শ্বাস নিতে পারাটাই এখন বিলাসিতা

ঢাকা, সোমবার   ১৪ জুন ২০২১,   আষাঢ় ১ ১৪২৮,   ০২ জ্বিলকদ ১৪৪২

শ্বাস নিতে পারাটাই এখন বিলাসিতা

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:০৫ ২৬ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১২:০৭ ২৬ এপ্রিল ২০২১

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

অলি-গলিতে চিৎকার, কান্না আর আর্তনাদে ভারী শহরের বাতাস। রাস্তায় শত শত অ্যাম্বুলেন্স যেন মহড়া দিচ্ছে প্রতিটি সে‌কেন্ডে! হাসপাতালের ঢোকার আগেই শুনতে পাবেন- "অক্সিজেন সিলিন্ডার" নামের এক সোনার হরিণের জন্য হাজা‌রো মানুষের হাহাকার! অক্সিজেনে শ্বাস নেয়াটাই যেন এখন বিলাসবহুল বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ভারতের দিল্লি যেন এক মৃত্যুপুরী। পুরো শহরটার চিত্র এমন। হাসপালে সিট নেই, কেউ-বা ভাগাভাগি করে শুয়ে আছেন, অক্সি‌জেন নেই, এক অ্যাম্বুলেন্সে পাঁচ-সাতজন রোগী বহন করা খুবই সাধ‌ারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছে। ডাক্তার-নার্সরা কাকে রেখে কাকে দেখবেন। তারা আবেগ-অনুভূতি একপাশে রেখে রোবটের ম‌তো কাজ করে যাচ্ছেন দিন-রাত!

যন্ত্রণায় কাতর এক স্কুল শিক্ষিকার ৪৬ বছর বয়সী স্বামী দিল্লির অক্সিজেন নেই এমন একটি হাসপাতালে করোনার সঙ্গে লড়াই করছেন। এমন একটি শহরে তার দিন শুরু হচ্ছে, যেখানে অনেকের জন্যই শ্বাস নেয়া বিলাসবহুল ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।

ওই নারী জানালেন যে তার স্বামীর অক্সিজেনের স্যাচুরেশন বিপজ্জনকভাবে কমতে কমতে দাঁড়িয়েছে ৫৮। এর কিছুক্ষণ পর সেটা বেড়ে হল ৬২। এই স্যাচুরেশন ৯২ এর নিচে নেমে গেলেই সাধারণত ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করার কথা বলা হয়।

ওই শিক্ষিকা বললেন, স্যাচুরেশন বেড়ে যাওয়ায় তিনি খুশি। তার স্বামীর এখনও জ্ঞান আছে এবং তিনি কথা বলছেন।

বেডের অভাবের কারণে এক বেডে দুজন রোগীকেও রাখা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

দিল্লির আরেক হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ ২৫ জন রোগী মারা গেছেন। হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে জরুরি কেয়ার সেন্টারে অক্সিজেনের প্রেশার কমে গিয়েছিল এবং অনেক রোগীকে ম্যানুয়ালি অক্সিজেন দিতে হয়েছে।

এক‌টি পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি ছবি ছাপা হয়েছে- দু'জন পুরুষ আর একজন নারীকে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে একটি সিলিন্ডার থেকে। লোকজনের অসতর্কতা আর সরকারের অবহেলার কারণে আজ এই তিন ব্যক্তি এরকম একটা অবস্থায় পড়ে গেছে যে তাদেরকে বেঁচে থাকার জন্য এখন অক্সিজেন ভাগ করে নিতে হচ্ছে।

পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের একজনের ৪০ বছর বয়সী এক ছেলে মাত্র কয়েকদিন আগে একই হাসপাতালের সামনে মারা গেছেন। তিনি একটি শয্যার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। তবে তিনি একটি স্ট্রেচার সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ভারতীয়রা এখন এসব পেলেই কৃতজ্ঞ হয়ে পড়ছে। তাদের কথা হলো প্রিয়জনকে বাঁচাতে হাসপাতালের বেড অথবা ওষুধ কিংবা অক্সিজেন দিতে না পারলেও, অন্তত মৃতদেহ রাখার জন্য চাকাওয়ালা একটি স্ট্রেচার তো দিতে পারেন!

দিন যত গড়াচ্ছে, দিল্লির পরিস্থিতির আসলে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। রোগীরা মারা যাচ্ছে কারণ সেখানে অক্সিজেন নেই। এখনও ওষুধের সঙ্কট। এমনকি এসব ওষুধ বিক্রি হচ্ছে কালো বাজারে। অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা করছেন এবং মজুদ করে রাখছেন যেন একটা যুদ্ধের মধ্যে আছে সবাই!

নিজেকে রক্ষা করার দায়িত্ব এখন রোগীদের ওপরেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অনেকের জন্য এটা হচ্ছে ধীর গতিতে ক্রমশ মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হওয়া। কোভিড-১৯ এরকমই এক ভয়ানক রোগ।

"যদি আমি মারা যেতে থাকি, আমার মৃত্যু হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি কিন্তু বেঁচে আছি," নিউরোসার্জন পল কালানিথি তার 'হোয়েন ব্রেথ বিকামস এয়ার' গ্রন্থে একথাটি লিখেছেন।

আজকের ভারতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মুমূর্ষু এই রোগীদের জন্য যেন খুব সামান্যই মুক্তি অপেক্ষা করছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে