ভূমিজ সম্প্রদায়ের প্রথম স্নাতকের শিক্ষার্থী অঞ্জন, খরচ চলে দিনমজুরিতে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৯ মে ২০২২,   ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,   ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

ভূমিজ সম্প্রদায়ের প্রথম স্নাতকের শিক্ষার্থী অঞ্জন, খরচ চলে দিনমজুরিতে

শুভ দে, মাভাবিপ্রবি প্রতিনিধি  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৮ ১৪ মে ২০২২   আপডেট: ১৫:২৫ ১৪ মে ২০২২

অঞ্জন পড়ছেন টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থবর্ষে। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

অঞ্জন পড়ছেন টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থবর্ষে। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলায় আছে ভুমিজ সম্প্রদায়। সেখানের ফুলতলা চা বাগানের এলবিনটিলা চা পল্লীতে বেড়ে উঠা অঞ্জনের। তার পুরো নাম অঞ্জন ভূমিজ। নামের শেষে এই ভূমিজ শব্দটিই পরিচয় দেয় তার সম্প্রদায়ের।

অঞ্জনের পরিচয় আরেকটু জানতে হলে- জন্মের পর থেকে যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তাদের একজন অঞ্জন।

বাবা অমৃত ভূমিজ একজন স্থায়ী চা শ্রমিক আর মা রতনমনি ভূমিজ অস্থায়ী। তাদের মাসিক আয় ৩০ হাজারেরও কম। তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার।

সংসারে সবার বড় অঞ্জন। পড়ছেন টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থবর্ষে। ভুমিজদের প্রথম সন্তান হিসেবে তিনিই চা বাগানের গণ্ডি পেরিয়ে পড়ছেন উচ্চশিক্ষার অঙ্গণে।

মায়ের সঙ্গে কৃষিকাজ করছেন অঞ্জন ভূমিজ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

এরপর ছোটোবোন অঞ্জলী পড়ছেন এশিয়ান ইউনিভারসিটি ফর উইমেন- এ। আরেক ছোটোবোন এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী।

স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথাও কখনো ভাবেননি। পড়ালেখার প্রতি ছোটোবেলা থেকে অদম্য ইচ্ছা থাকলে তাকে কী আর পড়ালেখা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়।

স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরে ভীষণ আনন্দিত অঞ্জন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একসময় স্বপ্নের মতো মনে হতো। শেষবর্ষে এসে ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে, অন্ধকার দিনের শেষে আলো দেখছি। খুব ভালো লাগছে। 

তিনি বলেন, ছোটোবেলা থেকে দেখে এসেছি চা বাগানে যারা কাজ করে সব পরিবারই দরিদ্র। শিক্ষিতের হার নেই বললেই চলে। গ্রামের কারোরই আর্থিক অবস্থা ভালো না। আর্থিক সংকটের কারণে ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে দ্রুত ঝরে পড়ে। এটা খুব খারাপ লাগে। এখন চা বাগানের কেউ পড়ালেখার জন্য উৎসাহিত করি। 

দিনমজুরের কাজে যাচ্ছেন অঞ্জন ভুমিজ

বাবা বলতেন, পড়াশোনা করে কী লাভ। চা শ্রমিকের সন্তান চা বাগানেই কলম কাটবি- এসব কথা এক সময় কষ্ট দিলেও সেই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছি। ছোটোবেলা থেকে ইচ্ছা ছিলো উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হব। গরিব হওয়াটা পথের বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অঞ্জন বলেন, আর্থিক অনটনের কারণে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করছি। ছুটিতে বেশি করে কাজ করতাম। বাবার সামর্থ্য খুব একটা না থাকায় অনেক দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে। পড়ালেখার পাশাপাশি মায়ের সঙ্গে খাসিয়া পুঞ্জিতে দিনমজুরের কাজ করি। এইমাত্র খাবার ডেলিভারি দিয়ে আসলাম। আত্মবিশ্বাসের কারণে প্রতিকূল পরিবেশেও পড়ালেখা থামেনি। ঈদ-পূজাসহ অন্যান্য ছুটিতে পুঞ্জিতে কাজ করে পড়ার খরচ জুগিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, পুঞ্জিতে সব কাজ করি। করোনা মহামারির সময় ভার্সিটির ফি জোগাড় করতে পুঞ্জির মানুষের পোষা প্রাণিদের খাবার কচু পাহাড় থেকে এনে দিতাম। এতে মজুরির সঙ্গে ৫০ টাকা বেশি পেতাম। মহামারির সময় পুঞ্জিতে সকালে যেতাম সন্ধায় আসতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ কমানোর আশায় ছুটি পেলেই বাড়ি এসে পুঞ্জির কাজে চলে যেতাম। আয় দিয়েই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ মেটাচ্ছি। 

মাভাবিপ্রবিতে ভালো খেলোয়াড় হওয়ায় মেডেলপ্রাপ্ত অঞ্জন ভুমিজ।

তিনি জানান, বাবা গরু বিক্রি, মহাজন, এনজিও থেকে ঋণ এনে আমাকে টাকা দিতেন। তিনি এই ঋণের বোঝা টেনেছেন। তাকে যেনো আর এমন কিছুই না করতে হয় সে জন্য সবসময় কাজ খুঁজি। বাড়িতে গেলেই কারো ধান কেটে দেই, কোদাল দিয়ে মাটি কাটি, ধান রোপন করি। কাজ না পেলে পুঞ্জিতে চলে যাই। তখন কিছু আয় হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলে রুমে রুমে খাবার ডেলিভারি দিই। প্রতিদিন ৫০-১০০ টাকা পাই।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চা বাগানের সংস্কৃতি আমাকে অনেক বেশি টানে। আমি আমার সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য-ইতিহাস সবাইকে জানাতে চাই।

উল্লেখ্য, অঞ্জন ভূমিজ শিক্ষার্থীদের বিনামুল্যে কোচিং ও অনলাইনে পাঠদান কার্যক্রম করে তাদের পড়ালেখায় অবদান রাখছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম

English HighlightsREAD MORE »