‘নির্বাচন আইলেই সবাই খবর নেয়, নির্বাচন গেলে কেউ চেনে না’ 

ঢাকা, রোববার   ০৫ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ২১ ১৪২৮,   ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

‘নির্বাচন আইলেই সবাই খবর নেয়, নির্বাচন গেলে কেউ চেনে না’ 

রিফাত আহমেদ রাসেল, নেত্রকোনা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:২১ ২৫ নভেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৫:২০ ৪ ডিসেম্বর ২০২১

৯০ বছর বয়সী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বৃদ্ধা সুনীলা সাংমা ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

৯০ বছর বয়সী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বৃদ্ধা সুনীলা সাংমা ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

‘আমরা পাহাড়ি মানুষ, পাহাড়েরই আমাদের জীবন। জীবজন্তু-বন্যপ্রাণী সবকিছুই নিয়ে আমাদের বসবাস। পাহাড়ের মরা ডালপালা আর চাষবাস করে কোনো রকমে চলে জীবিকা। তারপরও আমাদের খবর কেউ রাখে না।’

স্বাধীনতার ৫০ বছরে পা রেখেও এখনো সাধারণ মৌলিক চাহিদার জন্য লড়াই করতে হয় প্রতিদিন। নির্বাচন আসলেই প্রার্থীদের মনগড়া কথা আর উন্নয়নের আশা দিয়ে বুক ভাসালোও, নির্বাচন গেলে চিনে না কেউ। 

ফিলিপ চাম্ভুগং। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে তিনিও ঐ গ্রামে বসবাস করে আসছেন স্বাধীনতার পর থেকেই। তবে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যাতায়াত ব্যবস্থার নামে পেয়েছেন শুধুই আশার বাণী।

এভাবেই নিজের কষ্টের কথা জানান দিচ্ছেন ৯০ বছর বয়সী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বৃদ্ধা সুনীলা সাংমা। ছোট্ট একটি ঘরে কোনো রকমে পার করছেন জীবনের শেষ সময়টুকু। সীমান্তের শেষ বাড়ি তার। বাড়ির উঠানের পর থেকেই শুরু হয়েছে ইন্ডিয়ার সীমানা। বাড়ির তিনপাশ দিয়েও পড়েছে ইন্ডিয়ান সীমানা। 

স্বাধীনতার পর থেকে এখানেই বসবাস করে কোনো রকমে টিকে রয়েছে। শুরুর দিকে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করলেও এখন স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে একমাত্র এই ঘরে তার সম্ভব। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধা থেকে এখনো বঞ্চিত তিনি। 

রাস্তাঘাট নেই যার কারণে কোনো যানবাহন এলাকায় চলে না। একটা মাত্র ব্রিজ তাও আবার ছয় বছর ধইরা ভাঙা পইরা রইছে। আমরার খবর কেউ রাখে না।

তারপর মতোই গ্রামের আরেক বাসিন্দা ফিলিপ চাম্ভুগং। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে তিনিও এই গ্রামে বসবাস করে আসছেন স্বাধীনতার পর থেকেই। তবে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যাতায়াত ব্যবস্থার নামে পেয়েছেন শুধুই আশার বাণী। এছাড়াও চিকিৎসাসেবা শিক্ষা সবকিছুই যেন তাদের কাছে কল্পনামাত্র। 

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার উত্তরে পাহাড় নদী ও অসংখ্য ঝরনাধারার ছোট্ট একটি গ্রাম ভবানীপুর। সদর ইউপির ফারাংপাড়া-ভবানীপুর-দাহাপারা-বাদামবাড়ি এই আর গ্রাম নিয়ে গঠিত একনং ওয়ার্ল্ড। তিন হাজার ভোটারের এক-তৃতীয়াংশের বসবাস ভবানীপুরে। 

৯০ বছর বয়সী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বৃদ্ধা সুনীলা সাংমা। ছোট্ট একটি ঘরে কোনো রকমে পার করছেন জীবনের শেষ সময়টুকু। সীমান্তের শেষ বাড়ি তার।

প্রায় তিন শতাধিক পরিবারের এই গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। অনেকেই বাপ-দাদার রেখে যাওয়া সম্পত্তি কিংবা বৈবাহিক সূত্রে বসবাস শুরু করেছেন প্রায় স্বাধীনতার পর থেকেই। তবে বাকি গ্রামগুলো থেকে পুরোপুরি ভিন্ন এই গ্রাম। নেই শিক্ষা, চিকিৎসা এমনকি যোগাযোগের সুব্যবস্থা। গ্রামের বাসিন্দাদের চিকিৎসাসেবা নিতে যেতে হয় প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার দূরে গিয়ে সদরে। 

ভবানীপুর সীমান্তবর্তী এলাকা। এলাকার একমাত্র ব্রিজটি দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা।

সরকারি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষার জন্য যেতে হয় ৩ কিলোমিটার দূরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। 

যাতায়াতের জন্য একটি মাত্র ব্রিজ থাকলেও গত ছয় বছর ধরে ভেঙে পড়ে আছে। শুকনা মৌসুমে নদীর চর ভেঙে কোনো রকমে চলাচল করা গেলেও বর্ষায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকে এই গ্রাম। এছাড়াও নৌকা দিয়ে পারাপার করতে গিয়েও ঘটে দুর্ঘটনা। 

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার গ্রাম ভবানীপুরের কাঁচা রাস্তা।

এই গ্রামে মৌলিক অধিকারের জন্যও লড়াই করতে হয় প্রতিদিন। সদর থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন এই গ্রামের খবর নিয়ে যেন কেউ নেই। নির্বাচন আসলেই প্রার্থীদের মুখ রচনা আশা ও প্রত্যাশা বাণী শোনালেও নির্বাচনের পর আর কেউ আসে না। এবারের নির্বাচনে নিজেদের দাবি আদায় করে নিতে মরিয়া এ গ্রামের বাসিন্দারা। 

 ভবানীপুর সীমান্তবর্তী এলাকা। এলাকার একমাত্র ব্রিজটি দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা।

সুনীলা সাংমা ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচন আইছে এখন সবাই আমরার খোঁজখবর নিতাছে। একজন বলে নৌকা মার্কায় ভোট দিতে আরেকজন কয় আনারসে ভোট দিতে। আমরা তো ভোট দিতে মন চায় না। তারপরেও কি আর করমু। ভোট দিতে যাইতে হয় তিন কিলোমিটার দূরে।’ 

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার উত্তরে পাহাড় নদী ও অসংখ্য ঝরনাধারার ছোট্ট একটি গ্রাম ভবানীপুর।

ফিলিপ চাম্ভুগং ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতিবারই আমাদের আশা দিয়া দিয়া নিরাশা করে। আমাদের গ্রামে স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো রাস্তাঘাট হয় নাই, চিকিৎসার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ যদি একটুও সুস্থ হয় তাহলে যাও যাইতে হয় দুর্গাপুরে। রাস্তাঘাট নেই যার কারণে কোনো যানবাহন এলাকায় চলে না। একটা মাত্র ব্রিজ ছিলো তাও আবার ছয় বছর ধইরা ভাঙা পইরা রইছে। আমরার খবর কেউ রাখে না। একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় গ্রামের জন্য খুবই প্রয়োজন। 

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার উত্তরে পাহাড় নদী ও অসংখ্য ঝরনাধারার ছোট্ট একটি গ্রাম ভবানীপুর।

ইউএনও রাজিব উল আহসান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ভবানীপুর সীমান্তবর্তী এলাকা। এলাকার একমাত্র ব্রিজটি দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা। আমরা স্থানীয়ভাবে ব্রিজটি মেরামতের জন্য একটি কাঠের ব্রিজ করে দিয়েছি। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয়দের কিছুটা দুর্ভোগ লাঘব হচ্ছে।

এছাড়াও ব্রিজটি দ্রুত মেরামত করার জন্য এরইমধ্যে প্রস্তাবনা প্রেরণ করেছি আশা করি, দ্রুত ব্রিজটি তৈরি হলে স্থানীয়দের দুর্ভোগ লাঘব হবে। এছাড়া গ্রামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এলাকার শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি সহজে চিকিৎসা সেবা নিতে পারবেন।  

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে