প্রতারণা-হয়রানি সবই আছে, নেই শুধু সেবা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২০ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৫ ১৪২৭,   ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

প্রতারণা-হয়রানি সবই আছে, নেই শুধু সেবা

লালমনিরহাট প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৫০ ১৫ অক্টোবর ২০২০  

লালমনিরহাট শহরের ক্রিসেন্ট ডায়াগনস্টিক ও রাফি মেডিকেল সেন্টার

লালমনিরহাট শহরের ক্রিসেন্ট ডায়াগনস্টিক ও রাফি মেডিকেল সেন্টার

লালমনিরহাট জেলা শহরের ডানে-বায়ে যেদিকেই চোখ যায়- দেখা মেলে নানা রঙের আলোয় আলোকিত-সুসজ্জিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসব প্রতিষ্ঠানে সেবার নামে চলে টেস্ট বাণিজ্য, জালিয়াতি, প্রতারণা, হয়রানি। সেবার ছিটেফোঁটাও পায় না রোগীরা।

বেসরকারি এসব ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দালাল হিসেবে কাজ করে সরকারি হাসপাতালেরই নার্স-আয়া-ক্লিনাররা। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে এখানে নিয়ে আসে তারা। বিনিময়ে নেয় মোটা অংকের কমিশন। অথচ প্রয়োজনীয় সেবা পায় না রোগীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অধিকাংশেরই অনুমোদন নেই। যেগুলোর অনুমোদন আছে সেগুলোর সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনুমোদনের অনেক শর্তই পূরণ করেনি ক্লিনিকগুলো, নেই পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র, পর্যাপ্ত জনবল। দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ঘিঞ্জি-দুর্গন্ধময় পরিবেশ, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট দিয়ে দেদারছে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে ক্লিনিকগুলো।

আরো জানা গেছে, অনুমোদন নেয়া অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি, ল্যাবরেটরি, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান। এ কারণে রোগীদের কাছ থেকে স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। কাজটি নিখুতভাবে করতে আগেই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্যাডে ল্যাব টেকনিশিয়ান ও ডাক্তারের স্বাক্ষর নিয়ে রাখা হচ্ছে। পরে ভুয়া রিপোর্ট বানিয়ে রোগীদের কাছ থেকে হাজার হাজর টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে জালিয়াতরা।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে কাজ করে মূলত কলেজ পড়ুয়া বা পাস করা ছাত্রীরা। যাদের মেডিকেল সংশ্লিষ্ট কোনো সার্টিফিকেট বা পড়াশোনা নেই। দেখতে সুন্দর, চটপটে, কৌশলী আর কথা বলা জানতে পারলেই তরুণীদের চাকরি দেয়া হয় এসব ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।

সেবার নামে প্রতারণা-বাণিজ্য চালানো এসব প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবই ঘটে এখানে। ভাড়া করে আনা হয় চিকিৎসক, তাদের দেয়া হয় নিয়মিত কমিশন। অথচ তারা প্রতিষ্ঠানে আসেন না বললেই চলে, জরুরী কল করেও হাজির করা যায় না চিকিৎসকদের।

তারা আরো জানান, রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা ও হয়রানির মাধ্যমে এসব ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। আর প্রশিক্ষণ-সার্টিফিকেট বিহীন সুন্দরী তরুণীদের চাকরির নামে ব্যবহার করছেন নিজেদের মনোরঞ্জনে। আবার যখনই ভুল চিকিৎসা কিংবা ভুয়া রিপোর্ট সংক্রান্ত সমস্যা হাজির হয়, তখন নিজেরা গা ঢাকা নিয়ে সুন্দরী তরুণীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, লালমনিরহাট জেলা শহরের মিশন মোড়ের ক্রিসেন্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ১৮-২০ জন লোক কাজ করেন। তবে সব কাজের কাজী একজনই। তিনি ক্লিনিক পরিচালক মাজেদুল। এক্স-রে, ইউরিন, ব্লাড টেস্ট সব পরীক্ষা তিনি একাই করেন। অবশ্য তার দাবি, তিনি প্যাথলজিতে পড়াশোনা করেছেন। বাকি যারা কাজ করেন তাদের অধিকাংশই তরুণী। যাদের যোগ্যতা নয়, রূপ দেখে চাকরি দেয়া হয়েছে।

ক্রিসেন্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাগজ-কলমে দুজন পুরুষ কর্মচারী রয়েছেন। তাদের একজনকে ক্যাশ কাউন্টারে দেখা গেলেও আরেকজনের পাত্তা নেই। করোনাকালে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে অনেক টাকা কামিয়েছেন ক্রিসেন্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক মাজেদুল। অনলাইনে চিকিৎসা দেয়া, রিপোর্ট দেখিয়ে প্রেসক্রিপশন লেখা সবই করেন তিনি।

তবে, মাজেদুলের দাবি, তার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সব কাজ মানসম্পন্ন ও নিয়ম মেনেই হয়।

এদিকে, একই সমস্যা দেখা গেছে লালমনিরহাট শহরের মিশন মোড়ের রাফি মেডিকেল সেন্টারে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল, যন্ত্রপাতি, ল্যাব ছাড়াই চিকিৎসার নামে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। কখনো কোনো রোগী অভিযোগ করলে তাকে হতে হয় হয়রানির শিকার। প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় দিনের পর দিন সেবার নামে প্রতারণা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে রাফি মেডিকেল সেন্টার।

লালমনিরহাট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকদের সংগঠনের এক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরীক্ষা-নীরিক্ষার নামে বাড়তি টাকা আদায় করছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। আবার এখানকার রিপোর্ট অন্য কোথাও পরীক্ষা করালে ভিন্ন রিপোর্ট আসে।

বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতারণা-বাণিজ্য সম্পর্কে লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন ডা. নির্মলেন্দু রায় বলেন, ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে হাজারো অনিয়মের কথা শুনি। কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া আমরা তো কোনো পদক্ষেপ নিতে পারি না। কেউ অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর