সর্বত্রগামী হয়ে ওঠেনি আমাদের সাংবাদিকতা

ঢাকা, বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১৫ ১৪২৭,   ১২ সফর ১৪৪২

সর্বত্রগামী হয়ে ওঠেনি আমাদের সাংবাদিকতা

ড. কাজল রশীদ শাহীন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৮ ৩১ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১২:৪৫ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কাজল রশীদ শাহীন, সাংবাদিক-লেখক ও গবেষক। পিএইচডি করেছেন বাংলা সাহিত্যে। সংবাদপত্রে বিভিন্ন বিভাগে কাজ করছেন দুই যুগ। সহ-সম্পাদক থেকে হয়েছেন সম্পাদক। সংবাদপত্রের ভেতর-বাইরের কথাসহ সংকট-সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন রনি রেজার সঙ্গে

ডেইলি বাংলাদেশ: সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের প্রায় প্রতিটি পদেই বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে আপনার। কোন সময়টাকে বেশি চ্যালেঞ্জের মনে হয়েছে, কেন, একটু বিস্তারিত বলুন?

ড. কাজল রশীদ শাহীন: আমি তো নৈর্ব্যক্তিক যুগের ছাত্র না, এ কারণে নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তখন আমি একটা পত্রিকার ফিচার এডিটর। প্রতিদিনের নিয়মিত বিভাগসহ সাপ্তাহিক বিভাগগুলো দেখভাল করতে হয়। কিন্তু লোকবল সেই অর্থে নামমাত্র। প্রতিবেদক ও লেখক সম্মানী বন্ধ প্রায়। এই অবস্থায় এরকম একটা বিভাগ পরিচালনা করা রীতিমতো দুরূহ। তারপর যদি আবার আপনার ভেতরে ভালো কিছু করার তাগিদ থাকে তাহলে চ্যালেঞ্জটা আরো বেশি। সীমিত লোকবল ও সামর্থ্যের মধ্যে আমরা যা করতাম, অন্যেরা সেটা করতো আমাদের চেয়ে তিন/চারগুণ বেশি বিনিয়োগ করে। সেই সময় সকাল থেকে আমি মনে মনে স্রষ্টার নাম জপ করতাম এবং সন্ধ্যা হলে হাফ ছেড়ে বলতাম, যাক আজকের দিনটা তো সম্ভব হলো, আগামীকালের দিনটা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। কোথায় পাবো ম্যাটার, কোথায় পাবো ছবি, আর কারেন্ট ঘটনার নিউজই ম্যানেজ হবে কীভাবে? এভাবে পরের দিনটা উতরালে আবার মনে হতো, আজ হলো আগামীকাল অসম্ভব। এভাবেই কেটেছে আমার সেইসময়ের দিন-রাত। তবে আমার ফিচার সেকশনে যে কয়েকজন সহকর্মী ছিল উনারা ভীষণভাবে নিবেদিত ছিলো। এবং সেটা ছিলো বলেই প্রত্যেকেই এখন সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেশ ভালো করছেন, ভালো জায়গায় আছেন।

সম্পাদকীয়তার বিভাগের অভিজ্ঞতার কথা বলি। লেখা সংগ্রহ করা যে কী পেইন, বিশেষ করে প্রথম সারির পত্রিকা না হলে বোঝা মুস্কিল। আপনি যদি যা এলো, যা পেলাম, তাই-ই কায়দা করে ছাপিয়ে দিলাম, তাহলে সমস্যা নেই। সমস্যা হলো, আপনি যদি মনে করেন, নির্দিষ্ট বিষয়ে নির্দিষ্ট লেখকের লেখায় ছাপাবেন, তাহলে সেটা ভীষণ চ্যালেঞ্জের। এ কারণে লেখক-কলামিস্ট কনফার্ম করার পরও আমরা উদ্বিগ্ন থাকি, রিমাইন্ডার দিই। বিশিষ্ট সাংবাদিক-কলামিস্ট প্রয়াত জগলুল আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে একটা স্মৃতি আমার এখনো মনে আছে। উনাকে একটা লেখা নিয়ে কনফার্ম করার পর, আমি শেষ তাগাদা হিসেবে বলছি, জগলুল ভাই কালকে কিন্তু আমার লাগবেই, দেইখেন কোনোভাবেই মিস হয় না যেন। এটা আসলে আমার মজ্জাগত অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু জগলুল ভাই ওইদিন কেন জানি রেগে গেলেন। বললেন, কাজল আমি কি কোনোদিন মিস করেছি, বলেছি যখন দেবই দেব। কথাটা বলেই ফোনটা রেখে দিলেন। হ্যা, এটা সত্যি যে, জগলুল ভাই কখনো মিস করেননি। কিন্তু অনেকেই করেছেন, এবং যতোটা পীড়া দেয়া যায়, ততোটাই দিয়েছেন। সাহিত্য সম্পাদক থাকাকালেও আমাকে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমাদের লেখকরা কখনোই বুঝতে চান না আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। একবারের ঘটনাটা ছিলো খুবই বেদনাদায়ক। ঘটনাটা উহ্য থাক, উপলব্ধিটা বলি, আমার শত্রুর সন্তানও যেন লেখক না হয়। লেখকরা তো অনেক বেশি প্রতিভাবান এবং সৃজনশীল। এ কারণে তারা যেন যন্ত্রণা দেন সেটাও অনেক বেশি সৃজনশীল ও সুক্ষণ হয় যা সহ্য করা দুরূহ। তবে এমন লেখকও পেয়েছি যারা ভালবেসেছেন, স্নেহ দিয়েছেন আকাশের মতো বিশাল হৃদয় দিয়ে।

ডেইলি বাংলাদেশ: আমরা যতটুকু জানি, আপনি ছাত্রজীবন থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। দুই দশকের এই পথচলায় এমন কোনো প্রতিবন্ধকতা কি হাজির হয়েছিলো যা আপনাকে থমকে দিয়েছিলো?

ড. কাজল রশীদ শাহীন: ভয়ঙ্কর রকমের প্রতিবন্ধকতা সম্মুখীন হয়েছি। সেটা হয়তো আমার কাছে এখনো ট্রমার মতো রয়েছে। জীবনানন্দ দাশতো বলেছেনই, কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে? 

ডেইলি বাংলাদেশ: সাংবাদিকতা জীবনের বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা বলুন, যা আপনাকে এখনো আনন্দিত করে, পীড়া দেয়।

ড. কাজল রশীদ শাহীন: সাংবাদিকতা তো থ্যাঙ্কলেস জব, সুতরাং এখানে আনন্দটা বোধ হয় বানের পানির মতো আসে আর যায়, আর পীড়াটা থাকে। আমাদের চাকরিটা তো কচুর পাতার পানির মতো, আজ এই পত্রিকা, কাল আরেক পত্রিকায়। সুতরাং অভিজ্ঞতাটাও বিচিত্র। আবার এই পেশার নিয়োগ প্রক্রিয়াটা যেহেতু এখনো কোনো কানুন দ্বারা বেধে দেয়া হয়নি, তাই এখানে আগাছার পরিমাণ নেহাত কম নয়। আগাছার ধর্ম তো জানেন, সেই মাথা উচু করে এমন ভাব দেখায় সেই প্রকৃত, বাকি সব মিথ্যা, অযাচিত, অযোগ্য, অপাংক্তেয়। ফসল বাঁচাতে আগাছাকে উপড়িয়ে ফেলতে হয়, বিনাশ করতে হয়। কিন্তু সাংবাদিকতায় গজিয়ে ওঠা আগাছা উপড়াবে কে? ফলে, সাহেদদের মতো মাল্টি ট্যালেন্ট প্রতারকদের একটা সরব ও নীরব দাপট রয়েছে এখানে। এদের কারণে প্রকৃত সাংবাদিকদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা যেমন ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি পেশাটাও হয়ে উঠছে কলঙ্কময়। একথা বলার পর আমাকে কেউ আবার বলেন না, অমঙ্গলকে জগত হইতে উড়িয়া দেবার চেষ্টা করিওনা, তাহলে মঙ্গলসমেত উড়িয়া যাইবে। এই অবস্থায় এখানে একটা ফিল্টারিং ব্যবস্থা চালু হওয়া খুব জরুরি। 

মনে রাখতে হবে, সাহেদেরও অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ছিলো। সুতরাং তার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করতে হবে। এই দায়িত্ব যেমন তথ্য মন্ত্রণালয়ের তেমনি এই কমিউনিটির সঙ্গে যারা জড়িত, যারা স্টেকহোল্ডার তাদেরকে আগাছারোধে একটা বিহিত করতে হবে। এসব যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে পীড়াগুলো কমে আসবে ক্ষেত্রবিশেষে আনন্দদায়কও হতে পারে

ডেইলি বাংলাদেশ: সাংবাদিকতার পাশাপাশি আপনি সৃজনশীল, মননশীল লেখালেখিও করেন।সাংবাদিকতা সাহিত্যের সহায়ক নাকি প্রতিবন্ধক; আপনার অভিমত কী অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

ড. কাজল রশীদ শাহীন: আমি তো মনে করি সহায়ক। বিশ্বসেরা অনেক লেখক কিন্তু সাংবাদিক ছিলেন। মার্ক টোয়েন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এরা প্রত্যেকেই সাংবাদিক ছিলেন। বাংলা ভাষাতেও দেখবেন অনেক লেখকের সাংবাদিক সত্বাও উচ্চকিত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শামসুর রাহমান, মাঝে অজস্র নাম আপনি পাবেন। ফ্যাক্ট রিপোর্টিং করতে করতেই ফিকশন রাইটার হয়ে উঠার নজির অগণন। একে অপরের পরিপূরক ভাবলেই মনে হয় আশাপ্রদ প্রাপ্তিটা ঘটে।

ডেইলি বাংলাদেশ: লেখালেখিনিয়ে জানতে চাই। কী লিখছেন, কী পড়ছেন, কোভিড- ১৯ মহামারীকাল আপনার লেখালেখির জগতকে কতোটা প্রভাবিত করলো?

ড. কাজল রশীদ শাহীন: আমার আসলে লেখার চেয়ে পড়তেই ভালো লাগে। আমি ছাত্রত্বটা ধরে রাখতে চাই সযত্নে, আজীবন। এ মুহূর্তে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লেখার চেষ্টা করছি। তবে করোনা মহামারী আমার চিন্তার জগতকে মারাত্মক প্রভাবিত করেছে। বিবিধ বিষয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সভ্যতার অগ্রগতি, বিনির্মাণ নিয়ে জিজ্ঞাসা বেড়েছে। চিন্তার জগতের ট্যাবুটাই আমাদের সাহিত্যে-সংবাদপত্রে-ইতিহাসে-ঐতিহ্যে-প্রত্ন ও নৃ ভাবনায় জগদ্দল পাথরের মতো বসে আছে, এখান থেকে বেরোনো জরুরি। কয়েকদিন আগে বিভাস চক্রবর্তীর একটা সাক্ষাৎকার পড়লাম। উনি বলছেন, উন্নাসিকতাটা থাকা প্রয়োজন। ওটা না থাকলে বর্তমানকে অতিক্রম করা যায় না। আর বর্তমানকে অতিক্রম করতে না পারলে সুন্দর আগামী হবে না। সুতরাং ট্যাবু ভাঙতে হবে, নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে হবে। করোনায় এটা তো স্পষ্টত যে, প্রযুক্তিতে বিশ্ব যতোটা এগিয়েছে, চিন্তায়-মানবিকতায়-সেবায় ততোটা এগোয়নি, উল্টো এগুলোতো বাসা বেধেছে বামন বৃত্তি। 

এ কারণে আপনি যাই-ই করেন না কেন, নতুন চিন্তা তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ এরা কেন আজও স্মরণীয়। কেন সক্রেটিস-প্লেটো-অ্যারিস্টটল কিংবা ব্রুনো, গ্যালিলিও, আর্কিমিডিস, নিউটন অমর। কেন চৈতন্য আমাদের রেনেসা পুরুষ। কারণ তারা নতুন চিন্তু যুক্ত করেছেন। 

ডেইলি বাংলাদেশ: মরণঘাতী করোনাকালেও সাংবাদিকদের পূর্বের মতোই সব দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ছুটতে হচ্ছে খবরের পেছনে। এরা ফ্রন্টলাইনার যোদ্ধা হলেও স্বীকৃতি নেই। অথচ জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তারা সব দায়িত্ব পালন করছেন। এসব নিয়ে আপনার ভাবনা কী, সমাধান কোথায়?

ড. কাজল রশীদ শাহীন: শেক্সপীয়রের একটা কথা আছে, আমাদের জীবনতো নদী নয় যে মোহনায় গিয়ে মিশবে, আমাদের জীবনটা খালের মতো, এখানে খনন করে পানি ধারণ করে রাখতে হয়। আমরা ফ্রন্টলাইনার যোদ্ধা হলেও স্বীকৃতি নেই, তারপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সব ধরনের তথ্যের যোগান দিতে হচ্ছে। 

মহামারীর ইতিহাস বলছে, প্রতি শতাব্দীতে মহামারীর দেখা দিয়েছে এবং কোটি কোটি মানুষ মারা গেছে। কিন্তু করোনার মতো এরকম সর্বগ্রাসী ও ব্যতিক্রমী মহামারীর পরেও কেন বিশ্বজুড়ে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এর পেছনে অনেক কিছুর অবদান হয়তো থাকতে পারে, কিন্তু সর্বাধিক  অবদান মিডিয়ার। সেটা আমাদের দেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও সমধিক প্রযোজ্য। সাহেদ, সাবরিনা কিন্তু গণমাধ্যমেরই আবিষ্কার। 

ডেইলি বাংলাদেশ: করোনা মহামারী শুরুর পর অনেকগুলো গণমাধ্যম থেকে সাংবাদিক, কর্মচারীদের ছাঁটাই, বিনা বেতনে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

ড. কাজল রশীদ শাহীন: দুঃখজনক ঘটনা এটি। রতন টাটার একটা কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। উনি বলছেন, আমি হয়তো নিরুপায় হয়ে শতকরা বিশ ভাগ বেতন কমিয়েছি, কিন্তু কাউকে বিদায় করে দেয়নি, কারণ আমার প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জন এদের দ্বারাই হয়েছে। এখন বিপদের সময় এদেরকে বের করে দেব? এমনটা করা মানে তো বৃষ্টির মধ্যে কাউকে ঘর থেকে বের করে দেয়ার মতো। অন্যভাবে ভাবা যেত, যদি আমরা মনে করতাম, যা কিছু করার এদেরকে রেখেই করতে হবে। তাহলে পথ বেরোত, কিন্তু সেটাকে আমলেই নেয়া হয়নি। 

ডেইলি বাংলাদেশ: হাতে গোনা কয়েকটা গণমাধ্যম ব্যতীত প্রায় সব গণমাধ্যম নানাবিধ সংকটে নিমজ্জিত। সংবাদ কর্মচারীদের অবস্থা শোচনীয়। মালিকপক্ষ ক্রমাগত ভুর্তকি দিতে দিতে ক্লান্ত, হতাশ। সাংবাদিকরাও প্রত্যাশা অনুযায়ী বেতন ভাতা না পেয়ে মর্মাহত, দ্বিধাগ্রস্ত। এই অবস্থা থেকে কীভাবে, কোন পথে উত্তোরণ সম্ভব?

ড. কাজল রশীদ শাহীন: উত্তোরণের পথ একটাই। যে কোনো গণমাধ্যমকে মুনাফা অর্জনের পথটা নিশ্চিত করতে হবে এবং একটা রোডম্যাপ অনুযায়ী, সেইভাবে বিনিয়োগ যেমন করতে হবে তেমনি মেধাবী-পরিশ্রমী ও উৎসর্গীকৃত প্রাণের কিছু মানুষকে একত্রিত করতে হবে। এমনটা হলে কোনোকিছুই অসাধ্য নয়। আমি ফোর পি-এর কথা বলি সবসময়। যে কোনো সংবাপত্র প্রতিষ্ঠানে আপনি তিনটা পি নিশ্চিত করুন, তাহলে ফোর পি আপনাআপনি নিশ্চিত হবে। অর্থাৎ প্রেস্টিজিয়াস, পপুলার আর প্রফেশনালিজম আপনি নিশ্চিত করেন। তাহলে স্ট্রাটিং বিনিয়োগ পিরিয়ড পেরোনোমাত্রই প্রফিট আপনার মুঠোবন্দি হবে। পাশের দেশের সবচেয়ে কাছের শহর কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বিশ্বের সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজিভাষী দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া। এরা এভাবেই তাদের পথচলা অব্যাহত রেখেছে। একশ বছর কিংবা তারও অধিক সময় ধরে কত রকমের রিজম তাদেরকে মোকাবিলা করতে হয়েছে, কিন্তু থেমে যায়নি, রূগ্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়নি। আনন্দবাজার পত্রিকার বয়স আগামী বছর একশ হবে। তারা ব্রিটিশ যুগ যেমন দেখেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে, নেহরু যুগ-ইন্দিরা যুগ পেরিয়ে মোদী যুগে এসে পড়েছে। কেন্দ্রের বাস্তবতার বাইরে তাদেরকে প্রাদেশিক বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু প্রেস্টিজ, পপুলারিটি আর প্রফেশনালিজমের সঙ্গে কোনো রকম আপস করেনি বলেই প্রফিট করেই তাদের ব্যবসাকে বহু ধাবিস্তৃ করেছে। তাদের পথে কি গোলাপ বিছানো ছিলো, নিশ্চয় না। কাটা বিছানো পথ মাড়িয়েই তারা অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করেছে। ওরা যদি পারে, আমরা কেন নয়? 

ডেইলি বাংলাদেশ: গণমাধ্যমের ভেতরকার একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ হিসেবে আমাদের গণমাধ্যম সম্পর্কে আপনার পযবেক্ষণ কী?

ড. কাজল রশীদ শাহীন: আমাদের গণমাধ্যমের হয়তো আর্থিক সামর্থ্য এখনো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায়নি। কিন্তু নীতি নৈতিকতায়, মুক্তিযুদ্বের চেতনায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদে তারা বরাবরই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। একথা তো সত্যি, সবাই এক বাক্যে স্বীকারও করেন, আমাদের গণমাধ্যম সবসময়ই মানুষের পক্ষে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতি ও প্রশাসনতন্ত্রের ভেতর বাইরের কিছু কিছু রুঢ় সত্য উন্মোচন করায় গণমাধ্যমকে অস্বস্তিকর ও ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু আমাদের মালিকপক্ষ, সম্পাদক-সাংবাদিকরা কোনো প্রকার আপস করেনি। এটা আমাদের জন্য বিশেষ গর্ব ও গৌরবের। স্বাধীন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এই ধারাবাহিকতা আমাদেরকে আশাবাদী করে।

ডেইলি বাংলাদেশ: স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসে আমাদের গণমাধ্যমের চারিত্র্য কাঠামো কতটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াল?

ড. কাজল রশীদ শাহীন: বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখনো বিকাশমান শিল্প। আমরা সৌভাগ্যবান যে, এই সময়ের মধ্যে আমরা কয়েকটি সংবাদপত্র পেয়েছি যেগুলোর সাংবাদিকতার মান আন্তর্জাতিক মানের। যদিও আমাদের সাংবাদিকতা এখনো সর্বত্রামী হয়ে ওঠেনি। তবে প্রচেষ্টা যেহেতু শুরু হয়েছে তাহলে সুন্দর আগামী নির্মিত হবেই। সংবাদপত্রশিল্পে এখনো সুস্থ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করা যায়নি। পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ও টেলিভিশনের টিআরপি নিয়ে মত-দ্বিমত রয়েছে। সংবাদপত্র কর্পোরেট কালচার যুক্ত হয়েছে ঠিকই কিন্তু তার সুবিধাদি সবক্ষেত্রে সব প্রতিষ্ঠানে নিশ্চিত করা যায়নি। কর্পোরেট কালচারের বিধি আরোপ করলে শুধু হবে না, শাসন দিলেই চলবে না, বিনিময়ে প্রাপ্তিগুলোও নিশ্চিত করতে হবে। এটা তো সবাই জানে, শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যে। সুতরাং কর্পোরেট শাসন দেন, সুবিধাটাও দেন, রোয়েদাদটা নিশ্চিত করুন, শ্রম আইনকে আমলে নিয়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করুন, তাহলে চারিত্র্যকাঠামে দাঁড়িয়ে যাবে শক্ত ও সুন্দর ভিত্তির ওপর।

ডেইলি বাংলাদেশ: সাংবাদিকতায় নতুন আসতে চান তাদের ব্যাপারে আপনার কী পরামর্শ, এদেরকে কি আপনি উৎসাহিত করতে চান, নাকি নিরুৎসাহিত করার পক্ষে?

ড. কাজল রশীদ শাহীন: সাংবাদিকতায় আসার আগে একশবার ভাবুন, প্রয়োজনে তারও অধিক। এর বিপদ-আপদ, সংকট-সম্ভাবনা সম্পর্কে খোঁজ নিন, ক্রস চেক করুন। তারপর আসুন। জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে এই তিনটা জিনিসতে বলা হয় নিয়তি নির্ভর। কিন্তু পেশাতো নিয়তির ওপর নির্ভরশীল, এখানে যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ আছে। আসুন, কিন্তু এলে যাবেন না সেটা পণ করে আসুন। আর যদি মনে করেন, এটাকে সিড়ি হিসেবে ব্যবহার করবেন, অন্য পেশায় যাওয়ার ঢাল করবেন, তাহলে সেটা হবে প্রতারণার শামিল, দয়া করে এই কাজটা করবেন না।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনাকে ধন্যবাদ আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য। আপনার সঙ্গে কথা বলে আমাদের অনেক কিছু জানা ও বোঝার সুযোগ হলো, সেইসঙ্গে পাঠকদেরও। সবশেষে জানতে চাই, দশ বছর সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানসমূহকে কোন অবস্থানে কোন পরিচয়ে দেখতে চান?

ড. কাজল রশীদ শাহীন: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ। দশ বছর পর দেখতে চাই, আমাদের সাংবাদিকতা সর্বত্রগামী হয়ে উঠছে, নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি হচ্ছে। গণমাধ্যম তার রুগ্নদশা থেকে বেরিয়ে এসেছে। সাংবাদিক-কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি দাওয়া নিশ্চিত হয়েছে। মালিক-সম্পাদক-সাংবাদিকরা মিলে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানকে পিরামিড কাঠামোর মতো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। গণমাধ্যম যতো অগ্রসর হয়, দেশ আরো সমৃদ্ধ হয়। গণমাধ্যম যত বেশি বিকশিত হবে সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, নাগরিকের ন্যায্য অধিকার তত বেশি নিশ্চিত হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই