জাপানের যেই অঞ্চলে সাদা ‘ডাইনি-দৈত্যের’ সমারোহ!

ঢাকা, সোমবার   ১৪ জুন ২০২১,   আষাঢ় ১ ১৪২৮,   ০২ জ্বিলকদ ১৪৪২

জাপানের যেই অঞ্চলে সাদা ‘ডাইনি-দৈত্যের’ সমারোহ!

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৩২ ২৫ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ২০:৪২ ২৫ এপ্রিল ২০২১

সাদা ‘ডাইনি-দৈত্যের’ সমারোহ- ছবি: সিএনএন

সাদা ‘ডাইনি-দৈত্যের’ সমারোহ- ছবি: সিএনএন

ক্যাবল (তার) গাড়িটি যখন পর্বতের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে বেয়ে চলে তখন দেবদারু গাছগুলোর সবুজ আবরণ তুষারের সাদা চাদরের স্তুপাকারে রূপান্তর হয়ে পড়ে। তুষারের তুলতুলে গাদায় মুহূর্তেই সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত হয় সাদা চাদরে ঢাকা ইয়ামাগাটা অঞ্চলের সবুজ গাছগুলো। 

তুষারপাতের অঞ্চলজুড়ে রাইডাররা অবিশ্বাস্য চমৎকার প্রাকৃতিক ভূচিত্র তুলতে স্নোবোর্ড (তুষারের পর্বত থেকে পিছলে পড়ার বোর্ড) ও স্কি (তুষারের পর্বত থেকে পিছলে পড়ার দুটি যন্ত্র) আঁচড়ে চলাচল বদল করেন। এতে পর্যটকরা বেশ উৎফুল্লভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

যারা জাপানের জিহিয়ো বা জাও অনসেন অঞ্চলের তুষার দৈত্য এলাকায় প্রথমবার ঘুরতে যান এটি তাদের জন্য  উচ্ছ্বাস প্রকাশ সাধারণ একটি প্রতিক্রিয়া।  

ক্যাবল (তার) গাড়িটি যখন পর্বতের উপর দিয়ে ধীরে ধীরে বেয়ে চলছে- ছবি: সিএনএন

ওই এলাকায় যখন যাত্রীরা ট্রাম (কয়লার খনিতে ব্যবহৃত চার চাকার গাড়ি) থেকে বের হন তখন সেই প্রতিক্রিয়া আরো তীব্রতর হয়। তুষারের দৈত্য থেকে নামার সময় রহস্যময় কিছু খোঁজার চেষ্টা করেন তারা। কেউবা পায়ে হেঁটে, রাইডিং গিয়ার আটকে আবার কেউবা তুষারের দৈত্যগুলোতে ধীরে ধীরে বেয়ে চলতে থাকেন।

যেহেতু সাইবেরিয়ান নকল ফোয়ারার (জেট স্ট্রিম) আঘাতে জোয়া পর্বতজুড়ে ভয়ানক শীতের ঝড় বয়ে যায়, তাই গাছগুলো উপরের অংশের কিছু স্তুপে তুষার এবং বরফের ঘন, সরস স্তর জমতে শুরু করে। অবশেষে গাছগুলোতে বরফে জমাট বেঁধে অসাধারণ আকৃতিতে পরিণত হয়, যা একটি ছোট গ্রামকে জনপ্রিয় শীতকালীন ছুটির গন্তব্যে পরিণত করে। 

একটি তুষার সম্পর্কিত রোরস্যাচ পরীক্ষায় দেখা গেছে, জাও অঞ্চলের তুষার দৈত্যগুলোর অন্বেষণের সবচেয়ে মজার অংশ হচ্ছে- এটি মেঘে ঘুরে দেখার মতো, যা পুরনো ‘তুমি কি দেখ?’ খেলার মতোই।

তুষারে ঢাকা গাছগুলো অবজ্ঞাপূর্ণভাবে দাঁড়িয়েছে- ছবি: সিএনএন

সেখানে দেখা যায়, তুষারে ঢাকা গাছগুলো অবজ্ঞাপূর্ণভাবে দাঁড়িয়েছে এবং নীল আকাশের প্রান্তরের মাঝে একটি হিমশীতল বনবিড়ালের মাঝারি গর্জন থেকে একটি সাদা ডাইনির লম্বা হাড়ের আঙুল নির্দেশের দৃশ্য বহন করছে। গাছগুলো অদ্ভুতভাবে সুন্দর, যা টিম বার্টন চলচ্চিত্রের চরিত্রের জন্য উপযুক্ত। 

বিদেশিদের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে তুষার দৈত্যগুলো

যদিও তুষার দৈত্যগুলোর এলাকা এশিয়া মহাদেশ ভিত্তিক পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় তবুও পশ্চিমা স্কি পছন্দকারী লোকেরা ঐতিহ্যগতভাবে সেখানে অল্প পরিমাণে যান।

জাপানসহ সারাবিশ্বে অনলাইনভিত্তিক স্কিং পরিচালনা এবং স্কি ও স্নোবোর্ডিং ভ্রমণে জড়িত পাউডারহাউন্ডস ডটকমের (Powderhounds.com) সহকারী পরিচালক লিনডেল কেটিং বলছেন, তুষার দৈত্যগুলোর পর্বতে পর্যটকদের ভ্রমণের পরিবর্তন ধীরে ধীরে হচ্ছে। 

কেটিংয়ের মতে, জাও অঞ্চল বিদেশিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

তিনি বলেন, সাত বছর আগে আমরা এখানে কোনো বিদেশিকে দেখিনি এবং এখানকার কোনো রেস্তোরাঁ বা আবাসিক হোটেলে ইংরেজিতে কথা বলেনি কেউ। যদিও এটি বিদেশিদের জন্য জাপানের অন্যান্য স্কি রিসোর্টের (যেমন নিসেকো, হাকুবা, নোজাওয়া ওনসেন, মায়োকো কোজেন) মতো উচ্চবিলাসী নয়। তবে এখন জাও অঞ্চলে বিদেশিদের আনাগোনা বেড়েছে। এখানে এখন অনেক ইংরেজি ভাষায় বাক্য বিনিময় হয়।

প্রকৃতপক্ষে জাও অনসেন তাদের জন্য প্রথম পছন্দের জায়গা নয়, যারা সতেজ তুষার ও আন্তর্জাতিক মানের স্কি চালানোর জায়গা খুঁজছেন। তবে এটি সবচেয়ে সহজে তুষার দানব উপভোগ করার অভিজ্ঞতা দেবে, যা জাপানের অন্যান্য অংশে প্রবেশে যথেষ্ট চেষ্টা চালানোর প্রয়োজন পড়ে। 

কেটিং বলছেন, যদি তুমি প্রথমবার দেবদারু গাছের তুষার স্তুপ না দেখ তবে তাদের অনেক আকর্ষণীয় লাগবে। 

সন্ধ্যায় আলোকিত সময় কাটানো যায়- ছবি: সিএনএন

তিনি আরো বলছেন, অন্যান্য অঞ্চল থেকে জাও অঞ্চল শীর্ষ মৌসুমে বেশি তুষার দৈত্য পাওয়া যায়, এটি নন-স্কাইয়ার্সরা সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারে। এতে তারা সন্ধ্যায় আলোকিত সময় কাটাতে পারবে এবং তুষার দৈত্যগুলোর মাঝ দিয়ে স্কি চালাতে পারবে।

তুষার দৈত্যের স্তরের ভূমি

তুষার দৈত্যের কাছে যেতে ভ্রমণকারীদের দুটি সংযোগ বেছে নিতে হয়। দঁড়ির ওপর ভিত্তি করে বদ্ধ ক্যাবল গাড়ি, যা মূল জাও স্কি রিসোর্ট থেকে চলতে শুরু করে।

জাও স্নো রিসোর্ট লিফট প্যাকেজে স্কিয়ার্স ও স্নোবর্ডারসদের জন্য ক্যাবল গাড়ি প্রবেশ প্রযোজ্য। যারা পায়ে ঘুরতে চায় তাদের জন্য আলাদা রাউন্ড ট্রিপ টিকিট রয়েছে।

পায়ে হাঁটা দর্শনার্থীরা পর্যবেক্ষণ ক্ষেত্রের বাইরে দড়িবিহীন অংশে যেতে পারেন এবং তুষার দৈত্যগুলোর আশপাশে মুক্তভাবে ঘুরতেও পারেন।

তুষার দৈত্যগুলোর আশপাশে মুক্তভাবে ঘুরতেও পারেন- ছবি: সিএনএন

যারা পাহাড়ের মাথার উপর দিয়ে স্কি করার পরিকল্পনা করছেন তাদের একটি পৃথক ট্রেল ছেড়ে দিতে হয়, যা জাও স্কি রিসোর্টের অন্যান্য রানগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। সেখানকার পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ওয়াশরুম এবং ক্যাফেটেরিয়া পদ্ধতিতে রেস্তোরাঁও রয়েছে।

স্কিয়ার্স ও স্নোবোর্ডারসদের জন্য পরামর্শ

ওই অঞ্চলের বিভিন্ন তুষার দৈত্যের শিখরগুলোতে মধ্যম সুবিধা সম্পন্ন জাও স্কাই রিসোর্ট ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যা প্রারম্ভিক ও মধ্যম স্কি আরোহীদের জন্য উপযুক্ত।

রিসোরটগুলোর রিভিউ সম্পর্কে পাউডারহাউন্ডস বলছে, রিসোর্টগুলোতে ৪২ লিফট রয়েছে। এর মধ্যে তিনি দঁড়ির পথ, একটি ক্যাবল গাড়ি ও ৩৭টি চেয়ার লিফট বিদ্যমান। যদিও নকশা নির্দিষ্টিভাবে উপযুক্ত নয় এবং স্কেটিংয়ের জন্য আরো স্থান প্রয়োজন হবে। 

যাইহোক, যারা ঘোরার জন্য একটি আকর্ষণীয় দৃশ্যের স্থানে খুঁজছেন জাও অঞ্চল তাদের জন্য একটি অসাধারণ গন্তব্য হতে পারে। 

মনে রাখা উচিত, তুষার দৈত্যগুলোর থেকে বহমান মেঠোপথ নবাগত পর্যটকদের জন্য নয়। যারা সেখানে নিজেদের মধ্যে স্কিং করতে চায়, তারা নিজেদের সক্ষমতা প্রথমে পরীক্ষা করা উচিত।

যারা নিজেদের মধ্যে স্কিং করতে চায়, তারা নিজেদের সক্ষমতা প্রথমে পরীক্ষা করা উচিত- ছবি: সিএনএন

কেটিং বলছেন, তুষার দৈত্যগুলোর সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হচ্ছে যে, অনেক স্কি পর্যটক তুষারের মেঠোপথ অনুসরণ করতে চান (এটি মধ্যম মাত্রার মেঠোপথের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। প্রথমেই এ ক্ষেত্রে নিজের সম্পর্কে আপনার দক্ষতা থাকতে হবে। 

অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সেখানকার দেবদারু গাছগুলোর তুষার দৈত্য আবহাওয়াকে উপযুক্ত করে থাকে। সুতরাং সম্ভব হলে পূর্বাভাস জেনেই আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনা করুন। 

তুষার দৈত্যগুলোর বহমান মেঠোপথ ছাড়া কিছু ঢাল রাতের স্কিংয়ের জন্য খোলা হয়। সেখানে দিক-নির্দেশনা সহজবোধ্য। তবে এজন্য একজন ইংরেজ ভাষী নির্দেশক রাখতে পরামর্শ দেয়া হয়। 

স্কি রিসোর্ট এবং বিভিন্ন ধরনের জাও অনসেন দোকান ও বড় বড় হোটেলে ভাড়ায় নিরাপত্তা বর্ম পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে স্নোবোর্ডস, স্কিস, জ্যাকেটস এবং প্যান্ট। কিছু দোকান আপনাকে হেলমেট ও বড় চশমা দেবে, যদিও হেলমেট ঢালের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। সেখানে গিয়ার বা বর্মের গুণগত মান ও মূল্যে ভিন্নতা রয়েছে। 

জাও অনসেন গ্রাম

জাও অনসেন গ্রামটি ছোট কিন্তু সেখানে জাপানের একটি ক্লাসিক ছোট শহরের অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে। গ্রামটিতে বিশাল কবজ নিয়ে পর্বতের গ্রামে হাঁটার যোগ্য। 

শহরটিতে বসন্তকালে সালফারের গন্ধে ভরপুর হয়, যা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ভালো ও খারাপ অনুভূত হতে পারে। অনসেনের যেখানে বিভিন্ন ধরনের মানুষ রয়েছে সেখানে বসন্তকালে বাড়িগুলোতে অনেক সুবিধা বিদ্যমান থাকে।

জাও সিকি নো হোটেল রিসোর্টের বিভিন্ন ধরনের বসবাসের জায়গা আছে যেখানে অতিথিরা ঐতিহ্যবাহী জাপানি বা পশ্চিমা স্টাইলের কক্ষ পাবেন। 

কিছু জায়গায় কক্ষের ভাড়ার সঙ্গে সকালের নাস্তা ও রাতের খাবার সংযুক্ত রয়েছে। যদি আপনার ভাগ্য ভালো হয় তবে ইয়োনজায়া গোশত খেতে পারেন, যা সেখানকার কিছু এলাকায় উৎপন্ন হয়।

জাও গ্রামে বিভিন্ন গুণগত মানের রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেখানে সাধারণত জাপানিরা ভাড়া দেয় এবং সেখানে রয়েছে ইয়াকায়া স্টাইনের ক্লাসিক বার।  

আপনি জাপানি খাবার থেকে বিরতি যাচ্ছেন? সেখানে আকর্ষণীয় ক্রাফটবিয়ার এবং পিৎজা কোয়ান্টামের মজাদার পিৎজা রয়েছে। যেখানে আপনি বিয়ার ভোগ করে স্নোবোর্ডিং খেলতে পারেন। রাতেন বেলায় সেখানে নিজেই পার্টি করতে পারবেন। এটি পার্টির শহর নয় এবং সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে সড়কগুলো ভুতের গলির মতো হয়ে পড়ে। তবে শহরটি রাতের ঘোরাফেরার জন্য উপযুক্ত।

অনসেনের পানির বাষ্প থেকে বিশাল সাদা পোফগুলো ড্রেনের বাইরে এবং শহরের পর্বতের ঢালগুলোজুড়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি জাও অনসেন ড্রেনের বিশাল সাদা অংশটি নিজের ভূতড়ে আবহ খাপ খাইয়ে নেয়। 

জাও অনসেনে যাওয়ার উত্তম সময়

জাও অনসেন তিন রাত থাকার জন্য উপযুক্ত, যা আপনাকে কিছু সময় ঘোরা, গরম বসন্তে ভেজা এবং তুষার দৈত্যগুলো অন্বেষণের পর্যাপ্ত সময় দেবে। যদি সম্ভব হয় তবে এক সপ্তাহের জন্য যান। সপ্তাহের অবকাশ সেখানে অন্যরকম গল্প সৃষ্টি হয়। 

তুষার দৈত্যগুলো দেখার জন্য জানুয়ারির শেষ থেকে মার্চের শুরু সময় উত্তম (বসন্তের উষ্ণতা প্রবেশের আগে)- ছবি: সিএনএন

তুষার দৈত্যগুলো দেখার জন্য জানুয়ারির শেষ থেকে মার্চের শুরুর সময় উত্তম (বসন্তের উষ্ণতা প্রবেশের আগে)। ২৭ জানুয়ারি থেকে ৪ মার্চ তারের গাড়ি সকাল সাড়ে ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে। যারা রাতে তুষার দৈত্য দেখতে চান তারা সেই সময় যেতে পারেন।  

জাও অনসেনে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হচ্ছে ট্রেন এবং বাস। সারাদিনে টোকিও থেকে ইয়ামাগাটা স্টেশনে সরাসরি বুলেট ট্রেন যাতায়াত করে। এ যাত্রা পথ মাত্র আড়াই ঘণ্টার। ইয়ামাগাটা স্টেশনে থেকে ১৬ মিটার দূরে কয়েকটি রিসোর্ট রয়েছে যারা আপনাকে স্বাগত জানাতে পারে। 

অন্যথায় ১৬ কিলোমিটার দূরত্ব থেকে জাও অনসেনে যেতে প্রতি ঘণ্টায় বাস চলে এবং একটি মাত্র ৪০ মিনিট সময় নেয়। ইয়ামাগাটা স্টেশনে কিছু সংকেত রয়েছে যেখানে দিয়ে বাস থেকে বের হওয়া যায় এবং বাসে উঠাও যায়।

>>ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন<<

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ