মাত্র এক ভোটে নির্ধারিত হয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্রের যে নির্বাচনের ফল

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৪ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১০ ১৪২৭,   ০৭ রবিউস সানি ১৪৪২

মাত্র এক ভোটে নির্ধারিত হয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্রের যে নির্বাচনের ফল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৫৮ ২৬ অক্টোবর ২০২০  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিলো দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও বিতর্কিত নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ ও আল গোরের মধ্যে এই নির্বাচনে ভোট গণনা নিয়ে তৈরি হয়েছিলো তীব্র বিবাদ। অনেক আইনি লড়াইয়ের পর নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এসেছিলো দেশটির সুপ্রিম কোর্ট থেকে।

ওই নির্বাচনের মতো নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্র আর কখনো দেখেনি। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান এতটাই কম আর কখনো ছিলো না। নির্বাচনের ফল ঘিরে এক মাস ধরে চলেছিলো অনেক নাটকীয় ঘটনা।

২০০০ সালের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন আল গোর। এর আগে তিনি প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে আট বছর ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। আর রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ছিলেন জর্জ ডাব্লিউ বুশ। তিনি আগে টেক্সাসের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি আশা করছিলেন, তার বাবা জর্জ বুশের মতো তিনিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবেন। কিন্তু নভেম্বরের ৭ তারিখে ভোটের দিন পর্যন্ত এই নির্বাচনে কে জিতবে কিছুই বোঝা যাচ্ছিলো না। কারণ জনমত জরিপে দুইজনের ব্যবধান ছিলো খুবই কম।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ইলেক্টোরাল কলেজ বলে যে পদ্ধতি চালু আছে তাতে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিটি রাজ্যের জন্য ঠিক করা হয় ইলেক্টোরাল ভোটের সংখ্যা। কিছু রাজ্যের ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটের সংখ্যা মাত্র তিনটি বা চারটি। আবার বড় রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটের সংখ্যা ৫০ এর বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যালট পেপার একেক রাজ্যে একেক রকম। এমনকি তাদের ভোট দেয়ার নিয়ম-কানুনও একেক জায়গায় একেক রকম। একই রাজ্যেই হয়তো কোনো জেলায় ভোট নেয়া হচ্ছে ইলেকট্রনিক মেশিনে, কোথাও ব্যালট পেপারে ক্রস চিহ্ন দিয়ে। কোথাও হয়তো একটি পেপারে ছিদ্র করে তারা চিহ্ণিত করছে কাকে ভোট দিচ্ছে। এটিকে বলে চ্যাড।

২০০০ সালে ফ্লোরিডার ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট ছিলো ২৫টি। তাই ওই নির্বাচনে অন্য সব রাজ্যের ফলে যখন দুই প্রার্থীর ব্যবধান খুবই কম তখন ফ্লোরিডাতেই এই নির্বাচনের ফল নির্ধারিত হতে যাচ্ছিলো। যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন টাইম রাত ৮টার সময় বড় কয়েকটি টিভি নেটওয়ার্ক ঘোষণা করে যে, ফ্লোরিডায় জিতেছেন আল গোর। তার মানে তিনিই প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন।

এই খবর শুনে আল গোর শিবিরের কর্মীরা একে অন্যকে আলিঙ্গন করছিলো। আল গোর তার হাতটা নিজের মাথার ওপর রেখে বললেন, এটি আসলেই একটা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু তারপরই আল গোরের কাছে ফোন কল আসতে লাগলো তার ক্যাম্পেইন ম্যানেজারের কাছ থেকে। ক্যাম্পেইন ম্যানেজার জানায়, এই ফল বারবার পাল্টে যাচ্ছে। তারপর সাংবাদিকরাও বলতে শুরু করলো, ফ্লোরিডায় অনেক বড় ঝামেলা আছে।

পরবর্তীতে বোঝা যায়, টিভি নেটওয়ার্কগুলো তাড়াহুড়া করেই আল গোরকে নির্বাচিত ঘোষণা করে দিয়েছে। নির্বাচনের ফল নিয়ে অব্যাহতভাবে চলছিলো বিভিন্ন জল্পনা। সেই সঙ্গে বিভ্রান্তিও। পুরো ব্যাপারটি নিয়ে সবাই তখন প্রচন্ড স্নায়ু চাপে ভুগছে।

মধ্যরাতের পর টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো উল্টা ফল ঘোষণা করতে লাগলো, তারা বললো ফ্লোরিডায় আসলে জিতেছেন জর্জ ডাব্লিউ বুশ। তখন আল গোর শিবিরে যেন বিপর্যয় নেমে এলো। স্থানীয় সময় রাত আড়াইটার দিকে আল গোর তার বেডরুমে গিয়ে বুশকে ফোন করলেন এবং পরাজয় স্বীকার করলেন। বুশকে অভিনন্দন জানালেন তিনি।

এরপর আল গোর যখন হার স্বীকার করে বক্তৃতা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন তার টিমের কাছে একটি বার্তা এলো। তার দলের এক কর্মীর কাছে একটি ম্যাসেজ আসলো ক্যাম্পেইন ম্যানেজারের কাছ থেকে। ম্যাসেজে বলা হলো, আল গোরকে যেন অনুষ্ঠান মঞ্চে যেতে দেয়া না হয়। কারণ ভোটের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু আল গোর চাইছিলেন, তিনি মঞ্চে গিয়ে বক্তৃতা দেবেন। তিনি বলছিলেন, লোকজন দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছে। আমি সবাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই।

এরপর এক লোক সবার সামনে গিয়ে বললেন, মাইক রেডি নয় কাজেই সবাই আবার বাইরের কক্ষে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। এরপর তিনি আল গোরকে জানালেন, ফ্লোরিডার ব্যাপারটি এখনো শেষ হয়নি। তখন আল গোর বললেন, কী বললে? এরপরই সেখানকার লোকজন উল্লাসে ফেটে পড়লো। আল গোর তখন জানতে চাইলেন, আসলেই তাই? তুমি মজা করছো না তো?

এরপর ফ্লোরিডার আদালতে শুরু হলো কয়েক সপ্তাহব্যাপী এক আইনি লড়াই। পুরো দেশ ও পুরো বিশ্ব তখন অপেক্ষা করছে কে হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।

ভোট পুনরায় গণনার সময় কয়েকটি সমস্যা দেখা দিলো। বিশেষ করে যেসব ব্যালট পেপারে ছিদ্র করা হয়েছে সেগুলোতে। সেগুলোকে বলা হয় চ্যাড। একটি ব্যালটে যদি ছিদ্রটা পুরোপুরি না করা হয়ে থাকে সেটিকে কি গোনা হবে কিনা সেটি নিয়ে। সেগুলোকে বর্ণনা করা হচ্ছিলো ঝুলে থাকা বা নড়তে থাকা চ্যাড বলে। ফ্লোরিডার কিছু অংশে ব্যবহার করা হয়েছিলো বাটারফ্লাই ব্যালট। এটি আসলে দুই পাতার এক ভোটিং স্লিপ। সেখানে প্রার্থীদের নাম বাম ও ডানদিকে ছড়ানো। আর চ্যাড বা ছিদ্র করতে হবে মাঝখানে। সমালোচকরা বলছিলেন, অনেকে ভুল করে ভুল প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বসেছেন।

কর্তৃপক্ষকে তখন প্রতিটি ভোট হাতে গুণতে হয়েছে। রিপাবলিকানরা চাইছিলো ভোট পুনঃগণনার কাজটি যেন থামানো যায়। তারা ফ্লোরিডার আদালতে গেলো। আদালত ভোট পুনরায় গণনার পক্ষে রায় দিলো।

এই পুরো বিষয়টির জন্য তখন আল গোরের সমালোচনা চলছিলো। তিনি হার স্বীকার করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। হেরে গিয়ে অভিযোগ তুলছেন, ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ করছেন বলেও মন্তব্য করে অনেকে।

ফ্লোরিডার সর্বোচ্চ আদালত রায় দিলো, প্রতিটি ভোট হাতে গুণতে হবে। কিন্তু ১২ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই রায় উল্টে দিলো। সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন বিচারকের ৫ জন ভোট দিলেন ভোট পুনঃগণনা বন্ধ করার পক্ষে ও চারজন বিপক্ষে।

আদালত ভোটের প্রথম ফলকেই সঠিক বলে রায় দিলেন। অর্থাৎ ফ্লোরিডায় জর্জ ডাব্লিউ বুশই জিতেছেন। এর ফলে ফ্লোরিডার সবগুলো ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট পেয়ে গেলেন জর্জ ডাব্লিউ বুশ। তার মোট ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট দাঁড়ালো ২৭১। প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য যত ভোট দরকার তার চেয়ে এক ভোট বেশি পেয়েছিলেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে আল গোরের হোয়াইট হাউসে যাওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলো। এভাবেই সৃষ্টি হয় এক ইতিহাসের। ওই রায়ের পর জর্জ ডাব্লিউ বুশ হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৩ তম প্রেসিডেন্ট। ২০০৪ সালেও তিনি খুব সহজে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সূত্র- বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএমএফ