‘রিস্ক নিয়েই ১৪ বছর ওয়েট করেছি’

ঢাকা, রোববার   ১১ এপ্রিল ২০২১,   চৈত্র ২৮ ১৪২৭,   ২৭ শা'বান ১৪৪২

‘রিস্ক নিয়েই ১৪ বছর ওয়েট করেছি’

বিনোদন প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৪৪ ২ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৩:৩২ ৩ জানুয়ারি ২০২১

সোহেল মন্ডল

সোহেল মন্ডল

এই সময়ের নতুন অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম সোহেল মন্ডল। যিনি ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সিনেমায় কাজ করেছেন। সম্প্রতি তিনি সহশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেছেন 'তাকদির' শিরোনামের ওয়েব সিরিজে। যা তাকে এখন প্রশংসার জোয়ারে ভাসাচ্ছে। এতে তার সুদক্ষ অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছে।

সম্প্রতি ডেইলি বাংলাদেশ-এর সঙ্গে আলাপচারিতা হয় অভিনেতা সোহেল মন্ডলের। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইসমাইল উদ্দীন সাকিব।

ডেইলি বাংলাদেশ: এত এত প্রশংসা চারদিকে। নিজে কি ভাবছেন?

সোহেল মন্ডল: প্রশংসা শুনতে ভালোই লাগে। তেমন কিছু ভাবছি না। দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছি। কাজ করার পর হঠাৎ করে এমন ফিডব্যাক পাওয়া, ভালো আর আনন্দও দু’টাই লাগছে। এর আগে এভাবে এত প্রশংসা হয়নি। ভালোই লাগছে।

ডেইলি বাংলাদেশ: ছোট ছোট চরিত্রে আগেও অভিনয় করেছেন। তাকদিরে এমন একটি চরিত্র পেয়ে কি ভেবেছিলেন?

সোহেল মন্ডল: তাকদিরের ডিরেক্টর শৌকি সাঈদ এর সঙ্গে অনেক দিনের পরিচয়। উনার সঙ্গে একটা প্রজেক্ট করেছিলাম “অস্থির সময় স্বস্তির গল্প”। এই কাজটি করার পরেই উনার সঙ্গে আমার কথা হয়। তখন উনি মজা করেই বলেছিলেন, তোমার সঙ্গে আমি একদিন কাজ করবো। এটা ২০১৭ এর ঘটনা। এর মাঝেও যখন দেখা হতো রাস্তা ঘাটে তখন বলতো সময় হলে তোমার সঙ্গে কাজ করবো। এক ধরনের যোগাযোগ কাজ করার ব্যাপারে উনার সঙ্গে ছিলই। উনি স্ক্রিপ্ট লেখার পর আমাকে কল দিয়ে বলে তোমার জন্য একটা ক্যারেক্টার রেডি করেছি। তোমার সঙ্গে আমার কাজ করা হবে। এভাবেই তাকদিরের প্রজেক্ট এর সঙ্গে যোগ দেয়া।

সোহেল রানা মন্ডলডেইলি বাংলাদেশ: ভিডিও এডিটর হিসেবেও পর্দার আড়ালে কাজ করেছেন। যাত্রাটা কেমন ছিলো?

সোহেল মন্ডল: আমি থিয়েটার করছি ২০০৬ থেকে। থিয়েটার করতে করতে অভিনয়ের প্রতি এক ধরনের প্যাশন তৈরি হয়। এডিটিংটা আমার অর্থনৈতিক জায়গা থেকে করা। আমার আয়ের কোনো জায়গা ছিল না। তাই থিয়েটার এর পাশাপাশি এডিটিংটা চালিয়ে যেতাম। আমি প্রফেশনালি এই কাজটা শুরু করেছি ২০১২ সাল থেকে। আমি ফ্রন্ট লাইনে কাজ করতে পারছিলাম না। তখন অর্থনৈতিক একটা সাপোর্ট দরকার ছিল। এডিটিং যেহেতু পারতাম, ওটা একটা ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করতো। অভিনয় আমার প্যাশন ছিল। তাই যেন তেন কাজ করার ইচ্ছা ছিল না। আমি মূলত অভিনয়টাকে স্পেস দেয়ার জন্য এই কাজটি করে যাচ্ছি। এটা আসলে ইনজয় করি কিন্তু প্রফেশন হিসেবে ভাবতে চাইনি আমি। অভিনয়টাই করতে চেয়েছি।

ডেইলি বাংলাদেশ: দীর্ঘ সময় মঞ্চে কাজ করেছেন। তাও অডিশনে সুযোগ হতো না। এর কারণ কি ভেবেছিলেন তখন?

সোহেল মন্ডল: আমাদের এখানে ফিকশনের অডিশনে খুব একটা ব্যবস্থা ছিল না। টেলিভিশনের যারা কাজ করে, পরিচিত মুখ তৈরি হয়ে গেলে মৌখিকভাবে এক ধরনের কমিউনিকেশন হয়। আর অপরিচিত মুখদের জন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বিশেষ করে টেলিভিশন আর নাটকের ক্ষেত্রে। সিনেমার ক্ষেত্রে এক ধরনের অডিশন বা যোগাযোগ হয়। যেহেতু আমাদের এখানেই সিনেমা ব্যবস্থা অত ভালো না, সবাই মোটামুটি টেলিভিশনের কাজ শুরু করার চেষ্টা করে। আমি অন্তর্মুখী মানুষ। তাই ওইভাবে আর কারোর সঙ্গে যোগাযোগ করার ইচ্ছাও ছিল না। একটা জায়গায় অডিশন দেয়ার সুযোগ ছিল। টিভিসির প্রোডাকশন হাউজে। টিভিসি তে কাজ করা ওরকম ইচ্ছা ছিল না। যেহেতু কাজের সুযোগ হচ্ছিল না সেহেতু ওগুলাতে কাজ করতে যেতাম। টিভিসির একটু ডিফারেন্ট ছিল। জানিনা কেন এরকম। এখানে আসলে প্রপার জাজমেন্ট হয় না। ওখানে আমি অডিশন দেয়ার পর বুঝেছি অভিনয় দক্ষতা এখানে যথাযথ ব্যবহার করতে পারবো না। ওখানে চেহারার কিছু বিষয় থাকে, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এর কিছু বিষয় থাকে। যার কারণে আমি অডিশন গুলো এনজয় করতাম না। পরে আমি ডিসিশন নিয়েছি টিভিসি অডিশন দিবোনা। এটার কোনো মানে নাই। এগুলোর মাধ্যমে মনে হতো নিজেকে ঠিকভাবে প্রস্তুত করতে পারিনি। তাই ওই জায়গা থেকেই আসলে টিভিসির অডিশন থেকে বের হওয়া। এছাড়া আমি সব সময় প্রস্তুত অডিশন দেয়ার জন্য। আমি সবসময় অডিশন দিয়েই কাস্ট হয়েছি। আমি এখনো পর্যন্ত চাই যেকোনো কাজ অডিশন দিয়েই করতে।

থিয়েটারে সোহেল রানা মন্ডলডেইলি বাংলাদেশ: নাটকে কাজ করার ইচ্ছা কি ছিল না?

সোহেল মন্ডল: নাটক টুকটাক করেছি। কাছের কিছু বড় ভাই বোন সুযোগ দিয়েছিলেন, তাদের কাজ করেছিলাম। কিন্তু আমি আসলে নাটকে উপভোগ করতাম না। আমাদের দেশে একটা প্রবলেম হলো প্রোটাগনিস্ট বা এন্টাগোনিস্ট ছাড়া বাকি ক্যারেক্টারগুলোকে খুব একটা সুন্দরভাবে গড়ে তুলতো না। যার কারণে ওই ক্যারেক্টারগুলোতে করার আসলে কিছুই থাকত না। শুধু শুধু পর্দায় দেখা যাবে এই ভাবনাটা আমার কখনোই ছিল না। আমি আসলে কাজটা করতে চেয়েছি। একটা ক্যারেক্টার তৈরি করতে চেয়েছি। যেকোনো গল্পে আমার ক্যারেক্টারটা যেন দেখা যায়। নাটকে গত পাঁচ-দশ বছর ধরে কিছু নির্দিষ্ট ক্যারেক্টারের উপর বা প্রোটাগনিস্ট ছাড়া আর কোনো ধরনের ফোকাস থাকত না। আমি নন পপুলার। যার কারণে আমাকে যে প্রোটাগনিস্ট হিসেবে কাজ দেবে তাও হতো না। নাটক যোগাযোগের, পরিচিতির একটা ব্যাপার থাকে বা প্রোডিউসারদের বা স্পন্সরদের কিছু বাইন্ডিং থাকে। যার কারণে ডিরেক্টররা চাইলেও নিতে পারে না। আমার ইচ্ছা নাটকে ছিল না, আমি থিয়েটার করার সময় ভাবতাম সিনেমা করব। যার কারণে টিভিসির পর আমি সিনেমা দিয়েই শুরু করি। আমার প্রথম কাজ ছিল সিনেমায় “আন্ডার কনস্ট্রাকশন” রুবাইয়েত হোসেনের। এর এক বছর পর আমি “মুসাফির” করি। তারপর আমি “আয়নাবাজি” করি, তারপর করি “অস্থির সময় স্বস্তির গল্প”। আমি আসলে সিনেমার প্রতি ফোকাস ছিলাম সবসময়। চেষ্টা করব সিনেমা করার যদিও সিনেমা হয় নায়ক বা নায়িকা নির্ভর। এখন যেহেতু ওয়েব সিরিজ আসছে সেহেতু কাজ করার সুবিধাও বাড়ছে।

ডেইলি বাংলাদেশ: আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যারা সিনেমা করেছেন তারা বেশিরভাগই নাটক থেকে আসা। ক্যারিয়ার হিসেবে আমাদের দেশে সিনেমাটা একটু রিস্ক হয়ে যায় না?

সোহেল মন্ডল: আসলেই এটা আমার জন্য খুব রিস্ক ছিল। রিস্কটা নিয়েছি বলেই গত ১৪ বছর ধরে ওয়েট করেছি। আমি ইন্ডাস্ট্রির যেকোনো কাজের সঙ্গেই ছিলাম। তাই মেনে নিয়েছিলাম যে এডিটিংটা করতে থাকি এবং পাশাপাশি যখন ভালো সুযোগ আসবে তখন সেই কাজটা করব। শুধু শুধু স্ক্রিনে আসার চেয়ে ভালো কোন কাস্টিং করে বছরে একটা সিনেমা বা দুটো ভালো ফিকশন করার ইচ্ছা ছিল। গত সাত-আট বছর ধরে এটি করে যাচ্ছি। ভালো গল্প এবং ভালো ক্যারেক্টার ছাড়া নাটকের প্রতি আমার কোনো ইচ্ছা নেই। যদি ভালো গল্প হয় এবং স্ট্রং ক্যারেক্টার হয় তাহলে আমি নাটকে কাজ করতে পারি।

ডেইলি বাংলাদেশ: বিগত বছরগুলোয় নাটক ইন্ডাস্ট্রিতে যারা এসেছে বেশিরিভাগই ইউটিউব থেকে। ভিউ এর উদ্দেশ্যে জনপ্রিয়তা কাজে লাগানো হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। মনে হয়না এতে করে আপনারদের মত মঞ্চ অভিনেতাদের এখন সুযোগ হয় না?

সোহেল মন্ডল: আমি একজন এক্টর। একটা গল্পের টুলস মাত্র। এটা পুরোটাই আসলে ডিরেক্টর, প্রডিউসার বা সিনিয়র যারা আছেন তারা ভালো উত্তর দিতে পারবেন কাদেরকে তারা সুযোগ দিবেন। ইন্ডাস্ট্রির ভালোর জন্য কোনটা করা উচিত এটা আসলে তারাই ভালো বলবেন। এক্টর হিসাবে এটা আমার এখতিয়ারে পরে না। আমি অন্তত এতটুকুই উইশ করতে পারি, অন্তত কাজ জানা, থিয়েটার করে আসা বা কোনো প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা ছেলে মেয়েদেরকে যেন সুযোগ করে দেন। সুযোগ যদি তারা পায় তাহলে অনেক কিছুই করবে বলে আমার বিশ্বাস। যারা ইউটিউব থেকে আসছে তারাও পরিশ্রম করে আসছে। তাদেরও সুযোগ দেয়া দরকার।

ডেইলি বাংলাদেশ: তাকদিরের পর নিজের অভিনয় ক্যারিয়ারের তাকদির কতটা বদলেছে মনে হয়?

সোহেল মন্ডল: এটা এখনই বলার সময় আসেনি। কাজ করা শুরু করেছি ২০১২ থেকে ভিজুয়াল মিডিয়ায়। লোকজন কাজ দেখে এপ্রিশিয়েট করেছেন, তারা আশা করছেন আমি যেন কাজ করি। কিন্তু এটা আমার এককভাবে চাইলে তো হবে না। বাকি যারা কাজ বানান, তৈরি করেন সবাই মিলেই ভাবতে হবে। এটা আসলে একটা টিম ওয়ার্ক। তারা যদি আমাকে সুযোগ দেন তাহলে হয়তো বুঝতে পারব যে আমার ক্যারিয়ার শুরু হচ্ছে। এটা পুরোটাই এখন ভবিষ্যতের উপর নির্ভরশীল। আগামী কয়েক বছরে বোঝা যাবে আমি কোথায় যাব বা কতটুকু কাজ করতে পারবো।

সোহেল রানা মন্ডলডেইলি বাংলাদেশ: কাজের অফার কি আসছে না এখন? সামনে কি কাজ আসছে?

সোহেল মন্ডল: কিছু আসছে। সব সময় আমার একটা চুজ করার বিষয় ছিল। যখন কাজ পেতাম না তখনও বেছে বেছে কাজের সুযোগ নিতাম। আমার সিদ্ধান্ত সবসময় এক। একই ধরনের গল্প করবো না, একই ধরনের কাজ করবো না। কাজ করার ক্ষুধা বিভিন্ন ধরনের ক্যারেক্টারে। ভালো গল্প এবং ভালো ক্যারেক্টারের উপর নির্ভর করবে আমার কাজ। কিছু গল্প আসছে এবং তিনটা প্রসেসিং আছে যেগুলো আমি করবো। কনভারসেশন, রিডিং চলছে গল্পগুলো নিয়ে। আমার দুইটি সিনেমা আসবে সামনে সেটার জন্য অপেক্ষা করছি। একটা হচ্ছে “হাওয়া” মেজবাউর রহমান সুমনের। আরেকটি হচ্ছে “মায়ার জঞ্জাল” ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরীর যেটা যৌথ প্রযোজনায় কলকাতা এবং বাংলাদেশে একসঙ্গে রিলিজ হবে। এগুলো আমার ক্যারিয়ারের জন্য বড় কাজ ছিল। তো দেখা যাক সবকিছু তকদিরের খেল। ভালো গল্প, ভালো ক্যারেকটার পেলে আলোচনা চলছে। ব্যাটে বলে মিলে গেলে সেই কাজগুলো করা হয়ে যাবে।

ডেইলি বাংলাদেশ: বাংলায় ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আপনার স্বপ্ন কতদূর?

সোহেল মন্ডল: স্বপ্ন দেখতেই চাই। প্রত্যেক মানুষ স্বপ্ন দেখে। আমি আশাহত হতে চাই না; যেহেতু ইন্ডাস্ট্রির মানুষ আমি। আশা করব ইন্ডাস্ট্রি এগিয়ে যাক, ভালো করুক, প্রচুর ছেলে মেয়ে আসু্‌ক, পারফর্মার হোক, ডিরেক্টর হোক, সিনেমাটোগ্রাফার হোক। যে জেনারেশন তৈরি হচ্ছে এরা সবাই খুব ট্যালেন্টেড মানুষ। হয়তো সময়, ইনভেস্টর সবকিছু মিলিয়ে অনেক কিছু কানেকশন হচ্ছে না। ইন্ডাস্ট্রির সবাই আসলে একজোট হওয়া উচিত। একটা চেষ্টা, একটা হাইপ আসছে। ওয়েব এর কনটেন্ট এর কারণে হোক বা যে কারণেই হোক। মানুষের ভেতর এক ধরনের স্পৃহা দেখা যাচ্ছে কাজের। আশা করছি ইন্ডাস্ট্রি এই ধাক্কায় হলেও একটা ভালো জায়গায় যাবে। এবং আপনারা ভালো কাজ আশা করতে পারেন এই ইন্ডাস্ট্রি থেকে। সত্যি কিছু সিনেমা তৈরি হয়ে গেছে এই ইন্ডাস্ট্রি থেকে। আমি আশাবাদী মানুষ, দেখা যাক কোথায় নিয়ে যায়। আমার ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আমি আপাতত আশাবাদ ছাড়া আর কিছু ব্যক্ত করতে পারছি না। আশা করছি ভালো কিছু হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ/টিএএস