প্রথম আকাশচারী, বেলুনে চড়েই পাড়ি দিয়েছিলেন ৫২ কিলোমিটার

ঢাকা, শনিবার   ৩১ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১৭ ১৪২৮,   ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

প্রথম আকাশচারী, বেলুনে চড়েই পাড়ি দিয়েছিলেন ৫২ কিলোমিটার

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৪:০৬ ১৮ জুন ২০২১   আপডেট: ০৫:১০ ১৮ জুন ২০২১

প্রথম আকাশচারী, বেলুনে চড়েই পাড়ি দিয়েছিলেন ৫২ কিলোমিটার। ছবি; অ্যামিউজিংপ্ল্যানেট

প্রথম আকাশচারী, বেলুনে চড়েই পাড়ি দিয়েছিলেন ৫২ কিলোমিটার। ছবি; অ্যামিউজিংপ্ল্যানেট

বর্তমান সময়ে বিমানে চড়ে মানুষ সহজেই হাজার কিলোমিটারের দূরের গন্তব্যে পৌঁছে যায়। শুধু ভ্রমণের জন্যই নয় যুদ্ধ বিগ্রহেও বিমান ব্যবহৃত হয়। কয়েকশ বছর আগে আকাশ পথে ভ্রমণ মানুষের কাছে কল্পনার মতোই ছিল। তবে স্বপ্নচারী অনেকেই আকাশ পথে উড়ার চেষ্টা করেছেন। জাঁ-ফ্রানকোইস পিলাত্রে দে রোজিয়ার প্রথম বেলুনে চড়ে আকাশে উড়ে বিস্ময়কর ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।

ফরাসি অধ্যাপক জাঁ-ফ্রানকোইস পিলাত্রে দে রোজিয়ার ১৭৮৩ সালে প্রথম বেলুনে চড়ে আকাশে উড়ার এই রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ফরাসি রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং বিমানের প্রথম পথিকৃৎদের একজন ছিলেন।

পিলাত্রে দে রোজিয়ার জন্ম গ্রহণ করেন ১৭৫৪ সালে ফ্রান্সের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের শহর মেটজে। তার বাবার এক বন্ধুর পরামর্শে রোজিয়ারকে বেনেডিক্টাইনদের দ্বারা পরিচালিত একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। তবে রোজিয়ার স্কুলে অমনোযোগী ছিলেন। এরপর তাকে শল্যচিকিৎসার শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি করা হয়। তবে সেখানেও তিনি বেশি দিন শিক্ষাগ্রহণ করেননি।

জাঁ-ফ্রানকোইস পিলাত্রে দে রোজিয়ার। ছবি; অ্যামিউজিংপ্ল্যানেট 

শেষ পর্যন্ত, রোজিয়ার পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং প্রাকৃতিক ইতিহাস অধ্যয়ন করতে আগ্রহী হন। রোজিয়ার ১৮ বছর বয়সে প্যারিসে পাড়ি জমান। এরপর রিমসের একাডেমিতে পদার্থবিজ্ঞান এবং রসায়নে পড়ালেখা করেছিলেন। সেখানে পড়ালেখা করার সময়ই তার সঙ্গে রাজা ষোড়শ লুই এর ভাই কম্ট ডি প্রোভেনসের পরিচয় হয়।

রোজিয়ার রিমসে থেকে প্যারিসে ফিরে আসার আগে একটি একাডেমিতে পদার্থবিদ্যা এবং রসায়ন পড়াতেন। যেখানে তাকে মনসিয়েরের প্রাকৃতিক ইতিহাসের মন্ত্রিসভার দায়িত্বে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি ১৭৮১ সালে প্যারিস ফিরে আসেন। রোজিয়ার প্যারিসের ম্যারায়েস কোয়ার্টারে নিজস্ব একটি পরীক্ষাগার ও সংগ্রহশালা তৈরি করেছিলেন। সেখানে তিনি পদার্থবিদ্যায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন। তার পরীক্ষার অনেক কিছুই তিনি সম্ভ্রান্ত লোকদের সম্মুখে প্রদর্শন করতেন।

তার গবেষণার মাধ্যমেই মন্টগল্ফিয়ার ভাতৃদ্বয়ের (জোসেফ ও মিশেল মন্টগল্ফিয়ার) সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। যারা তৎকালীন-এয়ার বেলুনগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। সেখান থেকেই বেলুনের সাহায্যে আকাশে উড়ার চেষ্টায় লিপ্ত হন রোজিয়ার। ১৭৮৩ সালের জুন মাসে বেলুনের সঙ্গে সংযুক্ত একটি ঝুড়িতে ১০০ মিটার উচ্চতায় আরোহণের প্রস্তাব করেছিলেন তিনি। রাজা ষোড়শ লুই এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিলেন। তাবে রাজা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, প্রথম বেলুনে দু'জন নিন্দিত অপরাধী থাকবে। রোজিয়ার ইতিহাসের অংশ হতে যাওয়া এই ঘটনায় কোনো অপরাধীকে সংযুক্ত করতে চাননি। তিনি রাজার কাছে প্রস্তাব করেছিলেন প্রথম বেলুনে চড়ে আকাশ ভ্রমণকারী সমাজের উচ্চ মর্যাদার কোনো ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। শেষ পর্যন্ত মারকুইস ডিআরল্যান্ডস ও পিলাত্রে দে রোজিয়ারকে প্রথম বেলুনে চড়ে আকাশ ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

বেলুনটি নিয়ন্ত্রণের কিছু অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়। ডিআরল্যান্ডস ও পিলাত্রে দে রোজিয়ার ১৭৮৩ সালের ২১ নভেম্বর মন্টগল্ফিয়ার হট-এয়ার বেলুনে বোস ডি-তে চিটো দে লা মিউটির বাগান থেকে প্রথম বেলুনে চড়ে আকাশে উড়া শুরু করেন। তারা ২৫ মিনিট আকাশে উড়েছিলেন। প্রায় তিন হাজার ফুট উপরে উঠেছিল এটি। পরে প্যারিসের উপকণ্ঠে বাট-অক্স-কাইলসে এটি অবতরণ করে। এসময়ে তারা প্রায় ৯ কিলোমিটার পথ অনুভূমিকভাবে ভ্রমণ করেছিলেন। সফলভাবে বেলুনে চড়ে আকাশ ভ্রমণের পর রোজিয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এটা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের অবস্থান শনাক্তকরণ ও সেনাদের সংকেত দেয়ার জন্য বেশ কার্যকর ব্যবস্থা হবে।

১৭৮৪ সালের ১৯ জানুয়ারি রোজিয়ার আবারো বেলুনে আকাশ যাত্রা করেছিলেন। এবার আরো ছয় যাত্রী তার সঙ্গে ছিলেন। তাদের মধ্যে চার জন ফরাসি অভিজাত শ্রেণির ছিলেন। যারা এই ভ্রমণের জন্য অর্থ প্রদান করেছিলেন। দ্বিতীয় ফ্লাইটের জন্য ব্যবহৃত বেলুনটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বড় ছিল। বেলুনটির আয়তন ছিল প্রায় ২৩ হাজার ঘন মিটার, যা প্রথমবার ব্যবহৃত বেলুনের চেয়ে ১০ গুণ বড়। এটি কাগজ এবং ভেড়ার চামড়া দিয়ে তৈরি হয়েছিল। এর পাঁচ মাস পরে, ১৭৮৪ সালের ২৩ জুন রোজিয়ার আরো উন্নত বেলুনে আকাশ ভ্রমণ করেন। এবারের বেলুনটি ৯ হাজার ফুটেরও বেশি উপরে ওঠে। এটি ৪৫ মিনিট পর্যন্ত উড়েছিল। আর অবতরণের আগে ৫২ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছিল।

আকাশ পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ইতিহাসের প্রথম মৃত্যু বরণকারী ব্যক্তি জাঁ-ফ্রানকোইস পিলাত্রে দে রোজিয়ার। ছবি; অ্যামিউজিংপ্ল্যানেট

তিনটি সফল উড্ডয়নের পর রোজিয়ার ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে উপযুক্ত বেলুনও তৈরি করেছিলেন। ১৭৮৫ সালের ১৫ জুন তিনি এই যাত্রা শুরু করেন। এটিই রোজিয়ার শেষ যাত্রা ছিল। বেলুনটি এক হাজার ৭০০ ফুট উপরে ওঠার পর দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যু বরণ করেন তিনি। তবে তিনি এবারও ইতিহাস সৃষ্টি করেন। আকাশ পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ইতিহাসের প্রথম মৃত্যু বরণকারী ব্যক্তিও জাঁ-ফ্রানকোইস পিলাত্রে দে রোজিয়ার।

ডেইলি বাংলাদেশ/এইচএন/আরএম