মৃত্যুর ২৪ বছর পর ফের আলোচনায় ডায়ানা

ঢাকা, শনিবার   ১৭ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ৪ ১৪২৮,   ০৪ রমজান ১৪৪২

মৃত্যুর ২৪ বছর পর ফের আলোচনায় ডায়ানা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৩৫ ৯ মার্চ ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মৃত্যুর ২৪ বছর পর আবারো আলোচনায় উঠে এলেন প্রিন্সেস ডায়ানা। ব্রিটেনের রাজপরিবারের প্রকট বর্ণবাদ ও বর্ণবৈষম্য নিয়ে তার পুত্র এবং পুত্রবধূ হ্যারি-মেগানের বিস্ফোরক মন্তব্যের পর ফের আলোচনায় উঠে আসেন তিনি। কারণ হ্যারি-মেগানের মতো তার একটি সাক্ষাৎকারও বিশ্বে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ওই সাক্ষাৎকারের পর ডায়ানাকে তার ফলও ভোগ করতে হয়েছিল। এবার হ্যারি-মেগানের কপালে কী জোটে সেটাই দেখার বিষয়। যদিও ডায়ানার সেই সাক্ষাৎকার নিয়ে তদন্ত করছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

বিবিসির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্যানোরমার জন্য ডায়ানার সেই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক মার্টিন বশির। ১৯৯৫ সালে সম্প্রচারিত সেই সাক্ষাৎকারে ডায়ানা বলেছিলেন যুবরাজ চার্লসের সঙ্গে ভেঙে পড়া তার দাম্পত্যের কথা। ডায়ানার কথায় উঠে এসেছিল চার্লসের সঙ্গে ক্যামিলা পার্কারের দীর্ঘ প্রেমের কথা। পাশাপাশি ডায়ানা এটাও স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি চার্লসের পাশাপাশি অন্য পুরুষের সঙ্গেও প্রণয়ে লিপ্ত।

ষোড়শী ডায়ানাকে প্রথমবার চার্লস দেখেছিলেন ১৯৭৭ সালে। তখন ডায়ানার দিদি লেডি সারার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল চার্লসের। কিন্তু ডায়ানার সঙ্গে আলাপের পর থেকে ঘুরে যায় প্রেমের অভিমুখ। চার বছর প্রেমপর্বের পরে ১৯৮১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাগদান। নিজের এনগেজমেন্ট রিং নিজেই পছন্দ করেছিলেন ডায়ানা। বাগদানের চার মাস পরে বিয়ে। চার্লস-ডায়ানার রূপকথাসম সেই বিয়ে হয়েছিল ১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে এবং প্রথা ভেঙে। সেই বিয়ের ১৬ বছর পরে বিবিসিতে ডায়ানার বিস্ফোরক সেই সাক্ষাৎকারের দর্শকও সেই সময়ের নিরিখে ছিল রেকর্ড সংখ্যক। ২ কোটি ২৮ লাখ দর্শক শুনেছিলেন যেখানে ডায়ানা বলেছিলেন তার রূপকথার মতো দাম্পত্যে কীভাবে ঘুণ ধরেছিল।

মাত্র ৩৬ বসন্তের জীবনে আভিজাত্য ও জনপ্রিয়তা সবসময়েই সঙ্গী ছিল লেডি ডায়ানার। ১৯৬১ সালের ১ জুলাই তার জন্ম নরফোকের বিখ্যাত স্পেনসার পরিবারে। বংশপরম্পরায় তারা ছিলেন আর্ল। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে এই অভিজাত বংশের সুসম্পর্কও বহু দশকের প্রাচীন। বয়সে ১৩ বছরের বড় যুবরাজ চার্লসকে বিয়ের পরে ডায়ানার উপাধি হয় ‘প্রিন্সেস অব ওয়েলস’। বিয়ের আগে শিক্ষিকার চাকরি করতেন। সেটি ডায়ানা ছেড়ে দেন বিয়ের সময়ে। বিয়ের পরের বছর ২১ জুন জন্ম হয় চার্লস-ডায়ানার বড় ছেলে প্রিন্স উইলিয়ামের। তার দুই বছর পরে ১৯৮৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেন প্রিন্স হ্যারি। রাজপরিবারের লালফিতের ফাঁসের বাইরে ছেলেদের বড় করতে চেয়েছিলেন ডায়ানা।

ছেলেদের প্রথম নাম থেকে তারা কোন স্কুলে পড়বে সব সিদ্ধান্ত ছিল তারই। যখনই সময় পেতেন, প্রোটোকল ভেঙে নিজেই যেতেন ছেলেদের স্কুলে। চেষ্টা ছিল সন্তানদের খোলা হাওয়ার পরিবেশে বড় করতে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে ডায়ানার ছোটবেলা ছিল বিধ্বস্ত। তাই তিনি নিজের সন্তানদের একটা সুস্থ ও স্বাভাবিক শৈশব দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আরও অনেক ইচ্ছের মতো ডায়ানার এই স্বপ্নও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

ডায়ানা নিজেও পছন্দ করতেন রাজপরিবারের লাল ফিতের ফাঁসের বাইরে উন্মুক্ত পরিবেশ। নিজের জন্মভূমি তথা বিশ্ববাসীর ভালোবাসা পেলেও ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে তার দূরত্ব ক্রমেই বেড়েছে। বিয়ের পাঁচ বছর পর থেকেই প্রকাশ্যে চলে আসে চার্লস-ডায়ানা সম্পর্কের শৈত্য। সাবেক বান্ধবী ক্যামিলা পার্কারের সঙ্গে চার্লসের সম্পর্ক নতুন করে গাঢ় হয়। অন্য দিকে ডায়ানার নাম জড়িয়ে যায় মেজর জেমস হেউইটের সঙ্গে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাবেক ক্যাভালরি অফিসার হেউইট ছিলেন রাজপরিবারের রাইডিং অফিসার। যুবরানির সঙ্গে সম্পর্কের কথা তিনি নিজেও স্বীকার করেছিলেন। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েডে এই সন্দেহও প্রকাশ করা হয় যে, প্রিন্স হ্যারির জন্মদাতা আসলে হেউইট! কারণ দুই জনের চেহারার সাদৃশ্য।

অভিযোগ অস্বীকার করে হেউইট জানান, হ্যারির জন্মের দুই বছর পরে তার এবং ডায়ানার সম্পর্ক শুরু হয়। এখানেই শেষ নয়। শিল্পসামগ্রীর ডিলার প্রয়াত অলিভার হোয়ারের সঙ্গেও ডায়ানার প্রেম নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়। তবে এই সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে ডায়ানার দাবি ছিল, অলিভার আর তিনি ছিলেন শুধুই ভালো বন্ধু। পরবর্তীতে ব্রিটিশ-পাকিস্তানি হার্ট সার্জন হাসনাত খানের সঙ্গেও প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন ডায়ানা। অন্যদিকে, ডায়ানা তার বিয়ে ভাঙার জন্য আঙুল তুলেছিলেন ক্যামিলা পার্কারের দিকে। পাশাপাশি একাধিক সম্পর্কে চার্লস লিপ্ত ছিলেন বলেও ইঙ্গিত করেন ডায়ানা। এই চাপানউতোরের পাশাপাশি বিবিসিকে দেয়া ওই সাক্ষাৎকারে ডায়ানা অকপটে স্বীকার করেছিলেন তার মানসিক সমস্যার কথা।

ডায়ানা বলেছিলেন, তিনি নিজেই নিজেকে আঘাত করতেন। তার এই মানসিক দ্বন্দ্বের কথা সমর্থন করেছিল ঘনিষ্ঠ বৃত্তও। ১৯৯৫ সালের ২০ নভেম্বর বিবিসিতে সম্প্রচারিত ঐ সাক্ষাৎকার মোটেও ভালোভাবে নেয়নি বাকিংহাম প্রাসাদ। ঠিক এক মাস পরে প্রাসাদসূত্রে জানানো হয়, চার্লস এবং ডায়ানাকে বিচ্ছেদের পরামর্শ দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।

১৯৯৬ সালের ২৮ আগস্ট বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয় চার্লস-ডায়ানার। বিচ্ছেদের কারণ এবং শর্ত প্রকাশ না করার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হন দুই জনই। ডায়ানা নামের পাশ থেকে চলে যায় ‘হার রয়্যাল হাইনেস’ সম্বোধন। সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর মা হিসেবে তিনি রয়ে যান শুধুই ‘প্রিন্সেস অব ওয়েলস’ হয়ে।

রাজ সম্বোধন নিয়ে মোহ ছিল না ডায়ানার। শোনা যায়, রানির ইচ্ছে ছিল ডায়ানা বিচ্ছেদের পরেও ‘হার রয়্যাল হাইনেস’ ব্যবহার করুক। কিন্তু যুবরাজ চার্লস সেটা চাননি। প্রিন্স উইলিয়াম নাকি মাকে বলেছিলেন, তিনি যখন রাজা হবেন, হারিয়ে যাওয়া ‘রয়্যাল হাইনেস’ উপাধি তাকে ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু সে সুযোগ আর দেননি ডায়ানা। বিচ্ছেদের ঠিক পরের বছর ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট প্যারিসের বিখ্যাত পদেআলমা সুড়ঙ্গে গাড়ি দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। পাপারাজিদের হাত থেকে বাঁচতে ঝড়ের বেগে চলছিল গাড়ি। তখনই এই দুর্ঘটনা। ডায়ানার সঙ্গেই মারা যান তার প্রেমিক মিশরীয় ধনকুবের ডোডি ফায়েদ এবং গাড়ির চালক অঁরি পল। তবে প্রাণে বেঁচে যান ডায়ানার দেহরক্ষী ট্রেভর রিজ জোনস।

কেউ কেউ আবার ডায়ানার এই দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলতে রাজি ছিলেন না। তারা রাজপ্রাসাদের ওপরই অভিযোগ তুলেছিলেন। যদিও বাকিংহাম প্যালেস সব সময়ই সেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএএইচ