এক পর্বতারোহীর মরতে মরতে বেঁচে যাওয়ার গল্প, গড়লেন ইতিহাস

ঢাকা, রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৪ ১৪২৮,   ১০ সফর ১৪৪৩

এক পর্বতারোহীর মরতে মরতে বেঁচে যাওয়ার গল্প, গড়লেন ইতিহাস

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৪৩ ১৩ জুন ২০২১   আপডেট: ১৫:১১ ১৩ জুন ২০২১

অ্যারন রোলস্টনের মরতে মরতে বেঁচে যাওয়ার গল্প। ছবি সংগৃহীত

অ্যারন রোলস্টনের মরতে মরতে বেঁচে যাওয়ার গল্প। ছবি সংগৃহীত

পৃথিবীতে নিজের প্রাণের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই হতে পারে না। যখন জীবনের প্রশ্ন আসে, তখন একটি কুকুরও সিংহে পরিণত হতে পারে। তবে মৃত্যুর কারণ যখন কেউ নিজেই হয়, তখন পরিস্থিতি যেন আরো বেশি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আজ এমনই একজন ব্যক্তির কথা বলবো, যিনি নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিজেকে এতটা ব্যথা দিয়েছিল যা দেখলে আপনারা ভাবতে থাকবেন যে এতটা ব্যথার চাইতে হয় তো তার মৃত্যুটাই ভালো ছিল।

বলছি অ্যারন রোলস্টনের কথা। ২৭ অক্টোবর ১৯৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করে এই ব্যক্তি। তিনি পেশায় ছিল একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তবে এই ব্যক্তি সবসময় পর্বত আরোহন করতে চাইতেন। পর্বত আরোহনে তার এতটাই জোক ছিল যে সে পর্বত আরোহন করার জন্য তার চাকরি ছেড়ে দেয়। সেই হতে চেয়েছিল পর্বত আরোহন দুনিয়ার চ্যাম্পিয়ন।

অ্যারন রোলস্টনের পর্বত আরোহনের যাত্রা শুরু অ্যারনের ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল সে কলোরাডোর সেই পর্বত আরোহন করবে। যার উচ্চতা ছিল ১৪ হাজার ফুট। অ্যারন চেয়েছিল সে পৃথিবীর প্রথম কেউ হতে যে এটা করে দেখাবে। অ্যারনের পরে এই লিস্টে জায়গা পেয়েছিল আরো ৪৩ জন পর্বতারোহী। তবে অবশ্যই অ্যারনের স্বপ্ন পূরণ করতে তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। সে দীর্ঘ সময় ধরে তার অনুশীলন চালিয়ে যায়। অ্যারন হঠাৎ করেই যাত্রা শুরু করে। আর যাত্রাটি শুরু হয়  ব্লুজন ক্যানিয়ন  দিয়ে। ব্লুজন ক্যানিয়ন হলো স্লট ক্যানিয়ন। যেটা কিনা ক্যানিয়ন জন নেশনাল পার্কে অবস্থিত। 

প্রতিনিয়ত পানি প্রবাহের ফলে ক্যানিয়নের মাঝখান দিয়ে এই ধরনের পানিপথকে বলা হয় স্লট ক্যানিয়ন। এটার সবচাইতে ভয়াবহ দিক হলো, এটার গভীরতা এতটাই বেশি যে ক্যানিয়ন উপর থেকে এটা দেখাই যায় না। ২৬ এপ্রিল ২০০৩ সালে ক্যানিয়ন থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে তার সাইকেলটি রেখে হাঁটতে শুরু করে। কারণ এই পথ সাইকেল চালানোর জন্য উপযোগী ছিল না। কিছুক্ষণ পরে অ্যারন সেই ফাটলের মধ্যে প্রবেশ করে। সে যখন সেই ফাটলের নিচে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে থাকে তখন আচমকা একটি বড় পাথর পিছলিয়ে যায়। পাথরের সঙ্গে সঙ্গে অ্যারনো নিচের দিকে পড়তে শুরু করে।

২৬ এপ্রিল ২০০৩ সালে ক্যানিয়ন থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে তার সাইকেলটি রেখে হাঁটতে শুরু করে কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যারন বুঝতে পারে যে তার সঙ্গে কি করতে যাচ্ছে। সে দেখতে পায় তার হাত ৩৬০ কিলোগ্রাম ওজনের একটি বিশাল পাথরের টুকরার নিচে আটকে গেছে। পাথরটা আটকে ছিল ফাটলের দুই দিকের পাথরের দেয়ালের সঙ্গে। অ্যারন আরো বেশি সমস্যায় পড়ে যায় কারণ সে তার ভ্রমণ সম্পর্কে কাউকে জানায়নি। সে কাউকে না জানিয়ে একাই চলে আসে। সেই সময় তার পরিবারের কাছে এমন কোনো উপায় ছিল না, যা দিয়ে তারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করবে বা খোঁজ খবর নেবে। অ্যারন এমন একটি ফাটলের মধ্যে আটকা পড়ে যেটার গভীরতা এতটাই বেশি ছিলো যে, সৌভাগ্যবশত যদি কোনো হেলিকপ্টার চলে আসে তারপরও অ্যারনকে কোনো ভাবেই তারা দেখতে পাবে না।

অ্যারনোর হাত ৩৬০ কিলোগ্রাম ওজনের একটি বিশাল পাথরের টুকরার নিচে আটকে গেছেযে সময় অ্যারন সেই ফাটলের মধ্যে আটকা পড়ে সেই সময় তার পান করার জন্য মাত্র ৩৫০ মিলিমিটার পানি অবশিষ্ট ছিল। আর তার খাওয়ার জন্য ছিল শুধু মাত্র দুই পিচ কেক। এইভাবে সে তিন দিন আটকে থাকে। সেই তিন দিন উদ্ধারকারীদের আশায় ছিল। সে ভাবছিল হয়তো বা কেউ তাকে দেখতে পাবে এবং উদ্ধার করতে আসবে। আর এই তিন দিন সে তার সর্বস্ব দিয়ে এই পাথরের টুকরা সরানোর চেষ্টা করেছে। তবে প্রতিবারই সে ব্যর্থ হয়েছে। এরই মধ্যে তার সমস্ত পানি ফুরিয়ে গেছে। তাকে বাঁচার জন্য নিজের মূত্র পান করার প্রয়োজন দেখা দেয়। সে পানি শূন্যতায় ভুগতে শুরু করে।

আটকা পড়ার সময় তার পান করার জন্য মাত্র ৩৫০ মিলিমিটার পানি অবশিষ্ট ছিলতার হাতে ব্লাড সার্কুলেশন না হওয়ার কারণে তার হাতের ডি কম্পোজ হতে শুরু করে। পঞ্চম দিন পানির তৃষ্ণায় এবং পানি শূন্যতার ফলে আচমকা ঘুমিয়ে পড়ে। আর সে স্বপ্ন দেখে ভবিষ্যতে তার বাচ্চার সঙ্গে খেলছে। তবে তার একটা হাত কাটা ছিল। অ্যারন যখন জেগে ওঠে, তখন সে বুঝতে পারে তাকে সেই স্বপ্নই সত্যি করতে হবে। সে তার হাত কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তার হাত কেটে ফেলার মতো এমন কোনো জিনিস তার কাছে ছিল না। তার কাছে এমন একটি মাল্টি টুলস ছিল যেখানে মাত্র দুই ইঞ্চি ছুরি ছিল। তবে সেটা তার হাত কাটার জন্য কাজেই আসছিলো না। এই মাল্টি টুলটি সে ফ্রি পেয়েছিল একটি ফ্ল্যাশলাইটের সঙ্গে। আর এমন একটি ছোট ছুরি দিয়ে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের হাত কেটে ফেলা অসম্ভব ছিল।

ছোট ছুরি দিয়ে সে আস্তে আস্তে চামড়া কাটতে শুরু করেএজন্য অ্যারন প্রথমে ব্যথা লাঘবের জন্য তার হাত কনুইয়ের উপর দিয়ে শক্তভাবে বেঁধে নেয়। এরপর তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তার হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রেডিয়াস এবং আলনা হাড় ভেঙে ফেলে। তারপর তার কাছে থাকা সেই ছোট ছুরি দিয়ে সে আস্তে আস্তে চামড়া কাটতে শুরু করে। দুই ইঞ্চি সেই ছুরি দিয়ে অ্যারন তার হাতের চামড়া এবং সব মাংস কেটে ফেলে। শেষ মুহূর্তে তার কাটা হাতের সঙ্গে শুধুমাত্র শিরা এবং স্নায়ুর সংযোগ ছিল। আর এটা ছিঁড়ে ফেলা এতটাই বেদনাদায়ক ছিল যে, তার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। স্নায়ুকে এভাবে ছিঁড়ে ফেলা এতটাই বেদনাদায়ক যে আপনি তা কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবেন না।

নেদারল্যান্ডের ওই ফ্যামিলি তাকে খাবার এবং পানি দিয়ে সাহায্য করে এই স্নায়ুর জন্যই আমরা সব কিছু অনুভব করতে পারি। তো এবার ভাবুন শিরা এবং স্নায়ুকে যদি নিজ হাতে ছিঁড়ে ফেলা হয় তাহলে এটা কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে। যাই হোক অ্যারনের তার হাত কেটে পাথর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হতে প্রায় এক ঘণ্টার মতো সময় লেগেছিল। তার শরীরের প্রায় ২৫ শতাংশ রক্ত বাইরে বের হয়ে গিয়েছিল। তবে সে এতেই সন্তুষ্ট ছিল। কারণ সে একটা মরণ ফাঁদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে এখনো তাকে ২৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। সেই সঙ্গে এই গভীর খাদ থেকে উঠতে হবে। 

হেলিকপ্টারে করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়সে মরণপণ যুদ্ধ করে সেই খাদ থেকে বের হয়ে প্রায় ৯.৭ কিলোমিটার রাস্তা পার হয়ে আসে। আর সৌভাগ্যবশত সে তখন একটি পরিবারকে দেখতে পায়, যারা নেদারল্যান্ড থেকে এখানে ঘুরতে এসেছিল। সেই ফ্যামিলি তাকে খাবার এবং পানি দেয়। সেই সঙ্গে তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকেও জানায়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে যারা কিনা অনেকদিন ধরেই তাকে খুঁজছিল। কারণ ঘরে না ফেরার ফলে অ্যারনের পরিবার মিসিং রিপোর্ট করে। তারা কিছু সময়ের মধ্যেই একটি হেলিকপ্টার নিয়ে তার কাছে পৌঁছে যায়।  তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। 

অ্যারন পুরোপুরিভাবে সুস্থ হওয়ার পরেও সবকিছু ভুলে গিয়ে আবারও সে পর্বত আরোহন শুরু করে দেয়অ্যারন সুস্থ হওয়ার পরে সেই খাদে আটকে পড়া তার চিহ্ন হাতকে নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে সেই ছিন্ন হাতের অন্তিম সংস্কারও করা হয়। জানলে অবাক হবেন যে, অ্যারন পুরোপুরিভাবে সুস্থ হওয়ার পরেও সবকিছু ভুলে গিয়ে আবারও সে পর্বত আরোহন শুরু করে দেয়। সে তার অবশিষ্ট একটি মাত্র হাত দিয়ে তার পুরোনো সেই স্বপ্ন পূরণ করে। কলোরাডোর সেই পর্বতের চূড়ায় পৌঁছানোর জন্য অ্যারন রোলস্টন প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সেই পর্বতের চূড়ায় ওঠার খ্যাতি অর্জন করে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ