থ্যালাসেমিয়ার কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৩ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৮,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস আজ 

থ্যালাসেমিয়ার কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:২৩ ৮ মে ২০২১   আপডেট: ১৩:৪১ ৮ মে ২০২১

থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ ও প্রতিকার। ছবি: সংগৃহীত

থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ ও প্রতিকার। ছবি: সংগৃহীত

থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে প্রতিবছর ৮ মে পালিত হয় বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। বাংলাদেশেও এই দিবসটি পালিত হয়। বিশ্বে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক সংখ্যা প্রায় ২৫০ মিলিয়ন। বিশ্বে প্রতি বছর এক লাখ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। 

বাংলাদেশের ১০ থেকে ১২ ভাগ মানুষ এ রোগের বাহক। অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটিরও বেশি মানুষ তাদের অজান্তে এ রোগের বাহক। দেশে কমপক্ষে ৬০ থেকে ৭০ হাজার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু-কিশোর রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে।

থ্যালাসেমিয়া বেশির ভাগ সময় বংশগতভাবে আক্রমণ করে। থ্যালাসেমিয়ার কারণে আমাদের শরীর সামান্য কিছু স্বাস্থ্যকর লাল রক্ত কণিকা উৎপন্ন করে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে কম পরিমাণ হিমোগ্লোবিন তৈরি করে। হিমোগ্লোবিন হলো লাল লোহিত কনিকায় নিহিত এক ধরনের প্রোটিন যা অক্সিজেন বহন করে। হিমোগ্লবিন লাল লোহিত কনিকার খুব প্রয়োজনীয় উপাদান। 

প্রত্যেক মানুষই হয় নরমাল না হয় থ্যালাসেমিয়া মেজর অথবা থ্যালাসেমিয়া মাইনরের অধিকারী হয়ে থাকেন। থ্যালাসেমিয়া মেজর তখন হয় যখন শিশু বাবা-মা ২ জনের কাছ থেকে একটি করে মিউটেটেড জিনের অধিকারী হয়। এসব শিশুরা স্বাভাবিক, পরিণত হিমোগ্লোবিন তৈরিতে অক্ষম থাকে। 

থ্যালাসেমিয়া ট্রেইটকে মাঝে মাঝে থ্যালাসেমিয়া মাইনর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এরা বাবা-মা যেকোনো ১ জনের কাছ থেকে ত্রুটিপূর্ণ জিন গ্রহন করে। থ্যালাসেমিয়া মাইনর, থ্যালাসেমিয়া মেজর থেকে অনেকটা নিরাপদ। থ্যালাসেমিয়ার কারণে অ্যানিমিয়া দেখা দিতে পারে। চলুন তবে জেনে নেয়া যাক থ্যালাসেমিয়া হওয়ার কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে-   

থ্যালাসেমিয়া হওয়ার কারণ
হিমোগ্লোবিন ২ ধরনের প্রোটিন দ্বারা তৈরি আলফা গ্লোবিন ও বিটা গ্লোবিন। থ্যালাসেমিয়া তখনই হয় যখন এই ২টি প্রোটিন উৎপন্নে সাহায্যকারী জিনে কোন ত্রুটি দেখা দেয়।

থ্যালাসেমিয়া আবার ২ প্রকারের। একটি হচ্ছে আলফা থ্যালাসেমিয়া ও অন্যটি হচ্ছে বিটা থ্যালাসেমিয়া।

>> আলফা থ্যালাসেমিয়া তখন দেখা দেয় যখন আলফা গ্লোবিন প্রোটিনের সঙ্গে সম্পর্কিত জিন পরিবর্তিত থাকে অথবা অনুপস্থিত থাকে।

>> আর যখন ত্রুটিপূর্ণ জিনগুলো বেটা গ্লোবিন প্রোটিন উৎপন্নে বাঁধা দেয় তখন বেটা থ্যালাসেমিয়া হয়।

থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ

চোখের রঙ হলদে হয়ে যায় >> অল্পতেই শরীর অবসন্ন হয়ে যাওয়া।

>> দুর্বলতা অনুভব করা।

>> চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া।

>> মুখের হাড়ে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়।

>> ইউরিনের রঙ গাঢ় হয়ে যাওয়া। 

>> চোখের রঙ হলদে হয়ে যাওয়া।

>> খাওয়াতে অরুচি দেখা দেয়।

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসার কারণে শারীরিক অন্যান্য জটিলতা

হার্ট এবং লিভারের অসুখ
নিয়মিত ব্লাড ট্রান্সফিউশন থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসার একটি প্রধান উপায়। ফলে রক্তে আয়রন ওভারলোড হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে অর্গান এবং টিস্যুর ক্ষতি হয়ে থাকে। বিশেষ করে হার্ট ও লিভার। হার্টের অসুখের মধ্যে অন্যতম হলো হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিওর, আর্থিমিয়াস। 

ইনফেকশন
থ্যালাসেমিয়ার রোগীদের মৃত্যুর আরেকটি কারণ হল ইনফেকশন। বিশেষ করে যাদের স্প্লিন শরীর থেকে কেটে ফেলতে হয়েছে তাদের মধ্যে এই ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ ইনফেকশনের সাথে যুদ্ধরত অঙ্গটি আর শরীরে অবস্থান করছে না।

অস্টিওপোরোসিস
যেসব মানুষদের থ্যালাসেমিয়া আছে তাদের মধ্যে হাড়ের সমস্যা যেমন অস্টিওপোরোসিস দেখা দেয়ার সম্ভাবনা বেশি। এটি এমন এক সমস্যা যার ফলে শরীরের হাড় ক্ষয় হয়ে ভঙ্গুর হয়ে যায়।

থ্যালাসেমিয়া জিন এবং প্রেগন্যান্সি
>> সন্তান যদি বাবা-মা ২ জনের কাছ থেকে ২টি স্বাভাবিক জিন গ্রহণ করে তাহলে স্বাভাবিক রক্তের অধিকারী হবে।

>> সন্তান যদি ২ জনের মধ্যে যেকোনো ১ জনের কাছ থেকে স্বাভাবিক জিন এবং আরেকজনের কাছ থেকে ভ্যারিঅ্যান্ট জিন গ্রহণ করে তাহলে এটি থ্যালাসেমিয়ার প্রলক্ষণ।

>> আবার সন্তান যদি বাবা-মা ২ জনের কাছ থেকেই একটি একটি করে থ্যালাসেমিয়ার জিন গ্রহণ করে তাহলে মাঝারি থেকে প্রবল আকারের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে।

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের জন্য কিছু ঘরোয়া উপায়

থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হলে অতিরিক্ত আয়রন জাতীয় খাবার না খাওয়া
আসলে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হলে তেমন কোনো ঘরোয়া উপায় নেই এটি প্রতিরোধের জন্য। তবে অবস্থার যেন আরো অবনতি না ঘটে সেটার জন্য কিছু পরিবর্তন আনতে পারি।

অতিরিক্ত আয়রন গ্রহন না করা
অতিরিক্ত আয়রন গ্রহন থেকে বিরত থাকা। যতদিন না ডাক্তার আপনাকে রেকমেন্ড করে ততদিন আয়রন সমৃদ্ধ ভিটামিন গ্রহণ করবেন না।

স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য
ব্যালেন্সেড ডায়েট যা পুষ্টিগুণে ভরপুর এমন খাদ্য খাওয়া উচিত। এতে আপনার এনার্জি লেভেল বজায় থাকবে। চিকিৎসকেরা সাধারণত ফলিক এসিড গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন, এতে আপনার শরীরে নতুন রক্ত কনিকা তৈরি হয়। এছাড়াও দেহের হাড়ের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি আর ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে।

ইনফেকশন থেকে দূরে থাকুন
নিজেকে ইনফেকশন থেকে নিরাপদ রাখার জন্য সব সময় সাবান দ্বারা হাত পরিষ্কার করুন বিশেষ করে আপনার শরীর থেকে যদি স্প্লিন কেটে বাদ দেওয়া হয়ে থাকে এবং জ্বর সর্দি বা ছোঁয়াচে অসুখে অসুস্থ মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকুন। মেনিন জাইটিস, হেপাটাইটিস বি এর ভ্যাকসিন গ্রহণ করুন ইনফেকশন থেকে বাঁচার জন্য।

গর্ভধারণের পূর্বে টেস্ট
যদি একজন নারী অথবা তার স্পাউসের বংশে থ্যালাসেমিয়ার হিস্ট্রি থেকে থাকে তাহলে গর্ভধারণের আগে অবশ্যই ব্লাড টেস্ট করা উচিত। রক্ত পরীক্ষা আর ফ্যামিলি জেনেটিক পর্যবেক্ষণ করে জানা যাবে ২ জনের কেউ থ্যালাসেমিয়ার শিকার অথবা ক্যারিয়ার কিনা।

বিয়ের আগেই ব্লাড টেস্ট
যদিও এই পদ্ধতি আমাদের সমাজে এখনও প্রচলিত নয়, তবুও আমাদের উচিত নিজেদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের স্বার্থে বিয়ের আগে হবু বর এবং বউয়ের রক্ত পরীক্ষা করা।

তবে আশার কথা হচ্ছে গবেষকরা থ্যালাসেমিয়া প্রতিকারের জন্য স্টাডি করে যাচ্ছেন। খুব শিগগির হয়তো ষ্টীম সেল আর জিন থেরাপির মাধ্যমে এর প্রতিকার সম্ভব হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ