মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হারুন হাবীব এক জীবন্ত কিংবদন্তী

ঢাকা, রোববার   ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১২ ১৪২৮,   ১৭ সফর ১৪৪৩

মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হারুন হাবীব এক জীবন্ত কিংবদন্তী

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:২১ ৪ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১০:২৫ ৫ আগস্ট ২০২১

মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হারুন হাবীব

মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হারুন হাবীব

বাংলাদেশের সাহিত্য,  সাংবাদিকতা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংস্কৃতিচর্চায়  হারুন হাবীব একটি উল্লেখযোগ্য নাম। এই নামটি সকলের পরিচিত। হারুন হাবীব আমাদের জামালপুরের কৃতী সন্তান। তার বাড়ি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায়। ১ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। হারুন হাবীব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায়  এম.এ এবং ‘‘ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ মাস কমিউনিকেশন’ (আইআইএমসি) থেকে গণযোগাযোগের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। 

কলম, ক্যামেরা ও স্টেনগান এই অস্ত্র একসঙ্গে ধরেছিলেন তিনি ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে। বাংলাদেশের যুদ্ধ-সাংবাদিকতার ইতিহাসে তার ভূমিকা অনন্য। রণাঙ্গনের সশস্ত্র যোদ্ধা হয়েও তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র ‘জয় বাংলা’ পত্রিকা ও ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’-এর ১১ নম্বর সেক্টরের যুদ্ধ-সংবাদদাতার দায়িত্ব পালন করেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে। 

একাত্তরে বাহাদুরাবাদ ঘাট মুক্ত করার অভিযানের সময় হারুন হাবীবের তোলা ছবি১৯৭০ এর নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্স শেষবর্ষের ছাত্র ছিলেন। স্বাধীনতার দাবিতে সমগ্র জাতি তখন মরিয়া। হারুন হাবীব অন্যান্য ছাত্র নেতা এবং স্বাধীনতা কর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন মিছিল-মিটিং নিয়ে ঢাকার রাজপথে তীব্র আন্দোলন শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী নিজ জেলা জামালপুর এবং ময়মনসিংহ এলাকাতে চলে আসেন। উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি এবং তরুণ-যুবকদের সংগঠিত করা। ১৬ই মার্চ নিজ জন্মস্থান দেওয়ানগঞ্জ উপজেলাতে চলে আসেন এবং স্থানীয় জনগণকে সংগঠিত করা শুরু করেন। 

১৯৭১ সালে জাতীয় রণাঙ্গন  থেকে ফিরে যে  কতিপয় মুক্তিযোদ্ধা সরাসরি লেখালেখির অঙ্গনে প্রবেশ করেন,  তিনি  তাদের প্রধানতম।  তার ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা, নাটক  ও  সংবাদপত্রের কলামসমূহের প্রধান বৈশিষ্ট - তিনি নিরবচ্ছিন্ন ধারায় তুলে ধরেন  মুক্তিযুদ্ধকে, জাতির পিতার হত্যাকান্ড পরবর্তি বিজাতীয় সময়কে, সেই সঙ্গে  জাতির মহত্ত্বম ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে, বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতি সত্ত্বাকে।

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে অবদানের জন্যে তিনি  বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একাডেমির  ‘ফেলো’ হবার সম্মানসহ বিভিন্ন স্বীকৃতি লাভ করেন।  মুক্তিযুদ্ধে তিনটি অস্ত্র চালাবার বিরল সৌভাগ্য  লাভ  করেন হারুন হাবীব।  ষ্টেনগান, কলম ও ক্যামেরা  ছিল তার মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার। একাত্তরের গেরিলা যোদ্ধা হারুন হাবীব একই সঙ্গে  রণাঙ্গন সংবাদদাতার দায়িত্ব পালন করেন  ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ও ‘জয়বাংলা’পত্রিকার মতো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের। সেই সুবাদে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন পর্যায়ের অসংখ্য দূর্লভ ছবি ফ্রেমবন্দি হয়ে আছে তার ক্যামেরায় - যা জাতীয় ইতিহাসের অসামান্য দলিল। 

হারুন হাবীবের  উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ সংখ্যা  ৫০ এর অধিক -  যার প্রায় সবগুলিই  মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি সমাজের আত্মপরিচয় সন্ধানের নিরন্তর লড়াইকে কেন্দ্র করেহারুন হাবীব বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদকের  গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এমন এক দুর্যোগময় সময়ে যখন স্বাধীনতা বিরোধীচক্রের দীর্ঘ  কায়েমি স্বার্থ  মুক্তিযুদ্ধপন্থি রাজনীতির জয়যাত্রাকে ব্যর্থ করতে জোটবদ্ধ হয়েছিল।  আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম  ‘জার্মান বেতার তরঙ্গ’, ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকা  ‘দ্য হিন্দু’ও ‘ফ্রন্টলাইন’ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে  তার পর্যালোচনা ও প্রতিবেদন প্রায় পাঁচ দশক ধরে তুলে ধরেছে মুক্তিযুদ্ধের  লুণ্ঠিত গৌরব পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে রত বাংলাদেশকে,  যে বাংলাদেশ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে  ১৯৭৫ পরবর্তি সেনাপতির হাতে। 

হারুন হাবীবের  উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ সংখ্যা  ৫০ এর অধিক -  যার প্রায় সবগুলিই  মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি সমাজের আত্মপরিচয় সন্ধানের নিরন্তর লড়াইকে কেন্দ্র করে। এই নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা, লেখক,  মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব  আজো  নিরলস ভাবে যুক্ত মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চা ও  জাতীয় গৌরব পুনরুদ্ধারের বিরতিহীন সংগ্রামে।

হারুন হাবীব অত্যন্ত বিনীয় নম্র ভদ্র সজ্জন মানুষ তিনি। নিভৃতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষণা, সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যে অবদান রেখে চলেছেন। হারুন হাবীবের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ  
উপন্যাস : 
১. প্রিয়যোদ্ধা প্রিয়তম (১৯৮২), ২. সোনালি ঈগল ও উদ্বাস্তু  সময় ( ২০০৫),  ৩. পাঁচপুরুষ (২০১৫), ৪. অন্তশীলা (১৯৯৫), ৫. কলকাতা- ১৯৭১ (২০২০) ।  
ছোটগল্প:
১. লাল শার্ট ও পিতৃপুরুষ (১৯৮৫), ২. বিদ্রোহী ও আপন পদাবলী( ১৯৮৫), ৩. স্বর্ণপক্ষ ঈগল (১৯৮৭), ৪.  মুক্তিযুদ্ধঃ নির্বাচিত গল্প (১৯৯৪),  ৫.  ছোটগল্প ১৯৭১ (২০১৭), ৬. গল্পসপ্তক (১৯৯৭),  ৭. অন্ধ লাঠিয়াল (১৯৯৯)।  
গবেষণা:  
১. বাংলাদেশের মুক্তিযদ্ধে ভারত, তথ্য ও দলিল -পশ্চিমবঙ্গ (২০১৭) ২. বাংলাদেশের মুক্তিযদ্ধে ভারত, তথ্য ও দলিল -ত্রিপুরা (২০১৭), ৩. বাংলাদেশের মুক্তিযদ্ধে ভারত, তথ্য ও দলিল - আসাম ও মেঘালয় (২০১৭)। ৪. মুক্তিযুদ্ধ : ডেটলাইন আগরতলা( ১৯৯২),  ৫. ইতিহাসের আলোকে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ(২০১৭), ৬. রবীন্দ্রনাথের ত্রিপুরা (১৯৯৯), ৭. গণমাধ্যম ১৯৭১ (২০১৭), ৮. বঙ্গবন্ধু - নবীন সংবাদকর্মির  চোখে (২০২০), ৯. মুজিব জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ (২০২০)। 
প্রবন্ধ ও যুদ্ধস্মৃতি: 
১. মুক্তিযুদ্ধ : বিজয় ও ব্যর্থতা(১৯৯০), ২. মুক্তিযুদ্ধঃ পালাবদলের ইতিহাস(২০১১), ৩.  মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত প্রবন্ধ(২০০০), ৪. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধ (২০০২), ৫.  প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে মুক্তিযুদ্ধ (১৯৯১), ৬. গণহত্যা প্রতিরোধ স্বাধীনতা(২০০০), ৭. জনযুদ্ধের উপাখ্যান( ১৯৯৩), ৮.  Bangladesh : Blood and Brutality( 2000),  9. Bangladesh – Genocide 1971(2008), 10. Looking Beyond Boundaries- India Bangladesh Relations (2012).  
নাটক: 
১. পোষ্টার-৭১ (১৯৮০), ২. অগ্রাহ্য দন্ডোৎসব (১৯৮৫)। 
কাব্যগ্রন্থ : 
১. গীতসম্ভার (২০২১), ২. অনাবিস্কৃত স্বভূমি (২০২১) । 
শিশুতোষগ্রন্থ : 
১. হেয়ারফিল্ডের রাজা (২০১৯), ২. স্বপ্নের পাখিকুঞ্জ(২০১৯) । 
মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র এ্যলবাম :
১। একাত্তরের যাত্রী (২০০৯)। ২. মুক্তিযোদ্ধার ক্যমেরায় ১৯৭১ ( ২০২১) 
সম্পাদনা : ১.  ‘জীবনানন্দ’ সাহিত্য পত্রিকা.২. ‘তারুণ্য’ সাহিত্যপত্র।  

নিভৃতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষণা, সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যে অবদান রেখে চলেছেন তিনি এ ছাড়াও তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্কীতে সেক্টর কমান্ডারর্র্ ফোরাম থেকে রয়াল সাইজের সাড়ে চারশত পৃষ্ঠার ‘মুজিব জন্মশতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ’ সম্পাদনা করেছেন হারুন হাবীব। বৃহৎ গ্রন্থটিতে বঙ্গবন্ধুর জীবন,দর্শন ও রাজনীতির প্রায় সকল অধ্যায় আলোচিত ও পর্যালোচিত হয়েছে, সেই সঙ্গে আছে জাতির পিতার কাছের মানুষদের স্মৃতি,শোকাবহ ১৫ অগাষ্টের প্রত্যক্ষদর্শি বয়ান, টুঙিপাড়ার মাটিতে বাঙালি মহানায়কের শেষ শয়নের প্রত্যক্ষদর্শি বৃত্তান্ত, দেশ ও বিদেশের বহু গূণীজনের অসামান্য মূল্যায়ন ও স্মৃতিচারণ।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে