শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চমক কংক্রিটের অদ্ভুত জাহাজ

ঢাকা, সোমবার   ০২ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৮ ১৪২৮,   ২২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চমক কংক্রিটের অদ্ভুত জাহাজ

মো. হাসানুজ্জামান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৬ ৪ মে ২০২১   আপডেট: ১৮:২৭ ৪ মে ২০২১

শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চমক কংক্রিটের অদ্ভুত জাহাজ- ছবি: অ্যামিউজিং প্লানেট

শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চমক কংক্রিটের অদ্ভুত জাহাজ- ছবি: অ্যামিউজিং প্লানেট

শতশত বছর ধরে সমুদ্র বা নদীতে বিচরণের বিশাল বহর হচ্ছে জাহাজ। নৌপথে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ভ্রমণের একমাত্র ভরসা বিশাল বহরটির ইতিহাস বড়ই অদ্ভুত। শতশত বছর আগে কাঠ দিয়ে তৈরি হতো এসব জাহাজ। কালের বিবর্তনে জাহাজ তৈরিতে যুক্ত হলো স্টিলের মতো শক্ত ধাতব। কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি জাহাজ তৈরিতে ঘটে যায় শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চমক। ১৮৪৮ সালেই প্রথমবার তৈরি হয় কংক্রিটের অদ্ভুত জাহাজ।

আজ ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য কংক্রিটের তৈরি অদ্ভুত জাহাজ তৈরির ইতিবৃত্ত তুলে ধরা হলো:-

জলরাশিতে প্রায়ই ছোটখাটো কংক্রিটের নৌকার দেখা মিললেও উনিশ শতকের শেষভাগে কংক্রিটের জাহাজের দাপট শুরু হয়- ছবি-অ্যামিউজিং প্লানেট

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই ১৮৪৮ সালে জোসেফ-লুই ল্যাম্বোট (১৮১৪-১৮৮৭) ছোট কংক্রিটের নৌকা তৈরিতে সফলতা অর্জন করেন। ল্যাম্বোট হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ফেরোসিমেন্টের (এক ধরনের রিইনফোর্সড কংক্রিট) উদ্ভাবক। তবে উনিশ শতকের শেষের দিকে ল্যাম্বোটকে ছাড়িয়ে আরো বড় চমক দেখান ইতালিয়ান একজন প্রকৌশলী, যিনি প্রথম কংক্রিট দিয়ে জাহাজ তৈরি করে বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলে দেন। এরপর ইউরোপের জলরাশিতে প্রায়ই ছোটখাটো কংক্রিটের নৌকার দেখা মিললেও উনিশ শতকের শেষভাগে কংক্রিটের জাহাজের দাপট শুরু হয়। সেই সময় থেকে ইউরোপের জলরাশিতে ফেরোসিমেন্ট বার্জ চলাচলের ঘটনা স্বাভাবিক দৃশ্য ছিল।

জাহাজ তৈরির জন্য কংক্রিট সবচেয়ে আদর্শ উপাদান ছিল না। কংক্রিটে দ্বারা জাহাজ তৈরির মূল সমস্যা হলো এটি স্টিলের জাহাজের মতো মজবুত হওয়ার জন্য খুব ঘন ও পুরু আবরণের প্রয়োজন। আর এ রকম অবকাঠামোর জন্য জাহাজ খুবই ভারী হতো। যার ফলে পরিচালনার জন্য জ্বালানিও লাগতো বেশি। যদিও অতিরিক্ত ওজনের কারণে ছোটখাটো ফাটল কিংবা ত্রুটির জন্যও স্বাভাবিকভাবেই ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতো বেশি। এজন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কংক্রিট জাহাজের নাবিকরা এটাকে ‘ভাসমান সমাধিস্থল’ হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। সার্বিক ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে তারা সেগুলো পরিচালনা করতেও দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কংক্রিট জাহাজের নাবিকরা সেসব জাহাজকে ‘ভাসমান সমাধিস্থল’ হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন-ছবি: অ্যামিউজিং প্লানেট

বিভিন্ন ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ফেরোসিমেন্ট জাহাজ তৈরি অব্যাহত থাকে। জাহাজগুলোর আকৃতিও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। এরমধ্যে ১৯১৯ সালে কংক্রিটের সবচেয়ে বড় জাহাজটি দেখতে পায় বিশ্ব। যার নাম দেয়া হয় ‘এসএস সেলমা, যার দৈর্ঘ্য ছিল ৪২৫ ফুট। বর্তমানে জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ আংশিক নিমজ্জিত রয়েছে টেক্সাস উপসাগরীয় উপকূলের গ্যালভাস্টন বে’তে, যা হিউস্টন শিপ চ্যানেল এবং সিউল্ফ পার্ক উভয় স্থান থেকেই দৃশ্যমান। উল্লেখ্য, ‘এসএস সেলমা’ একটি তেল ট্যাংকার ছিল।

টেক্সাস উপসাগরীয় উপকূলের গ্যালভাস্টন বে’তে ‘এসএস সেলমা’ জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ আংশিক নিমজ্জিত রয়েছে - ছবি: অ্যামিউজিং প্লানেট

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন নৌবাহিনীর সহায়তায় ২৪টি কংক্রিট জাহাজ নির্মাণের অনুমোদন দেন। তবে এগুলোর নির্মাণ সম্পন্ন করে যথাসময়ে নৌবাহিনীকে দিতে ব্যর্থ হয় নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১২টি জাহাজ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছিল। পরে নির্মিত জাহাজগুলোর শেষ আশ্রয় হয় বেসরকারি কোম্পানির কাছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্টিলের ঘাটতি দেখা দেয়ায় আরো ২৪টি কংক্রিট জাহাজ নির্মাণের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। এবার অবশ্য সবগুলো জাহাজ সময়মতো সম্পন্ন হয়েছিল। সিমেন্ট ও ধাতব উপকরণগুলোর মিশ্রণের পদ্ধতি উদ্ভাবনের কারণে পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি মজবুত ছিল এসব জাহাজ। এ সময় যুদ্ধ উপকরণ সরবরাহ ও পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল কংক্রিট জাহাজগুলো। এগুলো যুদ্ধের সময় বিশেষত ডি-ডে নরম্যান্ডি অবতরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সেখানে কংক্রিট জাহাজগুলো জ্বালানি, যুদ্ধযাত্রার পরিবহন এবং ভাসমান প্লাটুন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। জাহাজগুলোর কয়েকটিতে ইঞ্জিন লাগানো হয়েছিল, যা ভাসমান ক্যান্টিন ও ট্রুপ ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার স্টিল পুনরায় সহজলভ্য হয়ে আসে। কংক্রিটের জাহাজ নির্মাণও বন্ধ হয়ে যায়। নির্মিত জাহাজগুলো অবশেষে হয়ে পড়ে পরিত্যক্ত। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার পাওয়েল নদীতে এগুলোর দশটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ভার্জিনিয়ার কিপটোপেক বিচ উপকূলবর্তী চেসাপেক বে’র অগভীর জলরাশিতে ডুবে আছে আরো নয়টি জাহাজ।

সূত্র-অ্যামিউজিং প্লানেট

ডেইলি বাংলাদেশ/এইচএন