যে খাবার খেতে ৩২ কিমি হাঁটেন ভোজনরসিকরা

ঢাকা, রোববার   ০৫ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ২১ ১৪২৮,   ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

যে খাবার খেতে ৩২ কিমি হাঁটেন ভোজনরসিকরা

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:০২ ২৫ নভেম্বর ২০২১  

যে খাবার খেতে ৩২ কিমি হাঁটেন ভোজনরসিকরা। ছবি সংগৃহীত

যে খাবার খেতে ৩২ কিমি হাঁটেন ভোজনরসিকরা। ছবি সংগৃহীত

ইতালির একটি গ্রামের নাম লুলা। এই গ্রামে তৈরি এক বিরল খাবার চেখে দেখার আগে দলে দলে খাদ্যরসিক কৃচ্ছ্র সাধন করেন। সার্ডিনিয়া দ্বীপের ভূমধ্যসাগর লাগেয়া এই জনপদের সবচেয়ে কাছে নুয়োরো শহর। তবে তার দূরত্বও প্রায় ২০ মাইল। কিলোমিটারে মাপলে কিছু কম বেশি ৩২ কিলোমিটার।

ইতালির লুলা গ্রাম গ্রামের রাস্তা হলেও সেখানে গাড়ি যায়। গাড়িতে যেতে সময় লাগে ৩২ মিনিট। দিনে একটা করে ট্রেনও চলে। গন্তব্যে পৌঁছে দেয় ৪৫ মিনিটে। চাইলে কেউ সাইকেল বা বাইক নিয়ে পৌঁছতে পারেন কম সময়ে। তবে বছরের দুই দিন এ সব সুবিধার ধার দিয়েও যান না এক দল মানুষ। দীর্ঘ পথ তারা হেঁটে আসেন। রাতের অন্ধকারে সারি বেঁধে হাজারো মানুষ পা মেলান একসঙ্গে। খিদে বা ঘুমের পরোয়া না করেই। প্রায় সাত থেকে সাড়ে সাত ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছন গন্তব্যে।

 রাতের অন্ধকারে সারি বেঁধে হাজারো মানুষ পা মেলান একসঙ্গেসাধারণত অভীষ্টলাভে তীর্থ করতেই এত কষ্ট সাধন করেন মানুষ। সার্ডিনিয়ায় যার জন্য এত কিছু সেটিও ইষ্টের চেয়ে কম নয়। এমনকি তার নামেও রয়েছে ঈশ্বর। খাবারের নাম সু ফিলিন্দু। ইটালীয় শব্দ। ইংরেজিতে বলা হয় ‘থ্রেডস অফ গড’। যার বাংলা অর্থ ঈশ্বরের সূত্র। তবে এই সূত্র বা সুতা আসলে পাস্তা। মিহি সুতার মতো দেখতে বলেই হয়তো এই নাম। আর এই পাস্তা খেতেই মাইলের পর মাইল হেঁটে তীর্থ করেন ভোজনপ্রেমীরা। প্রকৃত অর্থেই পেটপুজো যাকে বলে।

 খাবারের নাম সু ফিলিন্দুকী দিয়ে তৈরি হয় এই পাস্তা? অতি পরিচিত এবং সামান্য উপকরণ- সুজির আটা, পানি এবং লবণ। তবে সে তো সব রান্নাঘরেই মজুত। তবে দাদির রান্নাঘরের তীর্থক্ষেত্র হয়ে উঠতে বাধা কীসের! বাধা বা জাদুকরী আসলে পাস্তা তৈরি করার প্রক্রিয়ায়। যা এতটাই জটিল যে, পুরো পৃথিবীতে কেবল তিন জন মাত্র নারী ঐ খাবারটি তৈরি করতে পারেন। আর এই তিন জনই সার্ডিনিয়ার বাসিন্দা। 

পুরো পৃথিবীতে কেবল তিন জন মাত্র নারী ঐ খাবারটি তৈরি করতে পারেন২১ শতকের যন্ত্রবহুল যাপনে ব্যাপারখানা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। ‘থ্রেডস অফ গডস’কেও যন্ত্রে তৈরির চেষ্টা করা হয়নি, তা নয়। পাস্তা প্রস্তুতকারী নামী সংস্থা বারিলা পাস্তা কোম্পানি ঐ জটিল প্রক্রিয়া নকল করার যন্ত্র বানানোর চেষ্টা করেছিল একাধিকবার। তবে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। তারকাপ্রতিম রন্ধনশিল্পী জেমি অলিভারও সার্ডিনিয়ার ঐ গ্রামে গিয়েছিলেন শুধু ঐ বিশেষ পাস্তা তৈরির প্রক্রিয়া শিখবেন বলে। টানা দু’ঘণ্টা চেষ্টা করার পর তিনিও হাল ছাড়েন। 

সবচেয়ে কঠিন হলো হাতের স্পর্শে আটার তালের চরিত্র বোঝাকী এমন জটিল প্রক্রিয়া? যা নকল করা যায় না! সু ফিলিন্দু তৈরির সেরা শিল্পী পাওলা আবরাইনি জানিয়েছেন, সবচেয়ে কঠিন হলো হাতের স্পর্শে আটার তালের চরিত্র বোঝা। আটার তালটিকে ততক্ষণ ঠেসতে হবে, যতক্ষণ না সেটি মূর্তি তৈরির মাটির মতে মিহি হয়ে যায়। তারপর শুরু হয় সেটিকে গোল পাকানোর প্রক্রিয়া। আটার তালের টান ভাব ছাড়তে শুরু করলেই লবণ পানিতে হাত ডোবান পাওলা। আবার নরম করার দরকার হলে ছিটে দেন সাধারণ পানিতে। 

আটার তালের টান ভাব ছাড়তে শুরু করলেই লবণ পানিতে হাত ডোবান পাওলাপাওলার কথায় এই দু’রকম পানির ভারসম্য বুঝতেই বছরের পর বছর সময় লেগে যেতে পারে। এটা একরকম সাধনা। আটার তাল কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছলে তাকে দু’হাতে টেনে টেনে তৈরি হয় পাস্তার এক একটি সুতা। এক একটি আটার তাল থেকে আট দফায় একের পর এক স্তর তৈরি করে হাতে আসে মোট ২৫৬টি ‘ঈশ্বরের সূত্র’।

সুতা আড়াআড়ি জড়ানো হয় কাঠের পাটাতনেতারপর সেই সুতা আড়াআড়ি জড়ানো হয় কাঠের পাটাতনে। কাঠে জড়ানোর পর রোদে শুকিয়ে তৈরি হয় বিশ্বের বিরলতম পাস্তা সু ফিলিন্দু। ঈশ্বরের সূত্র। যা খেয়ে দেখা ঈশ্বরকে ছুঁয়ে দেখারই শামিল। অন্তত তাই মনে করেন ভোজনরসিকরা।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ