গানের পাখি ক্যানারির রূপও চোখ ধাঁধানো  

ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৯ ১৪২৮,   ১৫ সফর ১৪৪৩

গানের পাখি ক্যানারির রূপও চোখ ধাঁধানো  

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৪৭ ৪ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১২:৫৬ ৪ আগস্ট ২০২১

ক্যানারি

ক্যানারি

অনেকেরই বাড়িতে পোষ্য রয়েছে। কুকুর, বিড়ালের পাশাপাশি পোষ্য হিসেবে পাখি প্রায় সবার পছন্দের তালিকায় প্রথম। তবে পোষার ক্ষেত্রে বেশিরভাগই বেছে নেন ময়না, টিয়া, ঘুঘুসহ নানান ধরনের এবং রঙের পাখি। তবে যারা একটু বেশি সৌখিন তারা ভিনদেশি নানান পাখিও পালন করে থাকেন। 

পোষ্য হিসেবে ক্যানারি পাখিও কিন্তু খুবই ভালো। গানের পাখি নামে খ্যাত এই পাখির রূপ, গুণের শেষ নেই। স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে বেশি পাওয়া যায় বলে এই পাখির নামই হয়ে গেছে ক্যানারি। মিষ্টি সুরে গান গায় বলে ১৭ শতক থেকেই এরা অনেক দেশের জনপ্রিয় পোষাপাখি। তবে পুরুষ পাখির গলা বেশি মিষ্টি। চলুন এই পাখিটি সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক- 

স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে বেশি পাওয়া যায় বলে এই পাখির নামই হয়ে গেছে ক্যানারি"ক্যানারি" নামটি এসেছে পূর্ব আটলান্টিকে অবস্থিত স্পেন এর উপকূলের একটি আইল্যান্ড বা দ্বীপ থেকে। এখানে আগে বড় জাতের এক ধরণের কুকুর পাওয়া যেতো, যাদেরকে ল্যাটিন ভাষায় "ক্যানারিয়া" বলা হতো। এই নাম অনুসারে দ্বীপের নাম রাখা হয় ক্যানারি এবং ১৫০০ সালের দিকে এখানেই প্রথম আমাদের আলোচ্য পাখিটিকে দেখা যায় বলে তার নাম রাখা হয় "ক্যানারি" !

আটলান্টিক মহাসাগরের নাবিকগণ এই পাখির ডাক শুনে মুগ্ধ হয়ে যান এবং সেগুলো ধরে বিক্রি করা শুরু করেন। এগুলো ছিল ওয়াইল্ড ক্যানারি, হলুদের সঙ্গে সবুজ রং মিশ্রিত, প্রকৃতিতে এই একটা প্রজাতিই পাওয়া যায়। অসাধারণ সুরের জন্য এদের বেশ কদর
ছিল তখন, তাই শুধু ধনী ব্যক্তিদের ঘরেই এরা দৃশ্যমান ছিল। ধীরে ধীরে এটি সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ১৭০০ শতকে, আনুমানিক ১৬৭০-৭২ সালে সর্বপ্রথম খাঁচায় ব্রিড করানো সম্ভব হয়। বর্তমানে উক্ত দ্বীপেই প্রায় ৩ লাখের বেশি ক্যানারি বসবাস করছে, মাদেইরা দ্বীপেও আছে দেড় লাখের মত।

দৈহিক গঠন
বেশ লম্বা একটি লেজসহ প্রজাতিভেদে এরা দৈর্ঘ্যে ৪.৮ থেকে ৫.৪ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। গঠন অনেকটা আমাদের দেশি পাখি চড়ুই এর মত। ওজন প্রজাতিভেদে ১২ থেকে ২৮ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। ঠোঁট টা একটু চিকন ও লম্বাটে। খাঁচায় এরা ৮ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে
পারে।

গ্লস্টার ক্যানারি প্রজাতি
ক্যানারির বহু মিউটেশন আছে। সচরাচর আমরা যে  ক্যানারি টা বেশি দেখি সেটাহল "ডোমেস্টিক" ক্যানারি", টকটকে হলুদ রং এর।  এছাড়া মূলত ৩ প্রকারের ক্যানারি ব্রিড করানো হয়,ক. রং এর জন্য : বিভিন্ন রং এর ক্যানারি উৎপাদনের জন্য করা হয়,যেমন : ইনো, ইউমো, সাটিনেট, আইভোরি, মোজাইক, রেড ফ্যাক্টর ইত্যাদি। এরা সাদা, হলুদ,লাল, বাদামী, খয়েরী, কালো ইত্যাদি বিভিন্ন রং এর হয়।

খ. গানের জন্য : এদের গলা প্রচন্ড সুরেলা এবং ডিমান্ডও অনেক বেশি, যেমন : টিমব্রাডো, জার্মান রোলার, ওয়াটার স্লাগার, পারসিয়ান সিঙ্গার ইত্যাদি। গ. শারিরীক গঠনের জন্য : যেমন - গ্লস্টার, ফ্রিল্ড, ক্রেস্টেড, ইয়োর্কশায়ার ইত্যাদি। 

আচরণ
ক্যানারির গানের কোনো তুলনা হয় না। পুরুষ ক্যানারি পাখি খুব সুন্দর করে গান করে। অন্যান্য ফিঞ্চের মত এরাও গোসল করতে খুব পছন্দ করে। একটু হিংস্র স্বভাব আছে, মারামারি বাঁধালে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। কলোনীতে থাকতে তেমন একটা পছন্দ করে না, আলাদা থাকাই পছন্দ। মানুষের সঙ্গে বেশ দ্রুত সখ্য গড়ে তোলে। হাত থেকে খাবার খায়, হাতের ওপর বসে গান ও গায় !

পুরুষ ক্যানারির গালের গলা বেশি মিষ্টি খাঁচা
একজোড়া ক্যানারির জন্য খাঁচার সর্বনিম্ন মাপ ১৮"১৮"১৮ ইঞ্চি। খাঁচায় পাখিকে ব্যাস্ত রাখার মত পর্যাপ্ত খেলনা দিতে হবে। আয়না, দোলনা, মই, বল ইত্যাদি দেওয়া যায়। প্রতিদিন অন্তত ১২-১৪ ঘন্টা আলো থাকে এমন জায়গায় খাঁচাটিকে স্থাপন করতে হবে। শুধু গান শোনার
জন্য রাখতে চাইলে সিঙ্গেল। পুরুষ পাখি মানুষের কাছাকাছি অবস্থানে রাখতে হবে, কারণ এরা মানুষ দেখলেই বেশি ডাকে। খাঁচা সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

খাবার-দাবার
ক্যানারি সীডমিক্সের চেয়ে অন্য খাবার, বিশেষ করে সবুজ শাকসবজিতেই বেশি আগ্রহী। সীডমিক্সে চীনা- কাউনের পাশাপাশি ক্যানারি,
মিলেট, পোলাও ধান, তিশি, গুজিতিল, হেম্পসিড ইত্যাদি দেওয়া যায়। নরমাল পাখি প্রতিদিন তার  শরীরের ওজনের ১০-১২% এবং
ব্রিডিং এ থাকা পাখি ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত খাদ্য গ্রহণ করে। ফল বা সবজি দিতে চাইলে গ্রেটারে ঘষে একদম মিহি করে অথবা ভর্তা করে দিতে হবে, সঙ্গে ডিম সিদ্ধ মিশিয়ে  এগফুড বানিয়েও দেওয়া যায়। শাক-পাতার মধ্যে পালং, কলমি, সরিষা শাক, লাল শাক, লেটুস পাতা, ধনেপাতা, নিমপাতা, সজনে পাতা ইত্যাদি খায় এরা।

ক্যালসিয়াম & মিনারেলের জন্য কাটেল ফিসবোন, ভালো মানের মিনারেল ব্লক বা ডিমের খোসা ধুয়ে রোদে শুকিয়ে গুঁড়া করে দিতে হবে। প্রোটিনের জন্য মেলওয়ার্ম বেস্ট, না পাওয়া গেলে এগফুডেও কাজ চলবে। খাঁচায় গ্রিট রাখা আবশ্যক।

এদের বয়স যেমন দেখে বোঝা যায় না, তেমনি লিঙ্গও সনাক্ত করা খুব কঠিন বয়স নির্ধারণ
বাচ্চা এবং বয়স্ক ক্যানারি দেখতে অনেকটা একইরকম, তাই বোঝা বেশ কষ্টকর। তবে প্রথম মোল্টিং হওয়ার আগ পর্যন্ত বাচ্চাদের শরীরের রং বয়স্কদের তুলনায় একটু ফ্যাকাসে থাকে এবং তারা বয়স্কদের মত ডাকাডাকি করতে পারে না। এমনকি এই পাখির পুরুষ এবং নারী পাখি শনাক্তকরণও বেশ কষ্টসাধ্য। একমাত্র ডাকাডাকি শুনেই ক্যানারির লিঙ্গ নির্ধারণ সম্ভব। যেই পাখিটার জেন্ডার আপনি জানতে চাচ্ছেন সেটাকে আলাদা একটা খাঁচায় অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখুন। পুরুষ হলে অবশ্যই সুন্দর করে গান করবে। তবে নতুন জায়গায় খাপ খাওয়াতে না পারলে ছেলে পাখিও চুপচাপ থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে ২-৩ দিনের মধ্যে না ডাকলে অন্য একটি ক্যানারি এনে তার পাশে রাখুন এবং লক্ষ্য করুন।

ব্রিডিং
ক্যানারির ব্রিডিং মোটামুটি সহজ। অন্যান্য ফিঞ্চের তুলনায় এদের প্রাইভেসি বেশি লাগে না। এরা ডায়মন্ড ডাভের মত তাওয়া তে ব্রিড করতে পছন্দ করে। তাওয়া টা ধাতু বা প্লাস্টিকের হলে ভালো হয়। বেশি দিন টিকবে এবং পরিষ্কার করাও সহজ। নেস্টিং ম্যাটেরিয়াল হিসেবে পাটের দড়ি বা শুকনা ঘাস দেয়া যায়। এরা সাধারণত ৩-৫ টি ডিম পাড়ে, ডিমগুলো কোয়েল পাখির ডিমের মতো ছোপ ছোপ যুক্ত। ১৪-১৬ দিন তা দেয়ার পর ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে। এই সময়টাতে পুরুষ পাখিই তার সঙ্গীকে খাইয়ে দেয়। এক মাসের মধ্যেই বাচ্চা রেখে তারা আলাদা হওয়ার জন্য মোটামুটি প্রস্তত হয়ে যায়। তবে এই সময় পর্যন্ত বাবা-মা দুজনেই বাচ্চার যত্ন নেয়। এসময় প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার, যেমন- মেলওয়ার্ম, অঙ্কুরিত বীজ, এগফুড ইত্যাদি বেশি করে দেওয়া জরুরি।

ক্যানারি সাদা রঙেরও হয়ে থাকে রোগব্যাধি

অন্যান্য ফিঞ্চের মত ক্যানারিও ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা একটু বেশি। সেজন্য শীতকালে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে, নিয়মিত তুলসি দ্রবন & এসিভি খাওয়ালে পাখির রোগ অনেকাংশেই কমে যাবে। এছাড়া স্ক্যালি ফেস মাইটস রোগেও এরা আক্রান্ত হয়। সেক্ষেত্রে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে