‘নীলকুঠি’র দেয়ালে কান পাতলে আজো শোনা যায় হাজারো নীল চাষির কান্না

ঢাকা, রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৪ ১৪২৮,   ১০ সফর ১৪৪৩

‘নীলকুঠি’র দেয়ালে কান পাতলে আজো শোনা যায় হাজারো নীল চাষির কান্না

সোহাগী আক্তার নদী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১৮ ১২ জুন ২০২১   আপডেট: ১৫:৪৬ ১৩ জুন ২০২১

ব্রিটিশদের অত্যাচারের সাক্ষী `নীলকুঠি`

ব্রিটিশদের অত্যাচারের সাক্ষী `নীলকুঠি`

নীল শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে বাংলার অসহায় কৃষকের মুখ, বাংলার কৃষকের উপর ইংরেজ বণিকদের অত্যাচার, নির্যাতন, কৃষকের আহাজারি, ক্ষুধার জ্বালা ইত্যাদি নির্মম চিত্র। ব্রিটিশদের নানাবিধ শোষন ও নির্যাতনের মধ্যে অন্যাতম হলো নীল চাষ। ভারত উপমহাদেশের মাটি নীল চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী হওয়ায় ব্রিটিশ নীলকরেরা নীলচাষে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করে। নদীয়া, যশোর, বগুড়া, রংপুর প্রভৃতি জেলায় নীলচাষ শুরু হয়।  

বাধ্য হয়েই বাংলার কৃষকদের নীলচাষ করতে হতো। আজও কালের স্বাক্ষী হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু নীলকুঠি। তেমনি শরীয়তপুরের সদর উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের পশ্চিম মাহমুদপুর গ্রাম ঘেষে মাদারীপুর সদর উপজেলার ছিলারচর ইউনিয়নের আউলিয়াপুর গ্রামে কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশদের নীল কারখানার ধ্বংসাবশেষ। ১৭৭৭ সালে হুগলী নদীর তীরবর্তী গোন্দালপাড়া ও তালডাঙ্গা গ্রামে তিনি সর্বপ্রথম নীলকুঠি স্থাপন করেন লুই বোনার্ড। এর এক বছর পর ক্যারল ব্লুম নামের একজন ইংরেজ কুষ্টিয়ায় একটি নীলকুঠি স্থাপন করেন। এই ধারাবাহিকতায় শরীয়তপুরে এসেও নীলকুঠি স্থাপন করেন ব্রিটিশরা। 

আউলিয়াপুর গ্রামে কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশদের নীল কারখানার ধ্বংসাবশেষনীলকুঠির ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৫৭ সালে পলাশীযুদ্ধের কিছুকাল পর তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুরের অংশ হিসেবে মাদারীপুরে নীল চাষ শুরু হয়। এ অঞ্চলটি নীল চাষের বিশেষ উপযোগী হওয়ায় ইংরেজদের নজরে আসে। এরপর নীল ব্যবসা করে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার বাসনা নিয়ে এ অঞ্চলে এসেছিলেন তারা। আজ থেকে প্রায় আড়াইশ বছর আগে, বৃহত্তর ফরিদপুরের বিভিন্ন হিন্দু জমিদারের সহায়তায় ইংরেজ নীলকর ডানলপ সাহেবের কুঠিয়াল বাহিনী মাদারীপুরের আউলিয়াপুরে প্রায় ১২ একর জমির উপরে নীলকুঠি স্থাপন করেন। 

এলাকার কৃষকরা সেই সময়ে ধান, পাট, গম, সরিষাসহ অন্যান্য কোনো ফসলই চাষ করতে পারত না। শুধুমাত্র নীল চাষে বাধ্য করা হতো তাদের। যে জমিতে একবার নীল চাষ করা হতো সেখানে অন্য কোনো ফসল চাষ করা সম্ভব হতো না। কৃষকদের আপত্তি সত্ত্বেও তাদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে নীল চাষে বাধ্য করা হতো। নীল চাষে অনাগ্রহীদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। এই নির্যাতনের কারণে এ অঞ্চলের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। 

 ‘নীলকুঠি’র নির্মম ইতিহাসতারই ধারাবাহিকতায় ১৮৪৫ সালে, ঐতিহাসিক ফরায়েজি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও শরীয়তপুর জেলা যার নামে নামকরণ করা হয়েছে হাজী শরীয়তুল্লাহ্ ও তার পুত্র পীর মহসিনউদ্দিন দুদু মিয়া নির্যাতিত কৃষকদের নিয়ে গড়ে তোলেন বিশাল এক লাঠিয়াল বাহিনী। পরবর্তীতে হাজী শরীয়তুল্লাহ্ মৃত্যুবরণ করার পর তার পুত্র দুদু মিয়ার নেতৃত্বে নীলকুঠি হতে ৩ কিলোমিটার দূরে “রনখোলা” নামক স্থানে নীলকর ডানলপ বাহিনীর সঙ্গে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে দুদু মিয়ার লাঠিয়াল বাহিনীর আক্রমণে পরাজিত হয়ে নীল কুঠির অধিকর্তা নীলকর ডানলপ তার দলবলসহ নীলকুঠি ছেড়ে পালিয়ে যান। সেই থেকে ব্রিটিশদের অত্যাচারের নিরব স্বাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে মাদারীপুর জেলার ছিলারচর ইউনিয়নের আউলিয়াপুর গ্রামে ব্রিটিশদের নীল কারখানার ধ্বংসাবশেষ। যা এখন 'নীলকুঠি' নামে পরিচিত। স্মৃতি হিসেবে আজও রয়ে গেছে ১২ কক্ষ বিশিষ্ট কুঠিরের ইটের দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ, মাঝামাঝি রয়েছে একটি চুল্লি ও পাশেই রয়েছে প্রায় ৪০ ফুট উঁচু চিমনি।

শরীয়তপুর প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি সাংবাদিক শেখ খলিলুর রহমান বলেন, প্রায় আড়াইশ বছর আগে ইংরেজ নীলকর ডানলপ সাহেবের কুঠিয়াল বাহিনী প্রায় ১২ একর জমির উপরে নীলকুঠি স্থাপন করেন। ইংরেজরা এখানে নীল আবাদ করত। এখানকার মাটি নীল চাষের জন্য খুব উপযোগী। শরীয়তপুরের মাহমুদপুর ও মাদারীপুরের ছিলারচর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামজুড়ে তখন নীল চাষ হতো। মাদারীপুরের আউলিয়াপুর গ্রামে নীলকুঠির ইটের দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ, একটি চুল্লি ও উঁচু চিমনি এখন রয়ে গেছে। 

নীলবিদ্রোহের মাধ্যমে বাঙালি মুক্ত হয় এই অভিশাপ থেকে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন শরীয়তপুর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান মাসুদ বলেন, ইংরেজরা এক সময় এখানে নীল চাষ করতো। আমরা অনেকেই নীল চাষ সম্পর্কে জানি না। আমাদের কৃষক জনতা যারা তখন ছিলেন, তাদেরকে ধান, পাট, গম, মরিচ ইত্যাদি চাষ করতে না দিয়ে তাদেরকে বেঁধে নির্যাতন করে নীল চাষে বাধ্য করা হতো। পরবর্তীতে হাজী শরীয়তুল্লাহ্ ও তার পুত্র পীর মহসিনউদ্দিন দুদু মিয়া নির্যাতিত কৃষকদের নিয়ে গড়ে তোলেন বিশাল এক লাঠিয়াল বাহিনী। যুদ্ধে সেই লাঠিয়াল বাহিনীর আক্রমণে পরাজিত হয়ে নীল কুঠির অধিকর্তা তার দলবলসহ নীলকুঠি ছেড়ে পালিয়ে যান। আজও সেই  নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ চুল্লি ও চিমনি রয়ে গেছে। এখনও সেটি দর্শনীয় একটি স্থান। দেশ ও বিদেশের অনেকেই দর্শনীয় স্থানটি পরিদর্শন করতে আসেন।

তিনি বলেন, অযত্ন-অবহেলায় ইটের দেয়াল, একটি চুল্লি ও চিমনিটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটি ইতিহাস ধরে রেখেছে। এর সংরক্ষণে সবার সহযোগিতা দরকার।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে/জেএইচ