ডেমরার হত্যাযজ্ঞের কথা ভুলেননি গ্রামবাসী 

ঢাকা, শুক্রবার   ২৭ মে ২০২২,   ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,   ২৫ শাওয়াল ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

ডেমরার হত্যাযজ্ঞের কথা ভুলেননি গ্রামবাসী 

আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পাবনা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৩:১২ ১৪ মে ২০২২   আপডেট: ১৯:০২ ১৪ মে ২০২২

১৪ মে রুপসী-ডেমরা গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের ১৪ মে তারিখে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার রুপসী গ্রাম ও ডেমরায় পাকবাহিনী সাড়ে ৮০০ নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করেছিল। 

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার শেষ সীমানা এবং ফরিদপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় বাউশগাড়ী গ্রাম। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও এ গ্রামের স্বজনরা সেদিনের বেদনা ভুলতে পারেননি। এ ঘটনা স্মরণ করে সেদিন বিধবা হওয়া নারীরা ও স্বজনহারা মানুষজন বেদনাহত। 

রুপসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে শহিদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ হচ্ছে। রুপসী এবং এর সন্নিহিত ডেমরা সেই সময় হিন্দু প্রধান এলাকা ছিল। যুদ্ধের সময় পাবনা, বেড়া, শাহজাদপুর, কুচিয়ামারা, নগরবাড়ি প্রভৃতি এলাকা থেকে বহু মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আশ্রিত মানুষের মধ্যে অধিকাংশই ধনী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক এবং ব্যবসায়ী ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তারা নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্য তাদের সঙ্গে নিয়ে আসেন। 

এ অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের অর্থ সম্পদ এবং আশ্রিত নারীদের কথা বলে কিছু রাজাকার এবং বিহারি সম্প্রদায়ের কিছু লোক পাক হানাদার বাহিনীকে এখানে নিয়ে এসেছিল। 

স্থানীয় মজির উদ্দিনসহ অন্যরা জানান, ১৯৭১ সালের এ দিনে পাঁচশতাধিক পাকসেনা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেছিল। তখন সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়। ভোরে হানাদার বাহিনী আক্রমণও চালায়। বেলা একটা পর্যন্ত চলে নারকীয় তাণ্ডব। এ তাণ্ডবে অনেকেরই শেষ রক্ষা হয়নি। বাড়ি বাড়ি থেকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনে মানুষকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে চারশ’ মানুষই ডেমরা এবং রুপসী গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। এদের মধ্যে একজন ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। জমিদার পরিবারের আটজন নিহতের দুই ভাই মাখন লাল রায় এবং বলরাম রায়কে গাছের সঙ্গে বেঁধে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

পাকবাহিনীর হাতে নিহত হন আফিজদ্দি, আহেজদ্দি, আহেদ ফকির, ওফাজ, একেন ফকির, যদু মোল্লা, জাবেদ ফকির, ইবাদ ফকির, জামাল প্রামাণিক, আজগর, আব্দুল, মেহের, ইসমান, হারান প্রাং, মহিম শেখ, মোকছেদ আলী, বিভুতি ভুষণ কুন্ডু, বীর ভদ্র কুন্ডু, শুরেন্দ্র নাথ ঘোষ, সতিন্দ্র নাথ ঘোষ, ঋষিকেশ কুন্ডু, স্বপন কুন্ডু, সুশান্ত ঘোষ, মাহমুদ আলী, দুলাল কর্মকার, অনাথ বন্ধু, জগদীশ কুন্ডু, সতিশ চন্দ্র কুন্ডু, নীল মনি পাল, মংলা কুন্ডু, বিরেন্দ্রনাথ পাল, জামিনী মোহন পালসহ কয়েকশ’ নাম না জানা মানুষ। 

জামিনী মোহন পালকে রক্ষা করতে গিয়ে নির্মমতার শিকার হন তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী কালিমতি পাল। নিহত হন মন্টু শীল, কালাচাদ চক্রবর্তী, ফটিক চন্দ্র ঘোষ, বরুন কুমার, স্বপন গাঙ্গুলি, দিলিপ রায়সহ অসংখ্য মানুষ। 

পাক হানাদার বাহিনী নারী- পুরুষদের সারি করে দাঁড় করিয়ে হত্যা করেছিল। এ সময় কয়েকজন মানুষ কৌশল করে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। কেউ গুলি করার সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে বসে অথবা পড়ে গিয়েছিলেন। কেউ পাক বাহিনীর অগোচরে সটকে পড়েছিলেন। তাদের অনেকের পরে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। এরকম বেঁচে থাকা একজন সুবিদ ওরফে শহিদ হোসেন। তিনি জানালেন কোলের ছোট ভাইটি ছিল বলে লাইন থেকে কৌশলে বের হতে পেরেছিলেন। 

ঐদিন পালিয়ে বেঁচে যাওয়া আরো কিছু প্রবীণ স্মৃতিচারণ করেন। এ সময়ে অসংখ্য নারী ও যুবতী ধর্ষিত হয়। অনেকে সম্ভ্রম বাঁচাতে পাশের নদীতে ঝাঁপ দেন। এখানে একটি কূপের মধ্যে অনেক নারী পুরুষকে ফেলে দেওয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানান। এরপর পাক হানাদার বাহিনী তাণ্ডব চালায় ডেমরা বাজারে। তারা সব দোকান-পাট জ্বালিয়ে দেয়। পাক হানাদার বাহিনী ডেমরা ও রুপসীবাজারে অগ্নি সংযোগ করে। জীবিতরা কোনোমতে নিহতদের কবর দিয়ে রাখেন। তারা মুসলমানদের এক পাশে কবর দিয়ে রাখেন এবং হিন্দুদের অন্যপাশে মাটিচাপা দিয়ে রাখেন। ধুলাউড়ি-ডেমরা সড়কের পাশে (বাউশগারি) এলাকায় দীর্ঘ গণকবর রয়েছে। 

মুসলিমদের গণকবরের স্থানে স্থানীয়রা একটি কবরস্থান করেছেন। বলরাম রায়, রাম জগনাথ রায় ও দিলিপ রায়কে যে ভিটাতে সমাহিত করা হয়েছিল সেখানে ২০০৯ সালে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে। ঐদিন রুপসী ডেমরা গ্রামে কয়েকশ’ নারী বিধবা হন। তারা বেশিরভাগই স্বাভাবিকভাবে পরে মারা গেছেন। দু’ চারজন বেঁচে আছেন। তাদের একজন মাসুদা খাতুন। ৭০ বয়সী এ বিধবা তার দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভের কথা জানান। 

মাসুদা খাতুন বলেন, আমার স্বামী ওফাজ খাঁনের শরীরে ১৪টি গুলি লেগেছিল। সে বেদনা তিনি আজও ভুলতে পারেননি। বললেন, কত কষ্ট করে সন্তানদের মানুষ করলাম। কেউ কোনোদিন খোঁজ নিল না। সাংবাদিকরা এসব কথা কতবার শুনে গেল। কৈ আমরা তো কোনো সাহায্য পেলাম না। আমরা যারা বিধবা হয়েছিলাম তারাও তো কোনো সম্মান পেলাম না। আমার সন্তানদেরও তো কেউ খোঁজ নেয় না। 

তার স্বজনরা জানান, সরকারিভাবে তাদের একটু সম্মানিত করলে তাও তো তারা মরে যাওয়ার আগে একটু সান্ত্বনা নিয়ে যেতে পারতেন। এ বছর রুপসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হচ্ছে। পাবনা-১ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু এটির নির্মাণ কাজের ভিত্তি ফলক উন্মোচন করেন। খুব শিগগিরই স্মৃতি সৌধ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে/এমকেএ/জেএইচ

English HighlightsREAD MORE »