৩০ জুলাই ১৯৭১: চিত্রনায়িকা কবরী, কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বারকে আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ

ঢাকা, রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৪ ১৪২৮,   ১০ সফর ১৪৪৩

৩০ জুলাই ১৯৭১: চিত্রনায়িকা কবরী, কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বারকে আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:২২ ৩০ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১০:২২ ৩০ জুলাই ২০২১

মুক্তিযুদ্ধে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ফাইল ছবি

মুক্তিযুদ্ধে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ফাইল ছবি

১৯৭১ সালের আজকের এইদিনটি ছিল শুক্রবার। এদিন সেকেন্ড লেফটেনেন্ট ইমামুজ্জামানের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর এক প্লাটুন যোদ্ধা চৌদ্দগ্রামের চার মাইল দক্ষিণে নানকরায় পাকবাহিনীর ২৯তম বেলুচ রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানীর একটি জীপকে অ্যামবুশ করে। এই অ্যামবুশে পাকবাহিনীর ৬ জন সৈন্য নিহত ও ড্রাইভার আহত অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বন্দী হয়। মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের অনেক অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করে নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসে।

কুমিল্লার উত্তর ও উত্তর-পূর্ব অংশে শত্রুদের কয়েকটি অবস্থানে মুক্তিফৌজ অ্যামবুশ করে। এতে অসংখ্য পাক সেনা হতাহত হয়। শ্রীমান্তপুরে শত্রুদের আস্তানায় আক্রমণ হয়। এতে ১১ জন নিয়মিত সেনা নিহত হয়। একই দিনে একই স্থানে আরেকটি অ্যামবুশে আরও ৪ জন শত্রুসেনা নিহত হয়। কোটেশ্বর ও রাচিয়াতে আলাদা অ্যামবুশে ৪ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়। আনন্দপুর ও নারায়ণপুরের আরও ৪টি অবস্থানে অ্যামবুশ করা হয়। সেখানে যথাক্রমে ১২ ও ১৮ জন পাকসেনা নিহত হয়।

আশুগঞ্জ-সিদ্ধিরগঞ্জ লাইনে সরবরাহকারী বৈদ্যুতিক গ্রিডের দুটি পোল ধ্বংস করা হয়। ফলে আশুগঞ্জ-ঢাকা বিদ্যুত সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। একই দল ভৈরব-নরসিংদী-ঘোড়াশাল বাইপাস হয়ে কাজ করা আশুগঞ্জ-ঢাকা লাইনের ১০০০ কিলোওয়াট গ্রিড ধ্বংস করে দেয় এবং ভৈরব-ঢাকা টেলিফোন লাইনের দুটি করে মোট ৪টি পোল ধ্বংস এবং উপড়ে ফেলে।

রাত সাড়ে ১১টায় গেরিলা বাহিনী চৌদ্দগ্রামে ঢুকে মর্টার এবং এসএমজি ব্যবহার করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। সকাল পর্যন্ত চলা এই আক্রমণে শত্রুবাহিনীর বেশ কিছু সদস্য নিহত হয়। ঢাকার এক নম্বর সামরিক আদালত বিশিষ্ট চলচ্চিত্র শিল্পী (চিত্রনায়িকা) কবরী চৌধুরী ও কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বারকে ১৩ আগষ্টের মধ্যে এবং ছাত্রনেতা ও মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা মহসীন মন্টু, কামরুল আনাম খান খসরু ও আব্দুল গণি মনুকে ১৬ আগষ্টের মধ্যে আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দেয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উপস্থিত না হলে তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা করা হয়।

সামরিক আদালত মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ১৩ জন তরুণকে আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দেয়। এরা হচ্ছেন মোহাম্মদ ইদ্রিস (চাঁদপুর), আব্দুল ওহাব (দাউদকান্দি), আব্দুর রহমান (বেগমগঞ্জ), ভুলু (সেনবাগ), মুজিবুর রহমান (দেবীদ্বার), কালুগাজী, শফি, কাফী, সাদী, মান্নান, বারেক, খালেক ও শরাফত (সবাই ঢাকার রায়পুরার বাসিন্দা)। আদেশে নির্দিষ্ট সময়ে হাজির না হলে তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়।

সিলেট রেজিস্টার ময়দানে ড. আবদুল মজিদের সভাপতিত্বে স্বাধীনতা বিরোধীদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন মওলানা আব্দুল লতিফ (ফুলতলী), সাবেক মন্ত্রী আজমল আলী চৌধুরী। সভাশেষে রাজাকাররা কুচকাওয়াজ করে। ওয়াশিংটন পোস্ট সম্পাদকীয় নিবন্ধে লেখে, পাকিস্তানে হিটলারের পরে সংগঠিত হওয়া সবচেয়ে বড় হত্যাকান্ডের সাক্ষী হচ্ছে – আজকের বিশ্ব। হলোকাস্টের ফলে যখন শত সহস্র লোক মারা গেছে এবং কোটি লোক পালিয়ে গেছে, তখন পৃথিবী এসব আতঙ্কের দিকে শুধু তাকিয়েই দেখেছে প্রতিবন্ধীদের মতো তাদের জন্য করেছে সামান্যই। এই বেদনাদায়ক ঘটনাসমূহের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে নিহতদের জন্য দুঃখ প্রকাশ এবং বেঁচে থাকা লোকদের জন্য ভিক্ষা প্রদান করতে চেয়েছে পাশাপাশি তারা পাকিস্তানে হামলা চালানোর জন্য ভারতীয় বাহিনীকেও দায়ী করেছে।

দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লী একটি বিষয়ে খুবই সজাগ, আর তা হলো বাংলাদেশ বিষয়টি যেন কোনভাবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার একটি বিষয় না হয়। ইসলামাবাদ যখন দাবি করেছিল যে, বাংলাদেশের সংগ্রাম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, তখন বিশ্বমানবতার উচিত ছিল হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। লাখ লাখ উদ্বাস্তু যখন ভারত আসছিল তখন এটা আর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। ভারত এটাকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে মেনে নিতে নারাজ। আশা করা হয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সঙ্গে সঙ্গে এ্যাকশন নেবে। এবং পাকিস্তানকে থামাতে চেষ্টা করবে। এটা শুধু মানবতার দিক থেকেই নয় পার্শবর্তী দেশের জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ের প্রতি হুমকি। পাকিস্তান ও তার বন্ধু দেশগুলো এখন বাংলাদেশ বিষয়কে তাদের পক্ষে নেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক প্রভাব ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন।

সিনেটে মন্ডেল ও ফ্রেজার যৌথ প্রস্তাবে বলেন, মি. প্রেসিডেন্ট, ব্যাপক মৃত্যু ও দুঃখ-দুর্দশার এই বিশ্বে পূর্ব-পাকিস্তানের এই ভীতিকর পরিস্থিতির কোনো সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় না। শত হাজার মানুষ রোগ, অনাহার ও সামরিক বাহিনীর পাশবিক নিপীড়নে মৃত্যুবরণ করেছে। এখন প্রায় ৭০ লাখেরও অধিক মানুষ চরম হতাশায় ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, আমেরিকার জনগণ এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির একটা বিশেষ ব্যাপার উপলব্ধি করতে পেরেছে, আর তা হচ্ছে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রতি আমাদের সরকারের অযৌক্তিক অবহেলা। মিথ্যা বর্ণনা আর অসার প্রতিশ্রুতি যা যুক্তরাষ্ট্র করে এসেছে যখন তারা পূর্ব পাকিস্তানের দমনমূলক সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ করছিল আর লক্ষাধিক মানুষ নিপীড়িত হওয়া সত্ত্বেও তারা নির্মম নীরবতা বজায় রেখেছিল।

সিনেটর পিয়ারসন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে প্রদত্ত বক্তৃতায় বলেন, আমেরিকানদের জন্য হাজার হাজার মানুষের অনাহারে অকারণ বীভৎস মৃত্যুর মাঝে চুপচাপ বসে থাকা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। পূর্ব পাকিস্তানে অনাহারে মানুষের অনর্থক মৃত্যু আমেরিকার জনগণের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে, সম্ভবত যার প্রভাব দৃষ্টি আকর্ষক বাইজেন্টাইনের চেয়েও বেশি। মি. প্রেসিডেন্ট, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কি পাকিস্তানের জনগণকে এ কথা বোঝাতে ব্যর্থ হওয়া উচিত যে আমেরিকার অনেক মানুষ এই অপ্রয়োজনীয় অনাহার ও মানুষের এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞকে উপেক্ষা করতে পারছে না? কংগ্রেস, আইনসঙ্গতভাবেই, পাকিস্তানে অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যকে বন্ধ করার প্রয়োজন বোধ করতে পারে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে