১৪ জুন ১৯৭১: পাল্টানো হয় ঢাকা শহরের ২১০ রাস্তার নাম

ঢাকা, রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৪ ১৪২৮,   ১০ সফর ১৪৪৩

১৪ জুন ১৯৭১: পাল্টানো হয় ঢাকা শহরের ২১০ রাস্তার নাম

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:০৫ ১৪ জুন ২০২১   আপডেট: ১২:৪৯ ১৪ জুন ২০২১

বাঙালি শরণার্থী স্রোতের মতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যাচ্ছে। ফাইল ছবি

বাঙালি শরণার্থী স্রোতের মতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যাচ্ছে। ফাইল ছবি

এদিন নিউজউইকের ’অনিশ্চিত আশ্রয়’ শিরোনামের রিপোর্টে বলা হয়, লাখে লাখে, বাঙালি শরণার্থী স্রোতের মতো পূর্ব পাকিস্তান থেকে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যাচ্ছে। তাদের অঞ্চলকে স্বাধীন ঘোষণা করার চেষ্টার ফলশ্রুতিতে শুরু হওয়া পাশবিক দমননীতি থেকে পালিয়ে, ব্যাধি এবং অপরিচ্ছন্নতার মাঝে তারা এক অনিশ্চিত আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। 

গতসপ্তাহে, নিউজউইকের টনি ক্লিফটন কয়েকটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে প্রতিবেদনে বলেন, ইতোমধ্যেই, ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের আকাশ ভারি এবং ধূসর হয়ে উঠেছে, আসন্ন বর্ষাকালের পূর্বাভাস দিচ্ছে, যা কি-না যে কোনো সময়ে ফেটে পড়তে পারে। এ বছরের বর্ষা অবধারিতভাবেই অতিরিক্ত প্রলয় ঘটাবে, প্রায় ৪০ লাখ পাকিস্তানীর আতঙ্ক বহু গুণে বাড়িয়ে দেবে। ভারতীয় সরকারী কর্মচারীরা অত্যাশ্চর্যভাবে শরণার্থীদের জন্য খাদ্য এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করে আসছে, কিন্তু তাদের সব প্রচেষ্টা ধুয়ে মুছে যাবে যদি এমনকি বর্ষার ‘স্বাভাবিক’ বৃষ্টিও হয়। আর যদি ভারি বর্ষণ হয়, তাহলে আসন্ন বন্যা এমন এক বিপর্যয় ঘটাতে পারে যার তুলনা করা যেতে পারে সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে যেটি মাত্র গত বছরই পূর্ব পাকিস্তানে ৫ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। অসংখ্য শরণার্থী যাদের অনেকেই বিভিন্ন রোগে শোকে আক্রান্ত! যখন তারা পালিয়ে ভারতে চলে আসে, তখনও শরণার্থীরা নানাবিধ বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কলেরা। 

যখন প্রথম দলগুলো, সীমান্ত পার হয়ে আসে, চিকিৎসকরা তাদের কলেরার প্রতিষেধক দেন, কিন্তু এখন বাঙালিরা এমন সংখ্যায় ঝাঁকে ঝাঁকে ভারতে আসছে যে তাদের সবাইকে প্রতিষেধক দেয়া সম্ভব নয়। ইতোমধ্যেই কলেরার প্রকোপ মহামারি আকার ধারণ করতে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে, প্রায় ২০০০ শরণার্থী মারা গেছে এবং সমানসংখ্যক মৃতপ্রায় হয়ে হাসপাতালে বা রাস্তার পাশে পড়ে আছে।

পাক সেনাদের একটি দল কুমিল্লা থেকে নয়াবাজার হয়ে চৌদ্দগ্রামের দিকে অগ্রসর হলে মুক্তিযোদ্ধারা নয়াবাজারের কাছে তাদের এ্যামবুশ করে। এ অভিযানে পাক সেনাদের ৩০ জন সৈন্য হতাহত হয় এবং তাদের অগ্রগতি ব্যাহত হয় ও তারা পিছু হটে। মুক্তিবাহিনীর ১৬ জন যোদ্ধার একটি দল কুমিল্লার বুড়িচং থানার ওপর আক্রমণ চালায়। এই সংঘর্ষে পাকসেনাদের ৮ জন নিহত হয়। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের একজন আহত ও একজন নিখোঁজ হয়। এতে বুড়িচং থানা শত্রুমুক্ত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাকা, কুমিল্লা যাবার গোপন পথ নিরাপদ হয়।

গোপালগঞ্জে মুক্তিবাহিনীর চলবল ঘাঁটির ওপর পাক হানাদারবাহিনী মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও টেকেরহাট এই তিনদিক দিয়ে আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে পাকসেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পের নিকটবর্তী রামশীল গ্রামে ঢুকে পড়ে এবং এর ভিতর দিয়ে গৌরনদী থানার বাসাইল গ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। পথে বান্দাবাড়ি খালের কাছে হেমায়েত বাহিনীর সাথে পাকসেনাদের তুমুল সংঘর্ষ হয়। দীর্ঘ যুদ্ধের পর হানাদারবাহিনী পিছু হটে। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা মকবুল শহীদ হনএবং হেমায়েত আহত হন। অপরদিকে পাকবাহিনীর ৫০-এর অধিক সৈন্য নিহত হয় এবং ১৮ জনসৈন্য মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে। এ যুদ্ধের পর হেমায়েতবাহিনী কোদালধোয়া গ্রামে তাঁদের ঘাঁটি স্থানান্তর করে।

এদিন সূর্যোদয়ের ২ ঘণ্টা আগে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ২৫ থেকে ৩০ জন সৈন্যের একটি দল চারটি ট্যাংকসহ আদিত্যপুর গ্রামে এসে পৌঁছায়। আধাঘণ্টার ভেতর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীরা স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পুরো গ্রাম ঘিরে রেখে লাউডস্পীকারে ঘোষণা দেয় যে শান্তি কমিটির স্থানীয় শাখা গঠন করতে এবং সংখ্যালঘু হিন্দুদের ড্যান্ডি (আইডেন্টিটি কার্ড) কার্ড বিতরণ করবে। বন্দুকের সামনে জোড় করে হিন্দুদের ঘর থেকে বের করে আদিত্যপুর সরকারি স্কুলের সামনে সমবেত করা হয়। ৬৫ জনকে বেঁধে শুটিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করানো হয়। স্থানীয় রাজাকার আব্দুল আহাদ চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা শেষে পাকিস্তানি দখলদারবাহিনীর ক্যাপ্টেন গুলির নির্দেশ দেয়। সৈন্যরা বন্দীদের উপর গুলি চালালে ৬৩ জন নিহত হন। মৃতের ভান করে দুজন বেঁচে যান। এরপর রাজাকাররা গ্রামে লুটপাট চালায় এবং পাকিস্তানি হানাদাররা গ্রামের নারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

স্থানীয় রাজাকার ও দালালেরা ঝালকাঠির বেশাইন খান গ্রামের আশেপাশের অঞ্চলে পাকবাহিনীর ত্রাস মানিকবাহিনীর (স্থানীয় ক্ষুদ্র মুক্তিযোদ্ধাদল) গোপন ক্যাম্পের সংবাদ পেয়ে পাকসেনাদের জানালে পাকসেনারা ভোরে মানিকবাহিনীর গোপন ঘাঁটিতে আভিযান চালায়। তারা মানিক, রতনসহ ২৪ জনকে আটক করে এবং ঘটনাস্থলে ১৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে। মানিক রতনসহ ৮ জনকে ঝালকাঠি থানায় নিয়ে এলে পাকবাহিনীর ক্যাপ্টেন আজমত তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

আবদুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে কয়েকশ’ মুক্তিযোদ্ধার একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ থানার ভদ্রঘাট গ্রামে। এদিন রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানী সৈন্যরা সেই গ্রাম ঘেরাও করে গুলিবর্ষণ করে এবং গ্রামটি জ্বালিয়ে দেয়। এখানে গুলি করে হত্যা করা হয় ১৯ জনকে। মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ থানার ভদ্রঘাট ও ধামকোল গণহত্যা নামে পরিচিত।

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খান করাচিতে বলেন, ‘বর্ষা মওসুমে সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশের ফলে উদ্ভুত যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকার সম্পূর্ণ তৈরি।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্ন সমাধানের আগে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখতে হবে। প্রদেশের পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত এবং দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে। অনুপ্রবেশকারীরা সীমান্তে কিছু পুল উড়িয়ে দিয়েছে এবং ধ্বংসাত্মক কাজ করছে।’ তিনি শান্তি কমিটির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এটা মোটেও রাজনৈতিক সংগঠন নয়। শান্তি কমিটির সাচ্চা পাকিস্তানিরা দুস্কৃতকারীদের হাত থেকে দেশ বাঁচানোর জন্যে আমাকে পূর্ণ সহযোগিতা করছে।’

ঢাকা পৌর কর্তৃপক্ষ শহরের ২১০ টি হিন্দু নামে নামাঙ্কিত রাস্তার নাম পাল্টে মুসলিম নাম দেয়। লালমোহন পোদ্দার রোডের নাম হয় আবদুর করিম গজনবী রোড, হরিচরণ রোডের নাম হয় মোহাম্মদ বিন কাশেম রোড। এভাবে শাঁখারী বাজার হয়ে যায় গুলবদন, কিষাণ ব্যানার্জী হয় আলীবর্দী, নবীন চাঁদ হয় বখতিয়ার খিলজী আর কালীচরণ রোড হয় গাজী সালাউদ্দিন রোড, ইত্যাদি।

জাতীয় পরিষদের সাবেক নেতা খান আবদুস সবুর ঢাকায় বলেন, বাংলাদেশ নামের প্রতিশ্রুত সশস্ত্র প্রলোভনে সীমান্ত পার হয়ে যাওয়া খাঁটি পাকিস্তানিরা এখন নরক যন্ত্রনা ভোগ করছে। প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এস বি জামান পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য জনগণকে সশস্ত্র বাহিনীর সাথে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে