‘বামের দুর্গ’: বিশ্বের বৃহত্তম মাটির তৈরি বিস্ময় স্থাপনা

ঢাকা, শনিবার   ৩১ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১৭ ১৪২৮,   ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

‘বামের দুর্গ’: বিশ্বের বৃহত্তম মাটির তৈরি বিস্ময় স্থাপনা

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২৩:০৪ ১৬ জুন ২০২১  

বিশ্বের বৃহত্তম মাটির তৈরি দুর্গ। ছবি; অ্যামিউজিংপ্ল্যানেট

বিশ্বের বৃহত্তম মাটির তৈরি দুর্গ। ছবি; অ্যামিউজিংপ্ল্যানেট

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে বিভিন্ন নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি করে। স্থাপত্যবিদ্যা রপ্ত করার পর রাজারা বিভিন্ন দুর্গ ও প্রাসাদ তৈরি করে নিজের সাম্রাজ্য সুরক্ষিত রাখতে চাইতেন। সাধারণত প্রাচীন স্থাপত্য বিদ্যায় পাথর ও অন্যান্য উপাদান দিয়ে তৈরি করা হতো দুর্গ। তবে মাটির তৈরি দুর্গের কথা জানলে হয়তো সবাই অবাকই হবেন। মাটির তৈরি স্থাপত্যের নজির নেহায়েতই কম নয়। বিশ্বের বৃহত্তম মাটির তৈরি দুর্গ নিয়েই এই লেখা।

বর্তমান ইরানের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত ‘বামের দুর্গ’ই পৃথিবীর বৃহত্তম মাটির তৈরি দুর্গ। বামের এ দুর্গ নির্মাণের নির্দিষ্ট কোনো সময়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৭৯-৩২৩ অব্দের মধ্যে আকামেনিড পার্সিয়ান আমলে এটি নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এটি কাদামাটি দিয়ে তৈরি বিশাল দুর্গ, যা বৃহত্তম অ্যাডোব ভবন হিসাবে বিবেচিত হয়।

বর্তমান ইরানের কারমান প্রদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর বাম। বামে অবস্থিত বলেই এটি বামের দুর্গ নামে পরিচিত। এখানে একটি বৃহৎ কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে দুর্গটি রয়েছে। তবে বর্তমানে পুরো কমপ্লেক্সটিকেই দুর্গ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

বামের এ স্থাপনাকে দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ছবি; অ্যামিউজিংপ্ল্যানেট

মূলত পার্থিয়ান এবং সাসানীয় সাম্রাজ্যের সময়ে আকামেনিডিয়ানরা নিজেদের সাম্রাজ্য প্রসারিত করেছিল। যারা ২২৪ থেকে ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নতুন দুর্গ, প্রাচীর ও বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করেছিল। আরবরা ৬৪৫ সালে এই অঞ্চল জয় করে। এরপর দশম শতাব্দী থেকে ইসলামের ইতিহাসের উৎসগুলোতে বামের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়। সে সময়ের বর্ণনায় বামের এ স্থাপনাকে দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানকার ব্যস্ত বাজারগুলো সম্পর্কেও ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাচীনকাল থেকে উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বামের মাটির তৈরি দুর্গ কেন্দ্রিক মানুষের বসবাস ছিল। ১৯০০ সালে বামের নতুন শহর নির্মাণ শুরু হয়। এরপর এখানকার বাসিন্দারা আস্তে আস্তে নতুন শহরে বসতি স্থাপন শুরু করে। তবে দুর্গটি ১৯৩২ সাল পর্যন্ত সামরিক গ্যারিসন হিসাবে থেকে যায়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত এর কার্যকর ব্যবহার ছিল না।

মাটির তৈরি এই দুর্গের আয়তনও বিশাল এলাকা জুড়ে। পুরো কমপ্লেক্সটি ১৮০,০০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে নির্মিত হয়েছিল। যার চারপাশে ছিল বিশাল দেয়াল। এ দেয়ালের উচ্চতা ৭ মিটার। এর দৈর্ঘ্য ১৮১৫ মিটার। দুর্গের প্রবেশদ্বারটিও চমকপ্রদ। কমপ্লেক্সটির অভ্যন্তরে প্রায় ৪০০টি বাড়িসহ অন্যান্য ভবন ছিল।

বামের দুর্গের এই কমপ্লেক্সের চারদিক সুরক্ষিত রাখারও ব্যবস্থা ছিল। এর চারপাশে নজরদারি করার জন্য ৬৭টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছিল। এরমধ্যে দুটি টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছিল দুর্গের মধ্যেই। কমপ্লেক্সটি প্রাচীন স্থাপত্য কৌশল অবলম্বন করে নির্মিত। যা কাদার স্তর, রোদে শুকানো মাটির ইট দ্বারা তৈরি। গম্বুজ ও অন্যান্য কাঠামোর জন্য এটি বিশাল বালির দুর্গের মতো দেখায়।

এই দুর্গটির কেবল একটি প্রবেশদ্বার। দীর্ঘ অবরোধের সময়েও এর বসতিদের টিকে থাকার সক্ষমতা ছিল। কারণ বামের মাটির কমপ্লেক্সের মধ্যেই দীর্ঘ সময় জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় উপকরণ ছিল। এখানে পানির কুয়া, ভূগর্ভস্থ সেচ নালা, বাগান ও গৃহপালিত পশু পালনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ছিল। এখনকার ভবনগুলোতে বায়ু টাওয়ার, বিভিন্ন মাপের কাঠামো ছিল যা বাতাস অভ্যন্তরের দিকে প্রবাহিত করতে সহায়তা করতো। এমনকি বিশেষ প্রক্রিয়ায় তারা শীতল ও ধূলিকণা বিহীন বায়ু প্রবাহ করতো এই দূর্গে।

ভূমিকম্পে এ দুর্গের প্রায় ৭০ ভাগ কাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। ছবি; অ্যামিউজিংপ্ল্যানেট

২০০৩ সালের ২৬ শে ডিসেম্বর একটি ভূমিকম্পে এ কমপ্লেক্সটির প্রায় ৭০ ভাগ কাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। রিখটার স্কেলে ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৬.৬ এবং ২০,০০০ এরও বেশি লোক মারা গিয়েছিল। ইরানের ইতিহাসে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এটি। তবে অবাক করা বিষয় হলো, ভূমিকম্পে এই দুর্গের প্রাচীন কাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি খুবই কম হয়েছিল। বিভিন্ন সময় সংস্কার করা অংশগুলো পুরানো কাঠামোর তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এর পরের বছর বামের দুর্গের পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল। ভূমিকম্প প্রতিরোধক নির্মাণ কৌশল ব্যবহার করে জাপান, ইতালি এবং ফ্রান্সের মতো বেশ কয়েকটি দেশের সহযোগিতায় এ দুর্গের সংস্কার করা হয়। সে কারণেই, বর্তমানে মাটির তৈরি এ দুর্গটির কাঠামো অনেকটা আধুনিক দেখায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এইচএন