বন্দি হত্যার ভিডিও প্রকাশ, যুদ্ধাপরাধের তদন্ত দাবি আর্মেনিয়ার

ঢাকা, বুধবার   ২৫ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১১ ১৪২৭,   ০৮ রবিউস সানি ১৪৪২

নাগোর্নো-কারাবাখ সংঘর্ষ

বন্দি হত্যার ভিডিও প্রকাশ, যুদ্ধাপরাধের তদন্ত দাবি আর্মেনিয়ার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১১ ২৫ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৯:২২ ২৫ অক্টোবর ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বিতর্কিত নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চলে আজারবাইজানের সেনাবাহিনী ও জাতিগত আর্মেনিয়ানদের মধ্যে চলতে থাকা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ সংঘটন হওয়ার কিছু ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। একটি ম্যাসেজিং অ্যাপে পোস্ট করা এক ভিডিওতে দেখা গেছে, সেনাবাহিনীর পোশাক পরা আর্মেনিয়ার দুই সদস্য আজারবাইজানের সেনাবাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন। আরেকটি ভিডিওতে ওই দুই আর্মেনীয় সেনাদের হাত বাঁধা অবস্থায় গুলি করতে দেখা গেছে। এটিকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর তদন্তের দাবি জানিয়েছে আর্মেনিয়া।

আর্মেনিয়ার মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা আরমান তাতোইয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্দিদের হত্যা করার ঘটনাকে অনস্বীকার্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ভিডিওগুলোতে দেখা যায় যে, আজারবাইজানের সেনাবাহিনীর সদস্যরা বন্দিদের অপমান করে এবং চূড়ান্ত অপমানের মধ্য দিয়ে তাদের হত্যা করেছে।

তিনি জানান, ইউরোপীয় আদালতে আর্মেনিয়ার প্রতিনিধি এরইমধ্যে ওই ভিডিওগুলোর কপি চেয়েছেন। তিনি ওই ভিডিওগুলোর কপি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার, ইউরোপীয় কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষকে পাঠাবেন বলেও জানিয়েছেন।

নিহত হওয়া ওই দুই ব্যক্তিকে শনাক্ত করার পাশাপাশি তাদের পরিচয়ও প্রকাশ করেছে আর্মেনিয়ার কর্তৃপক্ষ।

ইউরোপের মানবাধিকার পরিস্থিতি নজরদারির কাজে নিয়োজিত শীর্ষ সংস্থা কাউন্সিল অব ইউরোপ নিশ্চিত করেছে যে, তারা ভিডিওটি হাতে পেয়েছে। তারা ভিডিওটিতে ধারণ করা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করবে বলেও জানান।

এর আগে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে আবারো যুদ্ধে জাড়িয়ে পড়ে প্রতিবেশী দুই দেশ আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান। গত কয়েক দশকের মধ্যে নাগোর্নো-কারাবাখকে নিয়ে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত এটি। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষেরই শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। ১৯৯৪ সালে একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ছয় বছরের সংঘাতের অবসান হওয়ার পর এটি সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতা। নাগোর্নো-কারাবাখ নিয়ে গত চার দশক ধরে এই দুই দেশ দ্বন্দ্বে লিপ্ত। নাগোর্নো-কারাবাখ আজারবাইজানের বলেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণ করে জাতিগত আর্মেনিয়ানরা।

এদিকে, গত ১০ অক্টোবর প্রথম দফায় ও ১৮ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হয়। তবে এরপরেও সংঘাত অব্যাহত থাকে। এরইমধ্যে ওই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষকে ঘরছাড়া হতে হয়েছে।

আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের সেনাবাহিনীর যুদ্ধবন্দী ও প্রতিপক্ষের সেনাদের মরদেহের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছে বলে দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যুদ্ধবন্দীদের আঘাত করা ও হত্যা করার যেই ভিডিওগুলো প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো থেকে মাত্র দুইটি ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে পেরেছে বিবিসি।

টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে আজারবাইজানের এক যুদ্ধবন্দিকে এক আর্মেনীয় সেনার দ্বারা গুলিবিদ্ধ হতে দেখা যায়। কিন্তু ওই ভিডিওটি আসলে রাশিয়ার একটি ভিডিও যা ২০১৩ সালে প্রথমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা হয়েছিলো।

বিবিসি যে ভিডিও দুইটো যাচাই করতে পেরেছে সেগুলো টেলিগ্রামে আজারবাইজানের সমর্থক একটি নামহীন রুশ চ্যানেলে গত সপ্তাহে প্রকাশ করা হয়েছিলো।

প্রথম ভিডিওতে দুইজন আর্মেনিয়ার নাগরিককে বন্দি করার চিত্র দেখা যায়। ওই ভিডিওতে আজারবাইজানের বাচনভঙ্গিতে রুশ ভাষায় আদেশ দিতে শোনা যায় এক ব্যক্তিকে। তিনি বন্দিদের অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। প্রথম ভিডিওর পরপরই দ্বিতীয় ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়, যেখানে ওই দুই বন্দিকে হত্যার দৃশ্য দেখা যায়। দুইজন বন্দির হাত পেছন থেকে বাঁধা ছিলো ও তাদের শরীর আর্মেনিয়া ও অস্বীকৃত অঞ্চল নাগোর্নো-কারাবাখের পতাকায় আবৃত ছিলো।

ভিডিওতে আরো দেখা গেছে, তারা ছোট একটি দেয়ালের ওপর বসে ছিলো। তখন আজারবাইজানি ভাষায় কেউ একজন নির্দেশ দেয় যে, তাদের মাথায় তাক করো। এরপর একাধিক গুলির শব্দ শোনা যায় এবং দুই বন্দিকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখা যায়।

বিবিসি নিশ্চিত করেছে যে দুই ভিডিওতেই নির্দেশ প্রদানকারী ব্যক্তি আঞ্চলিক বাচনভঙ্গিতে কথা বলা আজারবাইজানি নাগরিক। আর প্রথম ভিডিওতে দেখতে পাওয়া বন্দিদেরই দ্বিতীয় ভিডিওতে হত্যা করা হয়।

এদিকে, এই ভিডিওকে ভুয়া বলে দাবি করেছে আজারবাইজান। আজারবাইজানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভিডিওগুলোকে ভুয়া হিসেবে দাবি করে অভিযোগ তুলেছে যে, এই ধরনের ভিডিও প্রকাশ করে উস্কানি দেয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, প্রকাশিত হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিডিও ক্লিপগুলো সরিয়ে নেয়া হয়। এরপরদিনই আজারবাইজানের প্রসিকিউটর জেনারেল ঘোষণা দেন যে, ওই ভিডিওগুলো যে ভুয়া সেটি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন তারা।

প্রকাশিত হওয়া দুইটি ভিডিও যাচাই করে বিবিসি নিশ্চিত হতে পেরেছে যে, সেগুলো হাদরুত অঞ্চলে নেয়া হয়েছে। দক্ষিণ নাগোর্নো-কারাবাখের ফুজুলি অঞ্চলের কাছের ওই শহরে যুদ্ধ হয়েছিলো। ৯ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে কোনো এক সময় ভিডিওগুলো রেকর্ড করা হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

গত ৯ অক্টোবর আজারবাইজান হাদরুত শহরের দখল নেয়ার দাবি করলেও তার তিনদিন পরও শহরটির দখলকে কেন্দ্র করে তীব্র যুদ্ধ হয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে।

উল্লেখ্য, বেলিংকাট ওপেন সোর্স তদন্তকারীরাও প্রথমবার ওই ভিডিওগুলোর সত্যতা নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভিডিওতে আটক হওয়া দুই ব্যক্তি আর্মেনিয়ার যোদ্ধা যারা ৯ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে আজারবাইজানের সেনাদের হাতে আটক হয়েছিলো। তারা সম্ভবত স্পেশাল ফোর্সের হাতে আটক হয়েছিলো। আটক হওয়ার অল্প সময় পরই তারা মারা গেছেন বলেও জানানো হয়।

আজারবাইজানের অনলাইন মন্তব্যকারীরা ওই ভিডিও ক্লিপের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করলেও বিবিসি যেসব সেনা বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারা মনে করেন যে ভিডিওটি আসল। সাবেক ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বিবিসিকে নিশ্চিত করে বলেন, এগুলো আসল বুলেট এবং এটি আসল হত্যাকাণ্ড। এটিকে সাজানো মনে করার কোনো কারণ আমি দেখি না। এছাড়া একটি গুলির ক্ষত থেকে মাথার মগজ সদৃশ বস্তু বের হয়ে আসতেও দেখা গেছে বলে জানান তিনি।

সূত্র- বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএমএফ