পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় ক্ষুব্ধ ভারতীয় চাষিরা

ঢাকা, বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৩ ১৪২৭,   ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় ক্ষুব্ধ ভারতীয় চাষিরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:৪১ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ভারতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর অনির্দিষ্টকালের জন্য পেঁয়াজ রফতানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেদিন সন্ধ্যায় এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পেঁয়াজ-চাষিদের মধ্যে।

ভারতে পেঁয়াজের জন্য বিখ্যাত উমরান, লাসালগাঁও, সাতানা ও নাগপুরের বাজার। সেখানে নিলামে পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দিয়ে সরকারি এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে বাজারের কর্তৃপক্ষ। উমরানের ক্ষুব্ধ কৃষকরা মুম্বাই ও আগ্রা জাতীয় মহাসড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়।

দুশ্চিন্তায় ডুবে আছেন এক পেঁয়াজ-চাষি

বিক্ষোভকারীরা বলেন, চাষিদের ধ্বংস করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কেন্দ্রীয় সরকার। ১০ গ্রাম সোনার দাম যখন ৫০ হাজার রুপিতে পৌঁছালো, এক কেজি মাংসের দাম ৭০০ রুপি হলো এসব খাতে তখন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। তাহলে চাষিরা যখন পাঁচ/ছয় রুপি কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি করছিলো তখন কি করছিলেন তারা।

দুশ্চিন্তায় ডুবে আছেন এক পেঁয়াজ বিক্রেতা

মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজ-চাষি সমিতির প্রেসিডেন্ট ভারাত দিঘল পেঁয়াজ রফতানি নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেয় তাহলে বাজারে পেঁয়াজ আনবে না চাষিরা। এছাড়া এক গাড়ি পেঁয়াজও মহারাষ্ট্রের বাইরে যাবে না বলে জানান তিনি। এর ফলে পেঁয়াজের অভাব দেখা দিলে এবং দাম বেড়ে গেলে সরকার দায়ী থাকবে বলেও উল্লেখ করেন ভারাত দিঘল। চাষিরা এবার আর মাথা নত করবে না বলেও জানান তিনি।

চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে প্রতি কেজি পেঁয়াজ চার থেকে ছয় রুপি দরে বিক্রি করে আসছে পেঁয়াজ-চাষিরা। কিন্তু এক কেজি পেঁয়াজ উৎপাদন করতে তাদের খরচ হয় ২০ রুপির মতো। গত বছর ভালো আবহাওয়ার কারণে ভারতে পেঁয়াজের উৎপাদন ৪০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিলো। ফলে আরো বেশি দামে বিক্রির আশায় অনেক কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য তখনই বিক্রি না করে মজুদ করে রেখেছিলো। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে দেয়া লকডাউনের ফলে এই পেঁয়াজই কৃষকদের চোখে অশ্রু ঝরিয়েছে।

নষ্ট পেঁয়াজ বাছাই করছেন এক বিক্রেতা

জানা গেছে, চলতি বছর অতিবৃষ্টি ও বাতাসে আর্দ্রতা বেশি হওয়ার কারণে মজুদ করে রাখা পেঁয়াজের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। গত বছরের তুলনায় এই বছর রফতানির পরিমাণও বেশি ছিলো। কিন্তু উৎপাদন যথেষ্ট ছিলো না।

জুলাই ও আগস্ট মাসে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে খারিফ এলাকায় পেঁয়াজের ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কর্নাটকে লাল পেঁয়াজের ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মহারাষ্ট্রেও লাল পেঁয়াজের বীজের সংকট দেখা দেয়। ফলে সেপ্টেম্বর মাসে জমি থেকে লাল পেঁয়াজ তোলার কথা থাকলেও সেটি পেতে আরো দেড় মাস দেরি হয়।

এসব কারণে বাজারে মজুদ করে রাখা লাল পেঁয়াজের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। গত চার দিন ধরে কৃষকরা প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ৩০ রুপি করে পেয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার রফতানি নিষিদ্ধ করার মাত্র দুই দিন পরেই ১৫ই সেপ্টেম্বরে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ১০ রুপিতে নেমে আসে।

পেঁয়াজ বাছাইয়ের কাজ করছে নারীরা

নাশিকের জয়গাও এলাকায় পাঁচ একর জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেছেন ভিমা দিঘল। তিনি কিছু পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি করেছেন এবং বাকিটা মজুদ করে রেখেছেন। তার আশা ছিলো আগস্ট মাসের পর থেকে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি পাবে ফলে তার উৎপাদনের খরচ উঠে আসবে। শুরুতে তিনি তার উৎপাদিত কিছু পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি করেছিলেন। প্রতি ১০০ কেজি পেঁয়াজে তিনি পেয়েছিলেন ৪০০ থেকে ৭০০ রুপি। অর্থাৎ প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পেয়েছেন মাত্র চার থেকে সাত রুপি। পাঁচ একর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে তার খরচ হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ রুপি এবং আশা করেছিলেন যে পৌনে দুই লাখ রুপি তিনি পেয়ে যাবেন মজুদ করে রাখা পেঁয়াজ বিক্রি করে। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে তার অর্ধেক পেঁয়াজই নষ্ট হয়ে গেছে।

ভিমা দিঘল জানান, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজে জমি থেকে পেঁয়াজ তোলেন। অর্থের অভাবে এবার তারা কোনো শ্রমিক ভাড়া করেনি। তিনি যে পাঁচ লাখ কেজি পেঁয়াজ মজুদ করেছিলেন জুলাই মাসের শেষের দিকে সেসব পেঁয়াজ নষ্ট হতে শুরু করে।

তিনি বলেন, প্রথমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয় এবং এরপর আগস্ট মাসে শুরু হয় প্রবল বৃষ্টিপাত। এর ফলে পেঁয়াজ নষ্ট হতে শুরু করে। ফলে কৃষকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন আবার দাম বেড়ে গেছে। আমরা ভেবেছিলাম পেঁয়াজ উৎপাদন করতে গিয়ে যে খরচ হয়েছে সেটা তুলে নেওয়ার পাশাপাশি আগামী মৌসুমের জন্যও পুঁজি সংগ্রহ করতে পারবো। কিন্তু রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর পেঁয়াজের দাম আবার কমে গেছে। আমার মনে হয় না যে আমি আমার খরচও তুলতে পারবো। এছাড়া আগামী মৌসুমে কি হবে সেটাও জানি না। সব সময় কৃষকরাই কেন ক্ষতির বোঝা বহন করবে?

যেসব ব্যবসায়ী পেঁয়াজ ক্রয় ও প্রক্রিয়াজাত করার পর রফতানি করে সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে তারা। রফতানিকারক ভিকাশ সিং জানান, তাদের সমিতির হিসেবে পেঁয়াজ-ভর্তি প্রায় ৬০০ কন্টেইনার বন্দরে আটকা পড়ে আছে।

তিনি বলেন, আগে থেকে কোনো ধরনের ইঙ্গিত না দিয়েই সরকার পেঁয়াজ রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যেসব শুল্ক কর্মকর্তারা আমাদের কন্টেইনারগুলো জাহাজে তুলেছিলেন ১৪ তারিখে তারাই আবার সেগুলো জাহাজ থেকে নামিয়ে ফেলেছেন। এগুলোর অর্ধেক এখনও বন্দরের বাইরে পড়ে আছে। আমার ২৭টি কন্টেইনার মুম্বাই বন্দরে এবং আরো ৫টি টুটিকরিন বন্দরে আটকা পড়ে আছে। ১৪ই সেপ্টেম্বরে তারা এসব কন্টেইনার পাঠায়নি। সকালে কাস্টম এজেন্ট জানান যে, এসব পাঠানোর ব্যাপারে ক্লিয়ারেন্স পেতে সমস্যা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ১৪ই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে পেঁয়াজ রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা জানতে পারি আমরা। কিন্তু তার আগে ১২ এবং ১৩ই সেপ্টেম্বর কাস্টম ডিপার্টমেন্ট মালবাহী জাহাজ থেকে কন্টেইনারগুলো নামিয়ে রাখে। অন্যান্য দেশের পেঁয়াজ আমদানীকারকরা এ ধরনের বিভ্রান্তিতে খুবই অখুশি হয়েছেন। ভারতকে অনির্ভরযোগ্য রফতানিকারক দেশ বলেছেন তারা। এসব কারণে আমরা এবং আমাদের দেশ মুখ রক্ষা করতে পারবে না।

ভিকাশ সিং বলেন, আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ চীন, পাকিস্তান এবং হল্যান্ডকে আমরা সুযোগ করে দিচ্ছি। একদিকে সরকার আত্মনির্ভর ভারত হয়ে ওঠার জন্য পরিবহনে ভর্তুকি দিচ্ছে অন্যদিকে তারা রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। এতে পণ্য বহনকারী সব পরিবহনই তো বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে পেঁয়াজ-চাষি, শ্রমিক, কাস্টম এজেন্ট, যারা প্যাকিং সামগ্রী তৈরি করে এবং রফতানিকারক সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা ঠিক জানি না এই অবস্থার মধ্যে আমরা কতো মাস থাকবো। কন্টেইনারগুলো যদি বন্দরে ঠিক সময়ে যায় তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু একটি কন্টেইনার যদি যেতে না পারে তাহলে আট থেকে দশ লাখ রুপি ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা যাদেরকে চাকরি দিয়েছি তাদের কথাও তো ভাবতে হবে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে কেউ আমাদের পণ্য কিনবে কিনা সেটি নিয়েও এখন চিন্তিত আমরা।

রফতানি বন্ধের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তে মধ্য-স্বত্বভোগীরাও বিস্মিত হয়েছেন। এর আগেও ভারত সরকার এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে তখন এই বিষয়ে আগাম ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিলো। ফলে তখন পেঁয়াজের রফতানি মূল্যও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এই বছর হঠাৎ করেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

মধ্য-স্বত্বভোগীরা তাদের নাম পরিচয় প্রকাশ করে এই বিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে চায়নি। তারা বলেছে, যেকোনো ধরনের মন্তব্য করে তারা সরকারের নজরদারিতে পড়তে চান না।

পেঁয়াজের মূল্য নিয়ে ভোক্তাদের দিক থেকে যখন কোনো অভিযোগ ছিলো না তখন সরকার কেন ও কার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেই বিষয়ে প্রশ্ন করছেন অনেকেই।

পেঁয়াজ বাছাই করা হচ্ছে

কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, প্রথমত সামনে বিহারের নির্বাচন। এর আগে পেঁয়াজের মূল্য যাতে বেড়ে না যায় কেন্দ্রীয় সরকার সেই বিষয়টি মাথায় রেখেছে। দাম বেড়ে গেলে ভোটাররা অসন্তুষ্ট হবেন। আরেকটি কারণ হতে পারে যে, বৃষ্টির কারণে পাকিস্তান ও চীনের মতো আন্তর্জাতিক বাজারেও পেঁয়াজের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব দেশেও পেঁয়াজের সংকট দেখা দিয়েছে। হল্যান্ডে ফসল তুলতে ৩০ থেকে ৪০ দিন বিলম্ব ঘটবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পেঁয়াজের চাহিদা রয়ে গেছে।

গুজরাট, মধ্যপ্রদেশে এবং অন্ধ্রপ্রদেশেও বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাল পেঁয়াজ ইতোমধ্যে না হলেও, আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যেই বাজারে চলে আসার কথা। তবে তার পরিমাণ আগের তুলনায় কম হবে।
কন্টেইনার থেকে পেঁয়াজ নামানো হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, যেহেতু চাহিদা বাড়ছে সে কারণে পেঁয়াজের দাম আরো অনেক বৃদ্ধি পাবে। আর এ বিষয়টি বিবেচনা করেই সরকার রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

সরকারি এই সিদ্ধান্তে খুশি হতে পারেননি অর্থনীতিবিদরাও। কৃষি ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মিলিন্দ মুরুগকার বলেন, সরকার কেন এটা করলো তা বোধগম্য নয়। রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আপনি এক অর্থে অর্থের সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছেন। যেহেতু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২৪ শতাংশ কমে গেছে সে কারণে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বাজারে আমাদের ক্রয় বিক্রয় বাড়াতে হবে। পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় অর্থের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে পেঁয়াজ-চাষি থেকে শুরু করে এর ওপর নির্ভরশীল বিপুল পরিমাণ জনশক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানো দরকার যা বাজারে আরো অর্থ নিয়ে আসবে। কৃষি পণ্যের ওপর কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ঠিক নয়। কারণ এর ওপর বহু মানুষ নির্ভরশীল।

তিনি আরো বলেন, মহামারির সময়ে লোকজন তাদের গ্রামে ফিরে গেছে। তারা এখন কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এরকম পরিস্থিতিতে কৃষি খাত থেকে আয় বাড়াতে হবে। কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য পায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সেরকম কিছু হচ্ছে না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর বলেও উল্লেখ করেন মিলিন্দ মুরুগদার।

সূত্র- বিবিসি

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএমএফ