ফাঁস হওয়া অডিও টেপ বিতর্কে ক্ষমা চাইলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ঢাকা, রোববার   ১৩ জুন ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৩০ ১৪২৮,   ০২ জ্বিলকদ ১৪৪২

ফাঁস হওয়া অডিও টেপ বিতর্কে ক্ষমা চাইলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৫৭ ৩ মে ২০২১  

ছবি: জাভেদ জারিফ

ছবি: জাভেদ জারিফ

নিজের ফাঁস হওয়া অডিও টেপ নিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ। ইন্সটাগ্রামে দেয়া পোস্টে এ ঘটনায় ইরানের কুদস ফোর্সের সাবেক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলাইমানির পরিবারের সদস্যদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি রোববার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে বিতর্কিত ওই অডিও টেপে জারিফের মন্তব্যের সমালোচনা করেন। সর্বোচ্চ নেতার ভাষণকে মাথা পেতে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জারিফ। বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতার সহানুভূতিশীল ভাষণই আমার জন্য শেষ কথা।

রোববার রাতে নিজের ইনস্টাগ্রাম পেজে দেয়া এক পোস্টে জাভেদ জারিফ বলেন— সর্বোচ্চ নেতার বক্তব্য অতীতের যে কোনো সময়ের মতো আমার ও আমার সহকর্মীদের জন্য শেষ কথা। এই ভাষণের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত সব বিতর্কের অবসান হয়েছে।

জারিফ বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মী হিসেবে আমি সব সময় এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতাম যে, দেশের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে তা বাস্তবায়ন করাই আমাদের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, দেশের শত্রুরা আমার এমন একটি সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ প্রকাশ করেছে তার বিন্দুবিসর্গও প্রকাশ করার কথা ছিল না। প্রকাশের জন্য সাক্ষাৎকারটি রেকর্ডও করা হয়নি। তারপরও আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত ওই সাক্ষাৎকার সর্বোচ্চ নেতাকে মনোক্ষুণ্ন করেছে বলে আমি অত্যন্ত দুঃখিত।

জারিফ তার ইনস্টাগ্রাম পোস্টে লিখেছেন, ইনশাআল্লাহ এখন থেকে আমি নিজে ও আমার সহকর্মীরা ইরানকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিটি দিক-নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো।

এর আগে রোববার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে খামেনি বলেন, দুনিয়ার কোথাও কোনও দেশের পররাষ্ট্রনীতি ওই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে না। প্রতিটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের জন্য একটি উচ্চতর কর্তৃপক্ষ থাকে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সে নীতি বাস্তবায়ন করে মাত্র। আমাদের দেশে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এই নীতি নির্ধারণ করে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার নিজস্ব পদ্ধতিতে তা বাস্তবায়ন করে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট রুহানি সরকারের দুই দফায় আট বছরের শাসনামলের ‘মৌখিক ইতিহাস’ রেকর্ড করে রাখার অংশ হিসেবে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হয়। তবে সাক্ষাৎকারটি সরকারি গোপন দলিল হিসেবে সংরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও সৌদি অর্থায়নে পরিচালিত লন্ডনভিত্তিক ফার্সি টিভি চ্যানেল ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’ এই সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত কিছু অংশ প্রচার করে।

কিভাবে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হয়ে গেলো তা খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন ইরানের প্রধানমন্ত্রী হাসান রুহানি।

ফাঁস হওয়া ওই অডিও টেপে জারিফ হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ইরানের পররাষ্ট্র নীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে দেশটির প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। রাশিয়ার নির্দেশে এই বাহিনীই তেহরানকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে জড়িয়েছে।

তিন ঘণ্টার এই অডিও টেপটি বিবিসি এবং বিদেশে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের হাতে পৌঁছেছে। ধারণা করা হচ্ছে সাত ঘণ্টা লম্বা একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার থেকে এই অডিও নেয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট রুহানির ক্ষমতার দুই মেয়াদকালের মৌখিক ইতিহাস ধরে রাখার একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে দুই মাসেরও বেশি সময় আগে ওই ভিডিও সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয়েছিল।

টেপটিতে জারিফকে দুই বার বলতে শোনা যায় যে, তার মন্তব্য বহু বছর পর্যন্ত কেউ শুনতে পাবে না বা কেউ তা ছাপাবেও না। তাকে বারবার অভিযোগ করতে শোনা যায় যে, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইরানের পররাষ্ট্র নীতিকে ওই এলাকার রণাঙ্গনে তাদের প্রয়োজনীয়তার একটা অংশ করে তুলেছে।

তিনি বিশেষ করে উল্লেখ করেন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের সাবেক অধিনায়ক কাসেম সোলাইমানি কীভাবে প্রায়ই তার সঙ্গে দেখা করে বলতেন কী করতে হবে। গত বছর জানুয়ারি মাসে ইরাকে আমেরিকান ড্রোন হামলায় নিহত হন কাসেম সোলেইমানি।

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে জারিফের বৈঠকের সময় সোলাইমানি চাইতেন তিনি একটা বিশেষ অবস্থান নিন। এই জেনারেল সোলাইমানি কার্যত ইরানকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছেন বলেও মন্তব্য করেন জারিফ। কারণ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চেয়েছিলেন, সিরিয়া সরকারকে সমর্থন করে রাশিয়া যে বিমান হামলা চালাবে তাতে সহায়তার জন্য ইরানি বাহিনী যেন স্থলযুদ্ধে অংশ নেয়।

সোলাইমানি ইরানের জাতীয় বিমান সংস্থা ইরান এয়ারের বিমান ব্যবহার করেছেন সামরিক কাজে বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়ে। এতে রাষ্ট্রের সম্মানহানি হতে পারে সেটা জেনেও তিনি এমন কাজ করেছেন। বেসামরিক বিমানে বন্দুক ও সামরিক আগ্নেয়াস্ত্র বহন করা হয়েছে এবং সেনা পরিবহন করা হয়েছে।

জাভেদ জারিফ বলেন, রাশিয়াসহ বিশ্বের ছয় শক্তিধর দেশের সঙ্গে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিতে ইরান যাতে রাজি না হয়, তার জন্য যা যা করা সম্ভব তার সব চেষ্টাই করেছিলেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। মস্কো কখনও চায়নি যে, পশ্চিমের সঙ্গে ইরানের একটা সমঝোতা হোক।

তার এই মন্তব্য বিস্ময়কর। কারণ সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে ল্যাভরভের সঙ্গে জারিফের একটা ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং রাশিয়া ইরানের খুবই ঘনিষ্ঠ মিত্র। এই টেপ ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটেছে এমন একটা সময়ে যখন ভিয়েনায় পরমাণু চুক্তি পুনরুদ্ধারের এক পরোক্ষ আলোচনা চলছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে ইরানের ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর এবং এর জবাবে ইরান চুক্তির শর্ত ভঙ্গ শুরুর ফলে ২০১৫ সালের চুক্তিটি ভেঙে পড়ার মুখে পড়েছিল।

জারিফ বলছেন, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী কখনও এই চুক্তি চায়নি এবং এটা আটকানোর জন্য তারা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছিল। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়েও কথা বলেন জারিফ। তিনি বলেন, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের গায়ে হিব্রু ভাষায় লিখে দিয়েছিল, ‘ইসরায়েলের নাম দুনিয়া থেকে মুছে ফেলা হোক।’

২০১৬ সালের গোড়ার দিকে পারস্য উপসাগরে দুই টহল নৌকায় ১০ মার্কিন নাবিককে আটক রাখা নিয়েও কথা বলেন জারিফ। এই দুই ঘটনা পরমাণু সমঝোতা আটকে দেয়ার চেষ্টার উদাহরণ ছিল বলে জানান জাভেদ জারিফ।

বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বহুবার তাকে পাশ কাটিয়ে কাজ করেছে। তিনি ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি সকালের দিকের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন যখন কাসেম সোলাইমানির মৃত্যুর বদলা নিতে ইরাকি একটি সেনাঘাঁটিতে হামলা চালায় ইরান। ওই ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর সদস্য এবং এক ডজনের বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। ওই হামলা চালানোর দুই ঘণ্টা পর তিনি এই খবরটি জানতে পারেন।

সেদিনই আরও পরের দিকে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট যখন আপাতদৃষ্টিতে ভুলক্রমে ইউক্রেনের একটি যাত্রীবাহী বিমান গুলি করে ভূপাতিত করে, তখন অধিনায়করা তাকে শুধু বলেছিলেন ইরানের সংশ্লিষ্টতার কথাটা তিনি যেন অস্বীকার করেন। ওই যাত্রীবাহী বিমানটি সবেমাত্র তেহরান থেকে উড্ডয়ন করেছিল এবং বিমানের ১৭৬ যাত্রীর প্রত্যেকেই এতে নিহত হয়।

এই টেপ নিয়ে এখন চলছে তুমুল হৈচৈ। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই বক্তব্য ব্যাপক বিস্ময় তৈরি করেছে, অনেককে হতভম্ব করেছে এবং এ নিয়ে তৈরি হয়েছে শোরগোল।

তার এই বক্তব্য থেকে যেটা প্রকাশ পেয়েছে, সেটা বহুদিন থেকেই ইরানের অনেক মানুষ সন্দেহ করছিলেন। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই মন্তব্য এসেছে খোদ জারিফের মুখ থেকে, যিনি একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক। সাধারণত খুবই সতর্কতার সঙ্গে তিনি কথা বলেন এবং রাজনীতিতে তিনি একজন মধ্যপন্থী হিসেবে বিবেচিত।

এই টেপ কে ফাঁস করেছে তা স্পষ্ট নয়। তবে এটা ঘটেছে যখন ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই একটা নতুন মাত্রা নিয়েছে।

জারিফ বলেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির উত্তরসূরী হওয়ার লড়াইয়ে নামছেন না। কিন্তু কট্টরপন্থীরা তাকে বিশ্বাস করেন না এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সব রকম পথ তারা বন্ধ করে দিতে চান।

যেটা স্পষ্ট সেটা হলো, ফাঁস হওয়া এই টেপ চরম বিপাকে ফেলবে ইরানের এই শীর্ষ কূটনীতিককে, বিশেষ করে কট্টরপন্থীদের এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে তার সম্পর্ক বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।

রোববার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত খামেনির বক্তব্যে সেটি আরও স্পষ্ট হয়েছে। যদিও জারিফ সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ মেনে চলার কথা জানিয়েছেন।

দেশটির সব রকম সরকারি কর্মকাণ্ডে শেষ কথা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনিই দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ফোর্স বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেন।

সূত্র: পার্স টুডে, বিবিসি, এনপিআর

ডেইলি বাংলাদেশ/মাহাদী