আজ বিশ্ব কচ্ছপ দিবস 

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৫ জুলাই ২০২২,   ২০ আষাঢ় ১৪২৯,   ০৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

আজ বিশ্ব কচ্ছপ দিবস 

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৯:৪৫ ২৩ মে ২০২২   আপডেট: ১০:০৫ ২৩ মে ২০২২

কচ্ছপ। ছবি: সংগৃহীত

কচ্ছপ। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব কচ্ছপ দিবস আজ ২৩ মে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন জীব কচ্ছপ সম্পর্কে মানুষকে অবগত করতে এবং প্রকৃতির অন্যান্য জীবের পাশাপাশি এই জীবের প্রতি সম্মান দেখানো ও এর সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে।

২২ বছরে পা দিল বিশ্ব কচ্ছপ দিবস, মূলত জীববৈচিত্র্য বজায় রাখার গুরুত্ব ও এদের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণেই ২০০০ সালে ‘অ্যামেরিকান টরটয়েজ রেসকিউ’ নামক প্রতিষ্ঠান এই দিবসের সূচনা করেন। তখন থেকেই সারা পৃথিবীজুড়ে আজকের দিনে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে।

অতি পরিচিত এই সরীসৃপ প্রাণীটি জল ও স্থল উভয় স্থানেই বসবাস করে। শক্ত খোলসের কচ্ছপ একধরনের সরীসৃপ যারা পানি এবং ডাঙা দুই জায়গাতেই বাস করে। এদের শরীরের উপরিভাগ শক্ত খোলসে আবৃত থাকে যা তাদের শরীরকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে রক্ষা করে। শক্ত খোলস দ্বারা আবৃত প্রাণীটি প্রাচীন প্রাণীদের মাঝে অন্যতম। কচ্ছপ পৃথিবীতে এখনও বর্তমান এমন প্রাচীন প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩০০ প্রজাতির কচ্ছপ রয়েছে বলে জানা যায়। আর বাংলাদেশে রয়েছে ২২ প্রজাতির কচ্ছপ। যার মধ্যে কিছু প্রজাতি মারাত্মকভাবে বিলুপ্তির পথে।

 বাংলাদেশে রয়েছে ২২ প্রজাতির কচ্ছপজন্মগ্রহন
মেয়ে কচ্ছপরা ডিমের জন্য গর্ত করে এবং সেখানে এক থেকে ৩০টি পর্যন্ত ডিম পাড়ে। কচ্ছপ সাধারণত রাতের বেলা ডিম পাড়ে এবং ডিম পাড়ার পর মা কচ্ছপ ডিমগুলোকে মাটি, বালি বা অন্য যে কোনো জৈব পদার্থ দিয়ে ঢেকে দেয়। মা কচ্ছপ ডিম পাড়ার পর ডিমগুলো প্রকৃতির দায়িত্বে রেখে চলে যায়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে প্রজাতি বিশেষে ৬০ থেকে ১২০ দিন সময় লাগে

জীবনকাল
কচ্ছপদের খোলসের উপরের অংশে যে সমকেন্দ্র (concentric rings) বিশিষ্ট রিং থাকে তা তাদের বয়সের একটি ধারণা দিয়ে থাকে, যেমনটা গাছের ক্ষেত্রে তাদের বর্ষবলয়ে দেখা যায়। তবে যেসব কচ্ছপ সারা বছরই পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার পেয়ে থাকে, তাদের খোলসে উল্লেখযোগ্য কোনো রিং দেখা যায়না। কারণ, শরীরের বৃদ্ধি খাবার এবং পানি প্রাপ্ততার উপর নির্ভর করে। এছাড়াও কিছু কচ্ছপ এক বছরে একের অধিক রিং তৈরি করে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা ক্ষয়ে যাওয়ার কারণে দেখা যায় না। কচ্ছপরা সাধারণত মানুষেরই মতো বাঁচে কিন্তু কিছু কচ্ছপদের ১৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচার কথা শোনা গেছে।

এই কারণে তারা কোন কোন সংস্কৃতিতে দীর্ঘায়ুকে বোঝায়। এই পর্যন্ত রেকর্ডকৃত কচ্ছপদের মধ্যে সবথেকে দীর্ঘজীবি কচ্ছপ হচ্ছে Tu’i Malia। তাকে ১৭৭৭ সালে, ব্রিটিশ পরিব্রাজক Captain Cook তার জন্মের অল্প দিনের মধ্যেই উপহার দেন Tongan Royal Family কে। ১৯৬৫ সালের ১৯ মে ১৮৮ বছর বয়সে তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। ততদিন পর্যন্ত সে Tongan royal family এর তত্ত্বাবধানে ছিল।

কিছু প্রজাতির পুরুষদের ঘাড় মেয়েদের থেকে লম্বা থাকেলিঙ্গ দ্বিরূপতা
কচ্ছপদের অনেক প্রজাতির নারী ও পুরুষ আলাদা। যদিও বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে নারী পুরুষের পার্থক্য বিভিন্ন হয়ে থাকে। কিছু প্রজাতির পুরুষদের ঘাড় মেয়েদের থেকে লম্বা থাকে। আবার কিছু প্রজাতির মেয়েদের নখর পুরুষদের থেকে বড় হয়ে থাকে। অধিকাংশ কচ্ছপ প্রজাতিতে পুরুষদের থেকে মেয়েরা আকারে বড় হয়ে থাকে। পুরুষের খোলসের উপরের অংশ প্রজননে সহযোগিতা করার জন্য ভিতরের দিকে বাকানো থাকে। কচ্ছপদের লিঙ্গ নিরূপণের সবথেকে সহজ উপায় হচ্ছে তাদের লেজ লক্ষ্য করা। সাধারণত মেয়েদের নিচের দিকে বাকানো ছোট লেজ থাকে অন্যদিকে পুরুষদের উপর দিকে বাকানো তুলনামূলক ভাবে বড় লেজ থাকে।

খাবার
অধিকাংশ ডাঙ্গায় বসবাসকারী কচ্ছপ তৃণভোজী। তারা ঘাস, আগাছা, পাতা, ফুল এবং কিছু ফল খেয়ে বেঁচে থাকে। যদিও কিছু সর্বভূক কচ্ছপও এই পরিবারে আছে। পোষ্য কচ্ছপরা সাধারণত ঘাস, পাতা, আগাছা এবং কিছু ফুল খায়। কিছু প্রজাতি তাদের বাসস্থানে প্রাপ্ত কীটপতঙ্গ এবং মৃতদেহও খেয়ে থাকে। তৃণভোজী কচ্ছপদের অতিরিক্ত আমিষ খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং খোলস বিকৃতিসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যগত জটিলতা সৃষ্টি করে থাকে। যেহেতু প্রত্যেক প্রজাতির কচ্ছপের পুষ্টির চাহিদা ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে তাই তাদের খাবার নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা করা দরকার।

সামুদ্রিক কাছিম সম্পর্কে বিশেষ কিছু তথ্য
পৃথিবীর প্রায় সব সমুদ্রেই এদের বিস্তৃতি রয়েছে এবং এরা বাসা বানানোর জন্য সাধারণত তুলনামূলক উষ্ম অঞ্চল পছন্দ করে। খাবার গ্রহণ, বিপরীত লিংগের সঙ্গে মিলন থেকে শুরু করে সব আনুষঙ্গিক কাজই সাগরে করলেও ডিম পাড়ার সময়ে স্ত্রী কাছিমকে দ্বীপে আসতেই হয়। এরা ডিম পাড়ার জন্য খুব নির্জন স্থান বেছে নেয় এবং যদি সেখানে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি দেখে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ডিম পাড়া বন্ধ করে মা কাছিম আবার সাগরে ফেরত চলে যায়। পুরুষ কাছিম একবার ডিম ফুটে গভীর সাগরে চলে যাওয়ার পরে আর কখনো দ্বীপে ফেরত আসেনা, সমগ্র জীবনচক্র তার সাগরেই কেটে যায়। সমগ্র পৃথিবীতে মাত্র সাত প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিমের দেখা মেলে এর মধ্যে চার প্রজাতিকেই দুস্প্রাপ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। 

সামুদ্রিক কাছিম বালিতে গর্ত করে ডিম পাড়েসামুদ্রিক কাছিম বালিতে গর্ত করে ডিম পাড়ে
ডিম পাড়ার সময় বালিতে গর্ত করে ডিম পাড়ে এবং শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে বালি দিয়ে ঢেকে দেয় যাতে করে ডিম ফুঁটে বাচ্চা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাচ্চাগুলো আবার সাগরে চলে যেতে পারে। সমগ্র পৃথিবীতে মাত্র সাত প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিমের দেখা মেলে এর মধ্যে চার প্রজাতিকেই দুস্প্রাপ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই সাত প্রজাতির মধ্যে Leatherback Sea Turtle আকারের দিক থেকে সবথেকে বড়। এদের সামনের ফ্লিপারটি লম্বায় প্রায় নয় ফুট পর্যন্ত হতে পারে।

অন্যান্য সবার পিঠের অংশ শক্ত খোলস দিয়ে আবৃত থাকলেও এদের ক্ষেত্রে সেটা তৈলাক্ত মাংসল অংশ দিয়ে গঠিত হবার কারণেই এরকম নামকরণ। প্রজাতিভেদে এদের দেশান্তর হবার বৈশিষ্ঠের অনেক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। Green Sea Turtle যেখানে আটলান্টিক মহাসাগর ধরে প্রায় ১৩০০ মাইল পথ পাড়ি জমায় সেখানে স্ত্রী Leatherback Sea Turtle প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে প্রায় ১২০০০ মাইল পথ পাড়ি দেয়। প্রজাতিভেদে কাছিমের গড় আয়ু ৫০ বছর। এসব সামুদ্রিক কাছিমের খাবারের তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন রকমের সামুদ্রিক আগাছা কিংবা বিভিন্ন সামুদ্রিক গাছ অপরদিকে কিছু প্রজাতি ছোট স্কুইড কিংবা মাছও শিকার করে থাকে।

প্রজাতিভেদে কাছিমের গড় আয়ু ৫০ বছরডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে প্রজাতি বিশেষে ৬০ থেকে ১২০ দিন সময় লাগে।জেনে রাখা ভালো যে, এরা যেই ডিম পাড়ে তা থেকে প্রায় সব ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলেও তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক সদস্যই পরিণত অবস্থায় রূপান্তর হতে পারে। এর পেছনে প্রধান কারণ ঐসব বাচ্চা কাছিমগুলোর শারীরিক অক্ষমতা নয় বরং জলবায়ুর পরিবর্তন, উচ্চ অর্থ লোভের কারণে অনৈতিকভাবে খোলস বিক্রির বাণিজ্য, মাংসের চাহিদা থাকার কারণে নানান দেশে রপ্তানি, সাগরের মাঝে মাঝে জাল দিয়ে মাছ চাষ, বাসস্থান ধ্বংস, তৈলাক্ত পানি এবং নানাবিধ কারণ।

জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বাচ্চা কাছিমগুলো বাইরের প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনা যার কারণে অনেক সদস্যই মারা যায়। টাকার লোভে অনেক অসাধু ব্যবসায়ীরা কাছিমগুলোকে ধরে খোলস ছিড়ে এদের ফেলে দেয়। যে কারণে প্রচন্ড কষ্ট পেতে পেতে এরা ধীরে ধীড়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। আবার পৃথিবীর অনেক দেশেই এদের মাংস খাওয়া হয়। এর ফলে নির্বিচারে এদের ধরা হয় এবং মেরে ফেলে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) সামুদ্রিক কচ্ছপ সংকটাপন্নের পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছে।

 

মাছ ধরা 
জেলেদের মাছ ধরার সময় জালে আটকা পড়ে প্রচুর সংখ্যক কচ্ছপ মারা যায়। জালে জড়িয়ে, আবাসস্থল ধ্বংস ও খাদ্যশৃঙ্খলে পরিবর্তনের কারণেও মারা যায়।

সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম খাওয়ার জন্য অনেকে সংগ্রহ করেকচ্ছপ ও কাছিম ধরা
সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম খাওয়ার জন্য অনেকে সংগ্রহ করে। আবার কচ্ছপ ও কাছিমকে খাদ্য হিসেবেও খায়। তাছাড়া এদের থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করা হয়।

উপকূলীয় উন্নয়ন
উপকূলের উন্নয়নের নামে অনেক দেশেই কচ্ছপের আবাস ধ্বংস করা হচ্ছে। ডিম পাড়ার জন্য সংরক্ষিত স্থানে পর্যটকদের আনাগোনাও কচ্ছপ সংকটের একটি বড় কারণ। এ ছাড়াও জাহাজ চলাচল, সমুদ্রের তলদেশের পরিবর্তনসহ নানাবিধ কারণ রয়েছে।

দূষণ
প্লাস্টিক, পরিত্যক্ত মাছ ধরার যন্ত্রপাতি, তেল বর্জ্য এবং অন্যান্য পদার্থ খেয়ে কিংবা পরিত্যক্ত জালের সঙ্গে জড়িয়েও মারা যায়। রাসায়নিক দূষণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। উপকূলে আলোর ঝলকানি ডিম পাড়ায় বাধা দেয়।

এভাবেই প্রতিনিয়ত বিশ্বের নানান প্রান্তে হাজার হাজার সামুদ্রিক কচ্ছপ মারা যাচ্ছে অথচ তাদেরকে বাচানো গেলেও বেশিরভাগ লোকই ঐসব না চিন্তা করে শুধু নিজের স্বার্থের কথা ভেবে নির্বিচারে নিধন করে চলেছে।

জলবায়ুর পরিবর্তন আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন এদের বাসস্থানের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তন, পুকুর জলাশয়ে বিষ ও কীটনাশকের ব্যবহার, জমিতে সার প্রয়োগ, কচ্ছপের প্রয়োজনীয়তা না জানা, প্রাণী দেখামাত্রই মেরে ফেলা ইত্যাদি কারণে সংকটাপন্ন হচ্ছে।

প্রতি বছর মার্চ মাসে কচ্ছপেরা গহিরমাথা এবং রুশিকুল্যা সমুদ্র সৈকতে আসে। বন বিভাগের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই বছর ৬০ মিলিয়ন ডিম পাড়বে তারা। বন বিভাগ জানিয়েছে, এবার মানুষ না থাকায় কচ্ছোপের সংখ্যাও বেশি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ

English HighlightsREAD MORE »