যেমন ছিল মোরগের লড়াইয়ের দিনগুলো

ঢাকা, রোববার   ২৩ জানুয়ারি ২০২২,   ৯ মাঘ ১৪২৮,   ১৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

যেমন ছিল মোরগের লড়াইয়ের দিনগুলো

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪৫ ১৪ জানুয়ারি ২০২২  

মোরগের লড়াই। ছবি : সংগৃহীত

মোরগের লড়াই। ছবি : সংগৃহীত

গ্রামের ছোট্ট বাজার। বাজারে এসেছে গ্রামের অনেক মানুষ। বাজারের পাশেই ছোট্ট একটি মাঠ, মাঠের এক কোণে একটি মস্ত বটগাছ। সেই বটগাছের নিচেই চলছে লড়াই। মোরগের লড়াই। যেমন ভিড়, তেমনি চেঁচামেচি, চিৎকার, হট্টগোল। এ ছাড়া রয়েছে মুখে খিস্তি ও গালিগালাজ।

এমন দৃশ্য হয়তো দেখেছেন অনেকেই। প্রবীণদের কাছে জিজ্ঞ‍াসা করলে এ দৃশ্যের আরো ভালো বর্ণনা মিলবে।  

গত পাঁচ দশক আগেও গ্রামে-গঞ্জের হাটে বাজারে হাটের দিনগুলোতেই মোরগের লড়াইয়ের আসর বসতো। কিন্তু বর্তমানে এই খেলা আগেকার মতো আর হয় না। খুবই কমই চোখে পড়ে। তবে মোরগের লড়াই কেমনভাবে হতো তা হয়তো জানার ইচ্ছে আছে এ প্রজন্মের।

মোরগের লড়াই। ছবি : সংগৃহীত

শিশুদের একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা খেলা যেই রকম তেমনি মোরগের লড়াই খেলাটি সেইরকমই। এটি সুন্দরবনে আদিবাসীরদের সর্বাপেক্ষা প্রিয়খেলা। এই খেলা আদিবাসী ছাড়াও হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা লাভ করে। সুন্দরবনে বিভিন্ন অঞ্চল ও আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাট- বাজারেকে কেন্দ্র করে এই খেলা বসতো। বিশেষ করে সুন্দরবনে বনবিবির মেলা, কৃষিমেলা দিনে মোড়গের লড়াই দেখা বেশি যেত।

বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলায় এই খেলার বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। ভারতে দেখা যাবে, লড়াইয়ের পাশেই মহিলারা বসে হাঁড়ি নিয়ে জাল দিচ্ছে ‘হাঁড়িয়া’। মোরগের লড়াইয়ের অনন্দে গ্লাস গ্লাস হাড়িয়াও খাচ্ছে অনেকে।

প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, হাটের দিন চারিদিকের মানুষ হাটে আসে। আর হাটকে কেন্দ্র করে জমে উঠত এই খেলা। আগে হাটগুলোর ভগ্ন দশা ছিল। হাটে বর্ষায় জল ও কাদা জমে যেত। হাট বসতে সমস্যা হতো। সেই অবস্থাতেও বসতো মোরগের লড়াই। বিগত কয়েক দশক মোরগের লড়াই ততটা দেখা যায় না।

মোরগের লড়াই। ছবি : সংগৃহীত

গ্রামে মোরগের লড়ায়ের আসর বসত প্রতি সপ্তাহে। হাটগুলোতে বিকেলের দিকেই মোরগের লড়াই আসর বসত। লড়াই শুরু হওয়ার আগে তাদের নাম নথিভুক্ত করতে হতো। সাধারণত ১০ থেকে ৪০ টাকাও জমা দেতে হতো নথিভুক্তের সময়। আর তারপর খেলা শুরুর আগে মোরগের খেলোয়াড়রা নিজেদের মোরগ নিয়ে সমকক্ষ জোড় খোঁজার জন্য অন্যান্য মোড়গের সামনে রেখে পরীক্ষা করে দেখে নেন। মোরগের সমান সমান জোড় নাহলে লড়াই করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন মোরগের সঙ্গে মোরগের লড়াই হতো। যেমন বন মোরগ, কাওড়া মোরগ ও জংলি মোরগ ইত্যাদি। ভালো জাত মোরগ ভালো দামে ব্রিক্রি হয়। রক্তমাতাল হওয়া মোড়গ লড়াইয়ের জন্য ঘাড়ের পালক ফুলিয়ে দিত।

কথিত আছে, মোরগকে রাগানোর জন্য নানাপ্রকার পদ্ধতি অবলম্বন করা হতো। এই কাজটি করত খেলোয়াড়রা। যেমন মোরগকে কখনও হাড়িয়া খাওয়ানো হতো। ফলে মোরগ নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ত। এই লড়াইয়ের আগে বেটিং শুরু হয়, ১০০ থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা বেটিং ধরা হতো। মোরগের পায়ে অস্ত্র বাঁধার জন্য কাঁতিদার থাকত। কাঁতিদার চটের উপর কাঁত, চামড়া টুকরো সুতো নিয়ে বসে থাকে। আর এরাই মোরগের পায়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বেঁধে দেয়। যেমন- সোজা ফলি, বাঁকা ফলি, লোহার ধারালো অস্ত্র বাঁধা হত। এইসব অস্ত্রগুলোতে তুঁতে মাখানো থাকে। যাতে খুব সহজে ঘায়েল করা যায়।

মোরগের লড়াই। ছবি : সংগৃহীত

যখন মোরগের লড়াই চলে তখন দর্শকদের হাতে তালি দেয়া নিষিদ্ধ। এটা তাদের নিয়ম। তবে অনেক সময় মোরগের লড়াইকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসীদের মধ্যে ঝগড়া ও মারামারি শুরু হতো। এইসব অশান্তি ঠেকাতে আসতেন হাটের সমিতি লোকজন বা গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা।

নানা কারণে মোরগের লড়াই আজ বিলুপ্তপ্রায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের আনন্দ, আমোদ, প্রমোদ দেয়ার জন্য আজও গ্রামের বিভিন্ন হাট- বাজারে এই খেলার আসর বসে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি

English HighlightsREAD MORE »