ভালো গল্প হলে কোন তারকা লাগে না: রায়হান রাফি

ঢাকা, বুধবার   ২৩ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৯ ১৪২৮,   ১১ জ্বিলকদ ১৪৪২

ভালো গল্প হলে কোন তারকা লাগে না: রায়হান রাফি

ইসমাইল উদ্দীন সাকিব ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৯ ২০ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১২:১০ ২৩ মে ২০২১

চলচ্চিত্র পরিচালক রায়হান রাফি

চলচ্চিত্র পরিচালক রায়হান রাফি

রায়হান রাফি একজন বাংলাদেশী চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার। আবদুল আজিজ প্রযোজিত এবং জাজ মাল্টিমিডিয়ার ব্যানারের পরিচালনায় তার প্রথম ছবি ‘পোড়ামন-২’ মুক্তি পায় ২০১৮ সালে। ছবিটির মুক্তির পরেই প্রশংসার জোয়াড়ে ভাসতে থাকেন এই পরিচালক।

সম্প্রতি তরুণ এই নির্মাতার ওয়েব চলচ্চিত্র ‘জানোয়ার’ দেশিয় ওটিটি প্লাটফর্ম সিনেমাটিকে মুক্তি পেয়েছে। মহামারীকালে খুন ও গণধর্ষণের একটি মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে ‘জানোয়ার’ নির্মাণ করা হয়েছে। মুক্তির পরেই সমালোচকদের নজর কাড়ে এটি। 

সম্প্রতি ‘জানোয়ার’ এবং নিজের সমসাময়িক ব্যস্ততা নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন ডেইলি বাংলাদেশ-এর। আর তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইসমাইল উদ্দীন সাকিব।

ডেইলি বাংলাদেশ: জানোয়ার নিয়ে এত প্রশংসা হচ্ছে চারদিকে, আপনার অনুভূতিটা কেমন?
রায়হান রাফি:
অনুভূতি অবশ্যই ভালো। কারণ, প্রথম দুইটা সিনেমায় সুপারহিট হয় মোটামুটি। চিন্তা ছিল তৃতীয় ফিল্মটা কি হবে! মহামারির কারণে তৃতীয় ফিল্ম রিলিজ দিতে পারলাম না। সবকিছু মিলিয়ে এটাই আমার তৃতীয় চলচ্চিত্র। যদিও এটা অনলাইনের জন্য। এখন বিশ্বজুড়ে ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। চলচ্চিত্র শুধু সিনেমা হল এর জন্য না, অনলাইনের জন্যও। বড় বড় নির্মাতারা অনলাইনে ছবি রিলিজ দিয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আমিও চিন্তা করলাম অনলাইনের জন্য ফিল্ম বানায়। আমরা ভাবতেও পারিনি আসলে। আমি ভেবেছিলাম মানুষ পছন্দ করবে হয়তো। কারণ আমি নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এটা যে তিন দিনে এই অবস্থা হয়ে যাবে ভাবিনি। ফেসবুক খুললেই, বাসার বাইরে গেলে, ফোনকল, ম্যাসেজে জানোয়ার নিয়ে কথা বলছে আমার সঙ্গে। মানুষ যে এভাবে গ্রহণ করবে এবং আমাদের সঙ্গে একত্রতা গ্রহণ করবে আমরা আসলে কল্পনা করিনি। কারণ বাংলাদেশের মানুষ টাকা দিয়ে না দেখে, ফ্রি ইউটিউবে বিভিন্ন কন্টেন্ট হিট করার রেকর্ড আছে। 

চলচ্চিত্র পরিচালক রায়হান রাফি

তবে একটা অ্যাপ্স এ ঢুকে, টাকা খরচ করে, ডাউনলোড করে, মুভি দেখে, রিভিউ দেয়া; এটা আসলে অবিশ্বাস্য লাগছে আমার কাছে। মানুষজন এখন নিজেরাই বলছে, প্লিজ আপনারা পাইরেসি করবেন না আমরা টাকা দিয়ে ফিল্মটা দেখি চলেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি হাইপ ভারতে হয়ে গেছে। ভারতের প্রত্যেকটা রিভিউয়ার, দর্শক বলছে, ভারতেও এরকম কাজ হয় না যেটা বাংলাদেশে হচ্ছে। এতোটাও আশা করিনি যতটা আমরা পাচ্ছি। 

ডেইলি বাংলাদেশ: এমন একটা গল্প নিয়ে কাজ করলেন কেন?
রায়হান রাফি:
আমরা যখন ধর্ষণের খবর দেখি, আমরা এটা পড়ি, একটু উত্তেজিত হই আবার দুই দিন পর ভুলে যাই। কারণ আমরা জানি না এর ভয়াবহতা কতটুকু। যাদের সঙ্গে হয় তারাই জানে। আমি শুধু এই নাড়াটুকু মানুষকে দিতে চেয়েছিলা।ম প্রকৃত জানোয়ায়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারের উপর দিয়ে যে অত্যাচারটা যায় সেটা আসলে কেমন হয়। আমি আশা করি জানোয়ার দেখার পর যখন কেউ একজন অন্য কোনো সময় ধর্ষণের খবর পড়বে তখন তার অনুভূতি হবে, আহারে ওই মেয়ের সঙ্গে এই জিনিসটা করা হয়েছে। আমার প্রতিবাদ করা উচিত। এমনকি ভবিষ্যতে যারা ধর্ষক হতেও পারতো, আশা করি এটা দেখার পর ওদের মনে করুণা হবে। আর যাই করুক না কেন কাউকে ধর্ষণ করবে না। এটাই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। 

ডেইলি বাংলাদেশ: সবচেয়ে কঠিন কি ছিল গল্পটা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে?
রায়হান রাফি: 
এটি নৃশংসতার গল্প। যেখানে ধর্ষণের বিষয় আছে, যেখানে হত্যা আছে। ওই জিনিসটা না দেখিয়ে কিভাবে মানুষকে আমি কষ্টটা দিব। আমি কিন্তু ধর্ষণের চিত্র দেখায়নি গল্পতে। এখানে সরাসরি জবাই করা নেই। তারপরও মানুষ দেখে ভয় পাচ্ছে। এটা চ্যালেঞ্জ ছিল যে আমি ধর্ষণের দৃশ্য না দেখিয়ে, অশ্লীল দৃশ্য না দেখিয়ে দর্শক কিভাবে এই বিষয়টা অনুভব করাব। এখানে আমার ক্যামেরার পেছনের টিম খুব অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে। আমি সবার কাছেই কৃতজ্ঞ।

ডেইলি বাংলাদেশ: এত অসাধারণ অভিনয় করেছে সবাই, বিশেষ করে বাচ্চাদের কথা সবাই বলছে; এর পেছনের গল্পটা যদি একটু বলতেন। 
রায়হান রাফি:
 পেছনের গল্পটা একদম সহজ। আমরা চার থেকে পাঁচ দিন রিয়ার্সেল করেছি। সবাই আসলে মন থেকে অভিনয় করেছে এটাই হচ্ছে প্রথম দিক ও প্রধান দিক। আমার পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণ বিষয়টা ১০০ তে ১০০% বাস্তব রাখবো। সবাই নিজের সেরাটা দিয়েই অভিনয় করেছে। সবাই ভাল অভিনেতা বটে!

ডেইলি বাংলাদেশ: তারকা নির্ভর সময়ে তারকা অভিনেতা ছাড়াই সিনেমা নির্মাণ করলেন। কারণটা কি?
রায়হান রাফি:
দর্শক আসলে বুঝিয়ে দিলেন ভাল কনটেন্ট হলে, ভালো গল্প হলে কোন তারকা লাগে না। তারকা ছাড়া বাংলাদেশে এই প্রথম কোন কন্টেন্ট দুই দিনে হিট করলো। আপনি যত কন্টেন্ট দেখবেন হিট করা, সবগুলোতেই কোনো না কোনো তারকা ছিল। জানোয়ার একমাত্র সিনেমা, যেখানে তারকা কেউ ছিলনা। সবাই নতুন, মঞ্চের অভিনেতা। যারা নাটকের পার্শ্ব চরিত্র করে। এই বিষয়টা ভারতে হচ্ছিল, বাংলাদেশে হয়নি। ওরা আন্ডাররেটেড অভিনয় শিল্পীদের হিরো বানিয়ে কাস্ট করছিল। 

চলচ্চিত্র পরিচালক রায়হান রাফি

ভারতে যে সিরিজগুলো সুপারহিট যেমন ‘পাতাল লোক’ এর যে অভিনেতা ছিল সে কিন্তু আন্ডাররেটেড অভিনেতা। বাংলাদেশে ওয়েব ফিল্ম বানালেও আমরা দিনশেষে আমাদের সেই তারকাদের কাস্টি এ নিয়ে নিচ্ছি। সবাই তারকা কাস্ট নির্ভর হয়ে যাচ্ছি। আমার চ্যালেঞ্জটা ছিল যে ওয়েব কনটেন্ট যারা দেখেন তার কনটেন্ট দেখতে যায়, তারকা দেখতে যায় না। তারকাদেরও দেখতে চায়, তবে অভিনেতা হিসেবে নায়ক হিসেবে না। ওই ভাবনা থেকে আমার চ্যালেঞ্জ ছিল আমি নতুনদেরকে নিয়ে বানাবো। দেখি মানুষ দেখে কিনা। মানুষ দেখিয়ে দিল কনটেন্টের জোর থাকলে আসলে কিছুই লাগেনা। তিন দিনেই চার-পাঁচটা মঞ্চ অভিনেতা তাসকিনসহ এরা একটা ফিল্মকে এমন জায়গায় নিয়ে গেল যে বাংলাদেশের ফেসবুকে এখন জানোয়ার ছাড়া অন্য কোনো টপিকস নেই। যে ফিল্ম দেখার মাধ্যমটা বাংলাদেশ একদমই নতুন, পয়সা খরচ করে দেখতে হয়। সেই ফিল্মকে তিন দিনে তারা দেশের বাইরেও একই অবস্থানে নিয়ে গেল। 

ডেইলি বাংলাদেশ: এই দেশের দর্শক নিয়ে আপনি কতটা সন্তুষ্ট?
রায়হান রাফি:
আমি দর্শকদের কাছে অসংখ্য ধন্যবাদ। তারা আসলেই পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে করোনা পরবর্তীকালে। তারা দেখিয়ে দিল ভাল কনটেন্ট থাকলে তারা দেখে। আমরা ভাল কন্টেন্ট বানাতে পারি না। আমরা দর্শকদের দোষ দেয়। তারা দেখে না, ফ্রি তে দেখে অভ্যস্ত বলে দোষারোপ করি। তারা তাকদীরও দেখেছে, জানোয়ারও দেখছে। সামনে ইনশাআল্লাহ ভালো কন্টেন্ট হলে অবশ্যই দেখবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনাদেরকে নিয়ে অনেকেই স্বপ্ন দেখছে পালাবদলের, আপনি কি বলেন?
রায়হান রাফি:
এই বিষয়ে কিছু বলার নেই। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। আমাকে নিয়ে ফারুকী ভাই স্ট্যাটাস দিল। অনেক বড় বড় নির্মাতাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। আলহামদুলিল্লাহ এটা একটা ভালো দিক। সামনের কাজগুলো আরো যাতে ভালো হয় সেদিকে চেষ্টা করতে হবে। ছবিটি হিট হওয়ার পর দায়িত্ব বেড়ে গেল। আমি খুবই ভাগ্যবান যে সিনেমা হলের জন্য যে দুইটা সিনেমা বানিয়েছি হিট হলো আলহামদুলিল্লাহ, অনলাইনের প্রথম ছবিও হিট। আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি।

চলচ্চিত্র পরিচালক রায়হান রাফি

ডেইলি বাংলাদেশ: সামনে কি কি কাজ আসছে আপনার?
রায়হান রাফি:
সামনে আরো ওয়েব ফিল্ম আসছে। অনলাইনের জন্য বানাবো। ‘দামাল’ আসছে, ‘পরান’ আসছে ইনশাআল্লাহ। গত বছরটা আমার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমার অনেকগুলা ছবি আটকে ছিল যা এবছর মুক্তি পাবে। এই বছরের শুরুটা ধামাকা দিয়ে শুরু হলো। সামনে ইনশাল্লাহ ভালো কিছু হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস