বিরল অসুখ নিয়ে জন্ম নেয়াই অপরাধ, মা-বাবার ফেলে দেয়া মেয়েটি এখন শীর্ষ মডেল

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৫ জুন ২০২১,   আষাঢ় ১ ১৪২৮,   ০৩ জ্বিলকদ ১৪৪২

বিরল অসুখ নিয়ে জন্ম নেয়াই অপরাধ, মা-বাবার ফেলে দেয়া মেয়েটি এখন শীর্ষ মডেল

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩১ ১১ জুন ২০২১   আপডেট: ১৬:৫০ ১১ জুন ২০২১

ভোগ-এর মডেল হুয়েই অ্যাবিং

ভোগ-এর মডেল হুয়েই অ্যাবিং

সন্তানের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল বাবা-মায়ের কোল। তবে কোল ছাড়া শিশুর পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কেমন কঠিন হতে পারে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন হুয়েই অ্যাবিং। জন্মটা স্বাভাবিক হলেও। শরীরে থাকা বিরল রোগ তার বড় অপরাধ। আর দশটা শিশুর মতো তার জীবন স্বাভাবিক ছিল না। জন্মের পরই বাবা মা ফেলে গিয়েছিল হুয়েই অ্যাবিংকে।  

শরীরের রং অস্বাভাবিক রকম সাদা। সেই সঙ্গে চুল, ভ্রুও অন্য আর দশজন মানুষ থেকে তাকে আলাদা করে দেবে খুব সহজেই। জিনের অসুখ অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত হুয়েই জন্ম থেকেই। তবে শারীরিক যাবতীয় অস্বাভাবিকত্ব নিয়েই তিনি আজ খ্যাতির শিখরে। মাত্র ১১ বছর বয়স থেকেই মডেলিংয়ের দুনিয়ায় পা রেখেছেন তিনি। বর্তমানে তার বয়স ১৬ বছর। জীবনের প্রথম তিনটি বছর অনাথালয়ে কেটেছে হুয়েইয়ের।

গায়ের অস্বাভাবিক সাদা রং, সাদা চুল-ভ্রু হুয়েইকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করেছে বিশ্ব দরবারেভোগ-এর মডেল হুয়েই অ্যাবিংয়ের নামের অর্থ চীনা ভাষায় হিম সুন্দরী। অ্যালবিনিজমে রোগে শরীর নিজের স্বাভাবিক রং হারায়। ত্বকের জরুরি উপাদান মেলানিনের অভাবে স্বাভাবিকত্ব হারায় ত্বক, চুল, চোখ। দৃষ্টিশক্তিতেও এর প্রভাব পড়ে। এই রোগে আক্রান্ত হুয়েইয়ের দৃষ্টিশক্তিও মাত্র ১০ শতাংশ। বেশি আলো সহ্য করতে পারেন না তিনি। তবু সেজেগুজে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোয় তার জুড়ি নেই।

শ্যুটিংয়ের জন্য বেশি আলো জরুরি। চোখ বাঁচাতে তাই হুয়েই বেশির ভাগ ছবিই তোলেন চোখ বন্ধ করে। হুয়েইয়ের কথায়, “চোখ না বুজলে ক্যামেরার আলোয় এমনিই চোখ চেপে বন্ধ করে ফেলি। তখন ছবি বাজে ওঠে। তিনি মনে করেন, মডেলিংয়ের কাজের মধ্যে দিয়েই লাখ লাখ অ্যালবিনোকে তিনি অনুপ্রাণিত করতে পারেন। তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের জবাবও দিতে পারেন।

জন্মের পর হুয়েইকে অভিশাপ ভেবে তার বাবা-মা ফেলে গিয়েছিল এক অনাথ আশ্রমে মডেল হিসেবে অবশ্য ইতিমধ্যেই বেশ নাম করেছেন হুয়েই। ফ্যাশন দুনিয়ার প্রথম সারির পত্রিকা ভোগ-এর হয়ে মডেলিং করেছেন। ডিজাইনার মহলেও বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে তার। কাজ করেছেন দুনিয়ার সেরা ডিজাইনার এবং ফোটোগ্রাফারদের সঙ্গে। ডিজাইনারদের অনেকেরই মত, হুয়েইয়ের ত্বক-চুলের বিশেষত্বই তাকে মডেল হিসেবে চ্যালেঞ্জিং বানিয়েছে।

নিজের জন্মদিন জানেন না হুয়েই। এক বছর আগে পর্যন্ত নিজের বয়স সম্পর্কেও কোনো ধারণা ছিল না তার। হাতের এক্সরে করাতে গিয়ে চিকিৎসকরা তার বয়স সম্পর্কে একটি ধারণা পান। গত বছর হুয়েই জানতে পারেন তার বয়স ১৫-র আশেপাশে। তার জন্মের সময়ে চীনে এক সন্তান নীতি চলছিল। এক বার সন্তান হলে আর দ্বিতীয় সন্তানের জন্য সরকারি সুযোগ সুবিধা পাওয়া যেত না।

বেশি আলোতে তাকাতে পারেন না হুয়েই, তাই চোখ বাঁচাতে বেশির ভাগ ছবিই তোলেন চোখ বন্ধ করেএই পরিস্থিতিতে এই রোগ নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি। সেসময় হুয়েইয়ের বাবা-মা তাকে দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই মনে করেননি। জন্মের পরই হুয়েইকে অনাথালয়ে ছেড়ে এসেছিলেন তার বাবা-মা। হুয়েই নামকরণ করেন সেই অনাথালয়ের এক কর্মী। চীনে ‘হু’ শব্দের অর্থ বরফ। আর ‘ই’ মানে সুন্দর। হুয়েই মনে করেন, এর থেকে ভালো নাম তার আর হতেই পারত না।

দুনিয়ার সেরা ডিজাইনার এবং ফোটোগ্রাফারদের সঙ্গেতিন বছর বয়সে তাকে দত্তক নেন নেদারল্যান্ডসের এক নারী। নতুন মা এবং বোনের সঙ্গে চীন থেকে নেদারল্যান্ডসে চলে আসেন হুয়েই। ঘটনাচক্রেই মডেলিংয়ে আসেন হুয়েই। হংকংয়ের এক ডিজাইনারের সঙ্গে জানাশোনা ছিল তার মায়ের। সেই ডিজাইনার ‘পারফেক্ট ইমপারফেকশন’ নামে একটি ফ্যাশন শোয়ের আয়োজন করেন। তথাকথিত কিছু শারীরিক অস্বাভাবিকত্ব সত্ত্বেও কী ভাবে ফ্যাশনকে ভালোবাসা যায়, তা নিয়েই ফ্যাশন শো।

সেই ডিজাইনারের ছেলের ঠোঁটের সমস্যা ছিল। তিনি এমন পোশাক বানাতে চেয়েছিলেন, যাতে পোশাক ছেড়ে ঠোঁটের দিকে নজর না যায়। হুয়েইকে ওই বিশেষ ফ্যাশন শোয়ে যোগ দিতে বলেন তিনি। হুয়েই জানিয়েছেন, বছর চারেক আগের সেই অভিজ্ঞতার কথা জীবনে ভুলবেন না তিনি।

ভোগ-এর মডেল হুয়েই অ্যাবিংয়ের নামের অর্থ চীনা ভাষায় হিম সুন্দরীফ্যাশন শোয়ে নজরে পড়েন হুয়েই। পর পর ডাক পেতে শুরু করেন ফ্যাশন ফটোশ্যুটের জন্য। বেশ কিছু মডেলিং এজেন্সিও যোগাযোগ করতে শুরু করে তার সঙ্গে। তার করা একটি ফটোশ্যুটের ছবি প্রকাশিত হয় ফ্যাশন পত্রিকা ভোগ-এ। হুয়েই জানিয়েছেন, ‘ভোগ’ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না তার। কেন তাতে ছবি বেরনোর জন্য সবাই এত উৎসুক, তা তখনও জানতেনই না তিনি। তবে ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেন।

বিরল জিন রোগ অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত হন প্রতি ১৭ হাজারে একজন। হুয়েই জানিয়েছেন, এই রোগে আক্রান্তদের রীতিমতো ঠাট্টা করা হয়। অনেক সময় ভূত, ভিন্‌গ্রহী জাতীয় মন্তব্যও করা হয়। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও যে শীর্ষে যাওয়া যায় নিজের মডেলিংয়ের মধ্যে দিয়ে তার সেই বার্তা পৌঁছে দিতে চান তিনি। হুয়েইয়ের মতে, ফ্যাশন দুনিয়ায় দেখতে আলাদা হওয়া যে আসলে আশীর্বাদ তা এখন বুঝেছেন তিনি। তিনি মনে করেন, মডেলিংয়ের কাজের মধ্যে দিয়েই লাখ লাখ অ্যালবিনোকে তিনি অনুপ্রাণিত করতে পারেন। তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের জবাবও দিতে পারেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে