নিজেকে ভালোবাসো, দাগের চেয়ে জীবন সুন্দর: মনীষা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৩ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৮,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

নিজেকে ভালোবাসো, দাগের চেয়ে জীবন সুন্দর: মনীষা

ফিচার প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:০১ ৮ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৭:০২ ৮ মার্চ ২০২১

মনীষা পৈলান। ছবি: সংগৃহীত

মনীষা পৈলান। ছবি: সংগৃহীত

অ্যাসিড ভিকটিম মনীষা পৈলানকে চেনেন না, এরকম মানুষ খুব কমই আছেন। হয়তো নাম জানেন না অনেকে, কিন্তু চেহারা চেনেন। মনীষা নিজের অদম্য সাহস আর জেদের জেরে সমাজের মূলস্রোতে জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন হেরে যাওয়া লোকেদের ক্ষমা-ঘৃণা করেও দুর্দান্তভাবে বাঁচা যায়। কারণ জীবন অনেক বিস্তৃত। সেই বিস্তৃত জীবনে ঘরের কোণে চুপ করে বসে থাকলে বা গুমরে গুমরে কাঁদলে চলবে না। চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। তবেই বিপর্যয়ে অন্য ভিক্টিমদের পাশে দাঁড়াতে পারবেন এরকম হাজার হাজার মনীষারা।

মনীষা পৈলান থাকেন কলকাতায়। বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরে। ২০১৫ সালে অ্যাসিড হামলার শিকার হতে হয় তাকে। তারপরের গল্পটা শুধু যন্ত্রণার ইতিহাস হতে পারত, কিন্তু মনীষা অন্য ধাতুতে গড়া ছিলেন। কলকাতা এসে নিজের মতো বাঁচতে শুরু করেন। মনীষার ফেসবুক প্রোফাইলের বায়ো-তে লেখা আছে, ‘পুড়ছি আমরা সবাই। কারও মুখে দাগ তো কারও অন্তরে। তাও নিজেকে ভালোবেসে দেখো দাগের চেয়ে জীবন সুন্দর।’

হাসপাতালের দিনগুলোর শেষে, একাধিক প্লাস্টিক সার্জারি পেরিয়ে একসময় দিনের আলোয় বেরিয়ে এসেছেন তিনি। ওড়নায় মুখ ঢেকে নয়, বরং সদর্পে। সোশাল মিডিয়া হয়ে উঠেছে তার লড়াইয়ের অন্যতম হাতিয়ার। বলছেন, ‘আমি প্রথম থেকেই ভেবে নিয়েছিলাম, মুখ ঢাকব না।’

মনীষা পৈলানের দুই জীবন। ছবি: সংগৃহীত

হার না মানা মনীষা ডেইলি বাংলাদেশ-এর কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দিলেন ই-মেইলে। জানালেন নিজের কথা, নারীদের কথা এবং সমাজের কথা। পাঠকদের জন্য চুম্বকাংশ তুলে ধরা হলো-

ডেইলি বাংলাদেশ: কেমন আছেন?

মনীষা পৈলান: ভালো আছি। কিছুদিন আগেই একটা অপারেশন ছিল। আসলে শারীরিক কাঁটাছেঁড়া সেরে যায়। কিন্তু মানসিক যন্ত্রণাটা সারবো কীভাবে?এটা কাটিয়ে ওঠা খুবই কঠিন। কখনও কখনও অসাধ্য বটে!

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনার জার্নিটা নিয়ে অনেক সাক্ষাৎকারে বলেছেন। পাঠকরাও জানে, আপনার পুরো পৃথিবীটাই বদলে গেছে। আপনার মুখে বদলে যাওয়ার গল্পটা শুনতে চাই-

মনীষা পৈলান: ২০১৫ সালের ১৭ নভেম্বর আমার পৃথিবীটাই বদলে গেছে। শুধু আমাকে একা নয়, আমার পরিবার-বন্ধু-কাছের মানুষরাও লড়াই করেছে। আমি বাঁচবো কি-না সে চিন্তায় ছিল ডাক্তাররা। তবে আমার মা আশাবাদী ছিলেন, আমার সাহস জুগিয়েছেন।

এই যে বললেন আমার পুরো পৃথিবীটাই বদলে গেছে, এটা চিরন্তন সত্য। আমি ছোটবেলায় খুবই সাহসী ছিলাম। কিন্তু গ্রামের মেয়ে হওয়ায় কিছু কথা চেপে রাখার একটা বিষয় ছিল।অনেকদিনই তো চুপ থেকে এলাম, কিন্তু এখন কেন চুপ থাকবো। যা হারানোর হারিয়েছি; আমি এখন যা, তা নিয়েই এগিয়ে যাব।

পুড়ছি আমরা সবাই। কারও মুখে দাগ তো কারও অন্তরে। তাও নিজেকে ভালোবেসে দেখো দাগের চেয়ে জীবন সুন্দর।

ডেইলি বাংলাদেশ: এসিড নিক্ষেপকারীরা এখন কোথায়?

মনীষা পৈলান: ওরা সাতজন ছিল। আমার পাশের বাড়ির ছেলেটা ঘটনার দেড় মাস পর ধরা পড়েছে। সেলিম দুইবছর পর ধরা পড়ে। একমাত্র সেলিমকে দেখতে পেয়েছিলাম। আর কাউকে চিনতে পারিনি। কিন্তু সে একমাসের মধ্যে ছাড়াও পেয়ে যায়। শুনেছি, সে নাকি আবার এখন বিয়ে করেছে, সংসার করছে। বাকিরাও বাইরে। আমিই হারালাম, তারা এখন মুক্ত।

দিল্লির লক্ষ্মী আগরওয়ালকে নিয়ে ‘ছপক’ সিনেমা নির্মিত হয়, যেটির মূল চরিত্রে ছিলেন দীপিকা পাড়ুকোন। ছবি: সংগৃহীত

ডেইলি বাংলাদেশ: অ্যাসিড হামলার শিকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরাই হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাই কি এর জন্য দায়ী?

মনীষা পৈলান: শুধুমাত্র যে ছেলেদের মধ্যেই পুরুষতন্ত্র আছে এমনটা নয়, প্রচুর মেয়েদের মধ্যেও আছে। প্রচুর মেয়েও কিন্তু এই নোংরা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। খোলা বাজারে অ্যাসিড বিক্রি, সাজা না পাওয়া, আইনের গাফিলতি এগুলো এমন একটা জায়গায় চলে গেছে, যা দেখলে বোঝা যায় মানুষের বিকৃতি কোনো জায়গায় পৌঁছেছে।

ডেইলি বাংলাদেশ: এসব নিয়ে সামাজিক কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে?

মনীষা পৈলান: ভারতীয় স্টপ অ্যাসিড অ্যাটাকের প্রচারক লক্ষ্মী আগরওয়াল বড় পরিসরে এ নিয়ে কাজ করছেন। তার জীবনের উপর ভিত্তি করেই ‘ছপক’ ছবিটা তৈরি হল। যে চরিত্রে দীপিকা পাড়ুকোন অভিনয় করছেন। এটা তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক। মানুষকে প্রভাবিত করবে বলেই আমার মনে হয়।

শুধুমাত্র যে ছেলেদের মধ্যেই পুরুষতন্ত্র আছে এমনটা নয়, প্রচুর মেয়েদের মধ্যেও আছে। প্রচুর মেয়েও কিন্তু এই নোংরা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনিওতো শুরু করেছেন কলকাতায়...

মনীষা পৈলান: হ্যাঁ। আমরাও কলকাতায় একটা মুভমেন্ট করছি। কিন্তু সেটা এখনও ছড়িয়ে দিতে পারিনি। কারণ যেকোনো কাজ করার জন্যই প্রচুর সোর্স আর টাকার দরকার। আমরা এখানে প্রত্যেকেই ছাত্র, তাই নিজেদের মতো আন্দোলন করার চেষ্টা করছি। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি যতদিন বাঁচব আক্রান্তদের পাশে গিয়ে দাঁড়াবোই। সেটা যেভাবেই হোক না কেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে