, সফটওয়ার এর বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করবে। শেষ বছরে সেই শিক্ষার্থীকে আমরা সেই শিক্ষার্থীর আগ্রহের ওপরে SME অর্থাৎ সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট বানাবো। শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ের উপর বেশি দক্ষতা অর্জন করতে চায়, তাদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ: বাংলাদেশকে নিয়ে আপনার চিন্তা কি?

আবুবকর হানিপ: আপনি জানেন যে, বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১৫৭টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তাদের সবার সঙ্গে কাজ করতে চাই। মডেলটা শেয়ার করতে চাই, যাতে তারা চাইলে ফলো করতে পারে। বাংলাদেশের শিক্ষা কারিকুলামে পাশ করার পর বিসিএস দেয় প্রায় সকলেই। আর এই বিসিএস দিয়েই অনেক ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যাচ্ছেন পুলিশ, অনেক ডাক্তার হয়ে যাচ্ছেন প্রশাসক।ফরেন কোটায় ঢুকে ডিপ্লোম্যাট হয়ে যাচ্ছেন আনেকেই। মানে বলতে চাচ্ছি, ট্র্যাকটা চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। অথচ সরকার অনেক টাকা ভর্তুকি দিয়ে তাদের শিক্ষিত করছে কিন্তু সে মোতাবেক উপযুক্ত দক্ষ প্রফেশনাল পাচ্ছে না। এখানেই একটা বিরাট গ্যাপ তৈরি হচ্ছে, এই গ্যাপটা নিয়ে কাজ করতে চাই। 

আরেকটা বিষয় হলো আমাদের দেশের মেধাবী শিক্ষকরা যদি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে এফিলিয়েটেড হয়ে ইন্ডাস্ট্রির রিক্রয়ারমেন্ট জেনে ক্লাসরুম সেটিংয়ে রিয়েল লাইফ প্রজেক্ট ওরিয়েন্টেড ওয়েতে হাতে কলমে শিক্ষা দেয় তাহলে শিক্ষার্থীরা রিয়েল শিক্ষায় শিক্ষিত হবে এবং তারা শুধুমাত্র বিসিএস দিয়ে অন্য পেশায় যেতে চাইবেন না। আই-গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি এই বিষয়টি নিয়েও কাজ করতে চায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ/এমকেএ