কেমন ছিল খানজাহান আলীর আমল?

ঢাকা, সোমবার   ১৬ মে ২০২২,   ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,   ১৫ শাওয়াল ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

কেমন ছিল খানজাহান আলীর আমল?

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩৩ ২৮ জানুয়ারি ২০২২  

খানজাহান আলীর বসতভিটায় চলছে খননকাজ। ছবি : সংগৃহীত

খানজাহান আলীর বসতভিটায় চলছে খননকাজ। ছবি : সংগৃহীত

দেশের বাগেরহাটে খানজাহান আলীর বসতভিটায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে খননকাজ চালিয়ে সুলতানি আমল এবং মুঘল আমলের মৃৎপাত্র নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর আগের স্থাপত্য রীতির নমুনা সম্বলিত দেয়াল, মেঝেসহ ঘরের কাঠামো এবং মাটির তৈরি পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপ জাতীয় জিনিস পাওয়া গেছে। প্রাথমিক অনুমানে এই জায়গাটিকে প্রাচীন টাকশাল নগরী মনে করে খননকাজ শুরু করা হয়।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা গণমাধ্যমকে জানান,খানজাহান আলীর এই বসতভিটায় গত কয়েক বছর ধরে খননকাজ চলছে। মধ্যে কয়েক বছর বিরতি দিয়ে এ বছর আবার কাজ শুরু হয়েছে, জানুয়ারির শেষে এ বছরের মতো যা শেষ হবে।

কে এই ‘খানজাহান আলী’

বিভিন্ন ইতিহাসবিদের লেখায় তার নাম খান জাহান নামে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারি কাগজপত্রে তাকে হযরত খানজাহান আলী (র:) নামে সম্বোধন করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে যোদ্ধা, শাসক এবং ধর্ম প্রচারক হিসেবে কাজ করেন। তবে নিজের পরিচয় সম্বন্ধে কেনো কিছু তিনি লিখে রেখে যাননি। এমনকি তার কোনো ছবিও পাওয়া যায় না।

যোদ্ধা, শাসক এবং ধর্ম প্রচারক খানজাহান আলীর সমাধি। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া মতে, তার সমাধিসৌধের ফলকে তার নাম লেখা আছে ‘উলুগ খান’ ও ‘খান-ই-আযম’। সমাধিফলকে তার উপাধি থেকে ধারণা করা হয় যে, খানজাহান আলী নিছক একজন স্বাধীন সৈনিক ছিলেন না। খানজাহান আলী দ্বিতীয় ইলিয়াসশাহী শাসনের সময় অর্থাৎ ১৪ শতকের শেষের দিকে বাংলায় আসেন বলে মনে করা হয়।

আরো পড়ুন : লকডাউন ফিরিয়ে দিয়েছে সাইকেলের স্মৃতি

যোদ্ধা পরিচয়ে আগমন

বাংলাপিডিয়া সূত্র মতে, খানজাহান আলী ছিলেন একজন সুফিসাধক এবং বৃহত্তর যশোর ও খুলনা জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত এলাকার আঞ্চলিক শাসক। তিনি ১৫ শতকের প্রথমার্ধে তৎকালীন খলিফাতাবাদ যা এখন বাগেরহাট নামে পরিচিত, তার শাসনকর্তা হন। প্রথমে দিল্লির সুলতানের কাছ থেকে এবং পরে বাংলার সুলতানের কাছ থেকে সুন্দরবন বনাঞ্চল জায়গীর লাভ করেন। বাংলায় তার আগমন ঘটেছিল একজন যোদ্ধা হিসেবে। অন্য সূত্র বলছে, খানজাহান আলী বাংলায় আগমন করেন একজন সেনাপতি হিসেবে। তবে যোদ্ধা পরিচয় ছাপিয়ে তার জনহিতকর কাজ এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারক পরিচয়ই শত শত বছর ধরে মানুষের মনে আছে।

যোদ্ধা, শাসক এবং ধর্ম প্রচারক খানজাহান আলীর সমাধি। ছবি : সংগৃহীত

আউলিয়া, ধর্ম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ

১৫শ শতকের প্রচলিত ব্যাপার ছিল যে শাসক বা সেনাপতির মতো শীর্ষ পদের অধিকারী ব্যক্তিদের হাত ধরে ইসলাম ধর্মের প্রচার এবং প্রসার হয়েছিল।

অ্যামেরিকান ইতিহাসবিদ রিচার্ড এম ইটনের লেখা বই ‘দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার’ এ বলা হয়েছে,সুন্দরবনের কাছে বাগেরহাট অঞ্চলের পানি লবণাক্ত হবার কারণে স্বাদু পানির অভাব ছিল। একই সঙ্গে সুন্দরবনের ঘন বনজঙ্গলের কারণে এলাকাটি ছিল দুর্গম। লবণাক্ত পানির বদলে মিঠা পানির ব্যবস্থা করার জন্য দিঘী খনন করে খানজাহান আলী। এ কাজের পর তিনি ‌ঐ অঞ্চলে জনপ্রিয়তা পান।

আরো পড়ুন : বাঙালি ঐতিহ্যের আদি সাক্ষী ‘মাটির বাড়ি’

খানজাহান আলী তার সৈন্যবাহিনী ও স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মিঠাপানির ব্যবস্থা করার জন্য বহু দিঘি খনন করেন এবং জঙ্গল কেটে চাষের জমি বের করেন। বাংলাদেশের জাতীয় তথ্য বাতায়নে বলা হয়েছে,তিনি প্রায় ৩৬০টির মতো দিঘি খনন করেছিলেন। তিনি অসংখ্য মসজিদ এবং রাস্তাঘাট তৈরি করেছিলেন। এসব পদক্ষেপের কারণে স্থানীয় মানুষের জীবন ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছিল।

ইউনেস্কোর দেয়া বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটি ষাটগম্বুজ মসজিদ। ছবি : সংগৃহীত

এসব কারণে খানজাহান আলীর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল মানুষের মধ্যে, পরবর্তীতে তিনি যখন ধর্ম প্রচার করেছেন মানুষ তাকে গ্রহণ করেছে। খুলনা-বাগেরহাটসহ দক্ষিণাঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রসারে খানজাহান আলী এবং তার অনুসারীদের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।

আরো পড়ুন : হাতে বোনা মাদুরে ফিরতে পারে বাঙালির আবেগমাখা স্মৃতি

সুশাসক

পনের শতকে ওই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপনের মান উন্নয়নে খানজাহান আলীর ব্যাপক অবদান রয়েছে। প্রথমে যোদ্ধা ও শাসক হিসেবে পরিচিত হলেও পরবর্তীতে ধর্ম চিন্তা এবং জনসেবাতেই তিনি বেশি নিয়োজিত ছিলেন। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি ছিলেন একজন আউলিয়া বা অলৌকিক ক্ষমতাবান মহাপুরুষ। যদিও তার অলৌকিক কোনো ক্ষমতা ছিল এমন প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তবে তার জনহিতকর কাজের জন্য স্থানীয় মানুষের জীবনে পরিবর্তন এসেছিল, সেটি তাকে আউলিয়া ভাবার কারণ হতে পারে বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা।

আরো পড়ুন : মধু ছেড়ে আজকাল মিষ্টি খাচ্ছে মৌমাছি, প্রকৃত কারণটা কী?

খানজাহান আলীর উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য-কীর্তির মধ্যে বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং খানজাহান আলী দিঘি বা খাঞ্জালি দিঘি অন্যতম। ষাটগম্বুজ মসজিদ ইউনেস্কোর দেয়া বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটি। এছাড়া খানজাহান আলী দিঘির এক পাশে খানজাহান আলীর মাজার, বা তার সমাধি সৌধ রয়েছে। প্রতিবছর বহু মানুষ মাজার জিয়ারত করতে এখানে হাজির হন।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি

English HighlightsREAD MORE »