এ যেন হাসপাতালের বাজার

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৪ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১১ ১৪২৭,   ০৭ রবিউস সানি ১৪৪২

এ যেন হাসপাতালের বাজার

মো. আল আমিন টিটু, ভৈরব ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৩৯ ১৩ নভেম্বর ২০২০  

ভৈরবের কমলপুর, নিউ টাউনসহ বিভিন্ন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার অলিতে-গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য প্রাইভেট হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার

ভৈরবের কমলপুর, নিউ টাউনসহ বিভিন্ন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার অলিতে-গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য প্রাইভেট হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার

কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কমলপুর, নিউ টাউন, ভৈরববাজারসহ বিভিন্ন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার অলিতে-গলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য প্রাইভেট হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার। দেখে মনে হবে হাসপাতালের বাজার। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের নেই অনুমোদন, পর্যাপ্ত জনবল ও যন্ত্রপাতি।

ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানে সেবার নামে চলে বাণিজ্য। সেবা নিতে এসে প্রতারণার শিকার হন দূর-দূরান্তের রোগীরা। অহেতুক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফাঁদে ফেলে রোগীদের কাছ থেকে লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মালিকরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অনুমোদনের অপেক্ষা না করে শুধুমাত্র আবেদন করেই অনেকে হাসপাতাল দিয়ে বাণিজ্যে মেতেছেন। দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছাড়াই চলছে অধিকাংশ হাসপাতাল। অহেতুক বাড়তি টেস্ট দিয়ে রোগীদের হয়রানি করা হচ্ছে। সেসব টেস্ট করতে পাঠানো হচ্ছে আগে থেকে চুক্তিবদ্ধ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানেও নেয়া হচ্ছে বাড়তি ফি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনো কোনো হাসপাতালের মালিক কিংবা ডাক্তার এরই মধ্যে গাড়ি-বাড়ি-ফ্ল্যাটের মালিক বনে গেছেন। এমনই একজন কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালের গাইনি সার্জন ডা. হরিপদ দেবনাথ। ভৈরব শহরের নিউ টাউনে তার রয়েছে ‘দেবনাথ ম্যানসন’ নামে ছয়তলা বাড়ি ও বিলাসবহুল গাড়ি।

ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকাকালীন তিনি প্রতি সিজারে দুই হাজার টাকা করে নিতেন। কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে বদলি হওয়ার পরও তার অভ্যাস বদলায়নি। নিয়মিত কর্মস্থলে না গিয়ে তিনি চেম্বার করেন ভৈরব শহরের বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে। এছাড়া ‘দেবনাথ ম্যানসন’-এর নিচতলায় অনুমোদন ছাড়াই দিয়ে বসেছেন একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। দক্ষ জনবল ও পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি না থাকায় গত মঙ্গলবার ওই প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

দফায় দফায় জরিমানা-সতর্ক করেও দমানো যায়নি অনুমোদনহীন হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার ব্যবসায়ীদের

একই অভিযোগ ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. মিতালী দাসগুপ্তার বিরুদ্ধেও। নিজের বাসাকে ডায়াগনস্টিক সেন্টার বানিয়ে বছরের পর বছর ধরে রোগী দেখছেন। এর চেয়েও গুরুতর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অকাল গর্ভপাত করাচ্ছেন ডা. মিতালী। বিনিময়ে জনপ্রতি নিচ্ছেন  ২০-৩০ হাজার টাকা।

সম্প্রতি মিতালী দাসগুপ্তার বাসায়ও অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও সতর্ক করা হয়। ডা. মিতালী দাসগুপ্তা ভৈরবে এক যুগের বেশি সময় ধরে চাকরি করছেন। মাঝেমধ্যে বদলি করা হলেও নানা কৌশলে ফের এখানেই চলে আসেন তিনি।

এদিকে ভৈরবের বেসরকারি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ, যন্ত্রপাতির পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলা হয় আশপাশের খোলা স্থানে। এসব অপরাধে সম্প্রতি ভোক্তা অধিকার আইনে কমলপুরের ট্রমা জেনারেল হাসপাতালকে ২০ হাজার টাকা, মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালকে ২০ হাজার টাকা, ফরিদা হেলথ মেডিকেল কেয়ারকে ২০ হাজার টাকা, ভৈরব ডিজিটাল চক্ষু সেন্টারকে ২০ হাজার টাকা, আল মদিনা হাসপাতালকে ২০ হাজার টাকা, গ্রামীণ জেনারেল হাসপাতালকে ২০ হাজার টাকা, ভৈরব সেন্টাল হাসপাতালকে ২০ হাজার টাকা, পদ্মা জেনারেল হাসপাতালকে ২০ হাজার টাকা, আনোয়ারা জেনারেল হাসপাতালকে ২০ হাজার টাকা, শাপলা ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ২০ হাজার টাকা, ফ্যামিলি কেয়ারকে ১০ হাজার টাকা, মডার্ন হাসপাতালকে ১০ হাজার টাকা, মাতৃকা হাসপাতালকে ১০ হাজার টাকা, ন্যাশনাল হাসপাতালকে ১০ হাজার টাকা, আবেদীন প্রাইভেট হাসপাতালকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিএইচও ডা. খুরশীদ আলম জানান, নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেটারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসক, প্যাথলজিস্ট বা মাক্রোবায়োলজিস্ট থাকা প্রয়োজন। নইলে রিপোর্টে ভুল হতে পারে, যা রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। ভৈরবে অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কোনো রেজিস্টার্ড চিকিৎসক, প্যাথলজিস্ট বা মাক্রোবায়োলজিস্ট নেই।

ভৈরবের ইউএনও লুবনা ফারজানা জানান, সেবার নামে হয়রানি-প্রতারণা মেনে নেয়া হবে না। অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠানকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা ও সতর্ক করা হয়েছে। এরপরও তারা অনিয়ম অব্যাহত রাখলে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর