শিকাগো শহরের রক্তাক্ত দিন

ঢাকা, শনিবার   ৩১ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১৭ ১৪২৮,   ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

মহান মে দিবসের ইতিহাস

শিকাগো শহরের রক্তাক্ত দিন

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৪৪ ১ মে ২০২১  

শিকাগো হয়ে ওঠে শ্রমিকদের প্রতিবাদ-বিদ্রোহের মূলমঞ্চ। ছবি: সংগৃহীত

শিকাগো হয়ে ওঠে শ্রমিকদের প্রতিবাদ-বিদ্রোহের মূলমঞ্চ। ছবি: সংগৃহীত

মে মাসের প্রথম দিনে উৎসব উদযাপনের ইতিহাস বহু পুরনো। সহস্র বছর আগে এ দিনে ব্রিটিশরা বেলট্যান উৎসব পালন করতো। এরপর ফুলের দেবীকে উৎসর্গ করে ‘ফ্লোরালিয়া’ পালনের জন্য দিনটি বেছে নেয় রোমানর। সবকিছু ছাপিয়ে একসময় দিনটি হয়ে ওঠে শ্রমিকদের; নাম দেয়া হয় ‘মে দিবস’।

যে জাতি যত কর্মঠ, সে জাতি তত উন্নত—এ প্রবাদ সবারই জানা। বিশ্ব টিকে আছে মানবজাতির শ্রমের ওপর। আজ তাদের দিন, পুরো বছর যাদের উদয়াস্ত পরিশ্রম করেই কাটে। একটি দিন সেই কাজ থেকে ছুটি মেলে। এর নেপথ্যে রয়েছে এক প্রাণঘাতী প্রতিবাদ। শিকাগো শহরের রক্তমাখা রাজপথ আজও স্মরণ করিয়ে দেয় দিনটির কথা।

বেতন চাইলে চাবুকের ঘা

ঘটনার শুরুটা ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে। শ্রমিকরা তখন ১২ ঘণ্টা করে কাজ করতেন, কিন্তু দিন শেষে ন্যূনতম মজুরিটাও হাতে পেতেন না। সেই টাকায় আয়েশি জীবন কাটাতো শিল্প মালিকরা। উল্টোদিকে শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করতো। বরং বেতন চাইলে চাবুকের ঘা আর অকথ্য গালাগাল জুটতো।

পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এ আন্দোলনের আলোড়ন তোলা আর্টিকেল। ফাইল ছবি

১৮৬০ সালে শ্রমিকরা তাদের মজুরি না কমিয়ে দিনে আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের জন্য দাবি জানান। এ জন্য তারা একটি সংগঠনও তৈরি করেন পরবর্তীকালে, যার নাম হয় ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার’। এই সংগঠন শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অবিরত আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে।

শিকাগো হয়ে ওঠে প্রতিবাদ-বিদ্রোহের মূলমঞ্চ

১৮৮৪ সালে সংগঠনটি দিনে কাজের সময় ‘আট ঘণ্টা’ নির্ধারণের জন্য মালিকপক্ষের কাছে সময় বেঁধে দেয়। সময় দেওয়া হয় ১৮৮৬ সালের ১ মে পর্যন্ত। বারবার মালিকপক্ষের কাছে দাবি জানানো হলেও একটুও সাড়া মেলে না তাদের কাছে। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এ বিষয়ে আলোড়ন তোলা আর্টিকেল। ব্যস, বিদ্রোহ ওঠে চরমে। আর শিকাগো হয়ে ওঠে প্রতিবাদ-বিদ্রোহের মূলমঞ্চ। 

পহেলা মে যতই এগিয়ে আসছিল, দুই পক্ষের সংঘর্ষ অবধারিত হয়ে উঠছিল। মালিক-বণিক শ্রেণি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। এরই মধ্যে পুলিশ আগে তাদের এপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল, আবারও চলল তেমনই প্রস্তুতি। শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে পুলিশদের বিশেষ অস্ত্র কিনে দেন ব্যবসায়ীরা।

শুধু শিকাগো নয়, এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে অনেক শহরেই। ছবি: সংগৃহীত

১৮৮৬ সালের ১ মে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন লাখ শ্রমিক কাজ ফেলে নেমে আসেন রাস্তায়। আন্দোলন চরমে ওঠে। ৩ মে সন্ধ্যায় শিকাগোর হে মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় জড়ো হওয়া শ্রমিকদের দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিছু পুলিশ সদস্য। এমন সময় হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণে কিছু পুলিশ আহত হন, পরে মারা যান ছয়জন। পরে পুলিশও শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ চালালে নিহত হন ১১ জন শ্রমিক। পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের হত্যামামলায় অভিযুক্ত করে ছয়জনকে প্রহসনমূলকভাবে দোষী সাব্যস্ত করে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয়।

ওই মিথ্যা বিচারের অপরাধ শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে। ২৬ জুন ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্নর জন পিটার অল্টগেল্ড -এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিথ্যে ছিল ওই বিচার। পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ‘দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ’-এর দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়। সেই থেকে পহেলা মে পালিত হয় শ্রমিকদের আত্মদান আর দাবি আদায়ের দিন হিসেবে।

তবে মে দিবস আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯০৪ সালে। সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল প্রতিনিধিদের ষষ্ঠ কংগ্রেসের আয়োজন করা হয় ওই বছরের ১৪ থেকে ১৮ আগস্ট। অ্যামস্টারড্যামে অনুষ্ঠিত এই কংগ্রেসটি দ্য ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কংগ্রেস হিসেবে পরিচিতি পায়। এতে অংশগ্রহণ করে ইউরোপের সব দেশের সব সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। স্বীকৃতি পায় শ্রমিক দিবস।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে