রাজা-বাদশাদের পাংখা থেকে একালের হাতপাখা

ঢাকা, সোমবার   ১৪ জুন ২০২১,   আষাঢ় ১ ১৪২৮,   ০২ জ্বিলকদ ১৪৪২

রাজা-বাদশাদের পাংখা থেকে একালের হাতপাখা

আরমীন ইসলাম বিপা  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:২৯ ২৪ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১২:১৭ ২৪ এপ্রিল ২০২১

তালপাখা বাঙালির ঐতিহ্যের একটি বড় অংশজুড়ে আছে

তালপাখা বাঙালির ঐতিহ্যের একটি বড় অংশজুড়ে আছে

বাঙালি আর গরমে হাতপাখা- এ এক চিরন্তন চিত্র। অবিচ্ছেদ্য এদের সম্পর্ক। গরম এলো আর ঘরের কোনাকাঞ্চি থেকে হাতপাখাটি বের হলোনা, এ হয় নাকি! কবে থেকে এই প্রণয় শুরু তা সঠিক জানা না গেলেও এখনো যে সেই বন্ধন অটুট আছে তা গ্রীষ্ম এলেই বোঝা যায়। যদিও এখন হাতপাখার ব্যবহার একটু কম তবু একে ভুলে যাবার বা ভুলে থাকার উপায় নেই।

ইলেক্ট্রিক ফ্যানের যুগেও কখন যে গ্রীষ্মের তীব্র গরমে হাতপাখা হাতে এসে ঘুরতে থাকে তা মালুমও হয় না। কালের বিবর্তনে একসময়ের নিত্যপ্রয়োজনীয় অনুষঙ্গটিই হয়ে উঠেছে বাঙালির ঐতিহ্য। সরল সিধা থেকে রংবাহারি নানা ধরনের হাতপাখার গল্প নিয়ে এই আয়োজন।

প্রাচীনকাল থেকেই গরম থেকে রক্ষা পেতে এই জনপদের মানুষ হাতপাখা ব্যবহার করে আসছেবিষুব রেখার কাছাকাছি অবস্থিত বলে বাংলাদেশ গ্রীষ্ম প্রধান দেশ। বছরের প্রায় আট মাসই গরম,তার মধ্যে আবার ছয় মাস গরমের তীব্রতা থাকে অনেক বেশি। প্রাচীনকাল থেকেই গরম থেকে রক্ষা পেতে এই জনপদের মানুষ হাতপাখা ব্যবহার করে আসছে। তীব্র গরমে আমাদের পূর্বপুরুষদের শান্তির পরশ বুলিয়ে এখন আমাদেরও সেবা করে যাচ্ছে হাতপাখা। আধুনিক যুগে এসে আমরা ইলেক্ট্রিক ফ্যান ব্যবহার করতে পারছি অথবা এসি। তাতে হাতপাখার প্রয়োজন কমলেও আবেদন কমেনি একটুও। হাতপাখার বাতাসে কী যে এক শান্তি তা পাখা ব্যবহারকারী মাত্রই জানে। প্রকৃতি থেকে বাতাস কুড়িয়ে এনে তা প্রাকৃতিকভাবেই ছড়িয়ে দেয় নির্দিষ্ট স্থানে। লাগে না কোনো জ্বালানি, তৈরি হয় না কোনো কার্বন। আছে শুধু প্রকৃতি মায়ের সঙ্গে এক নিবিড় মিথস্ক্রিয়া। 

বৈচিত্র্যময় রঙিন বাঙালি জীবনের মতোই রকমারি এর হাতপাখা সম্ভার। উপাদানে, আকারে, আকৃতিতে, রংয়ে , বিন্যাসে একেকটি একেক রকম। কিছু হয় আটপৌরে, কিছু কিছু বেশ চিত্তাকর্ষক। তালপাখা, বাঁশের বেতির পাখা, হোগলার পাখা, মুর্তার পাখা, কাপড়ের পাখা - কত বিবিধ ধরণ এর উপাদানে! আবার একেক উপাদানের রয়েছে হরেক রকম ডিজাইনের পাখা। আকৃতিতে পাখা দুই ধরনের হয়, গোল আর চারকোনা। পাখা চালানোর কারিগরিও আবার দুই ধরনের- কিছু পাখায় শুধু ডাঁটি থাকে, আবার কিছু পাখাতে বাঁশের একটা টুকরার মধ্যে ডাঁটিটাকে ঢোকানো থাকে, বাঁশের টুকরাটুকু হাতের মধ্যে  নিয়ে একটু কায়দা করে নাড়ালেই পাখা আপনা আপনি ঘুরতে থাকে। কী দারুন ব্যাপার!! 

শীতকাল শেষ হতেই শুরু হয়ে যায় এই পাখা তৈরির কাজ প্রথমেই বলতে হয় তাল পাখার কথা। একসময় এমন একটি ঘর ছিল না যেখানে কমপক্ষে একটি তালপাখার আগমন ঘটেনি। জীর্ণ ঘরের বেড়ার বাঁধুনিতে কিংবা, সচ্ছল গেরস্ত বাড়ির খাটের সিথানে- সবখানেই এর দেখা মিলত। সহজলভ্য টেকসই উপাদান, স্বল্পমূল্য এবং দারুন কাজের বলেই তালপাখার এত কদর ও খ্যাতি। শীতের শেষে গাছ থেকে তালপাতা সংগ্রহের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তালপাখার জীবন যাত্রা। অভিজ্ঞ কারিগর জানেন কেমন পাতায় পাখা হয়। সেই অনুযায়ী পাতা কেটে পরে ধাপে ধাপে সেটিকে পাখায় রুপান্তরিত করা হয়। কিছু পাখায় আবার রংয়ের ফোঁটা দিয়ে নকশা করা হয়। কিছু থাকে একেবারে সাধারণ। বেখাপ্পা একটি তালপাতা পরিণত হয় খুব কাজের একটি সুন্দর তালপাখায়। এ যেন 'ছিল রুমাল, হয়ে গেল বিড়াল'!  

অতীতে রাজা-বাদশাহদের আমলে বিশেষ এক ধরনের পাখা ব্যবহার করা হততবে হ্যাঁ, অতীতে রাজা বাদশাহদের জন্য এক রকম পাখা ছিল যা তালপাতার মতোই বড়। সেগুলো 'পাংখা' নামে পরিচিত। আজকালকার সিলিং ফ্যানের পূর্বপুরুষ বলা যায়। নকশাদার কাপড়ের তৈরি একটা চাদরের মতো এই পাংখা ছাদের কাছাকাছি আড়াআড়ি ভাবে ঝুলানো থাকত একটা দন্ডের সাহায্যে। দণ্ডটির সঙ্গে একটি রশি বাঁধা থাকত কায়দামত যাতে রশির টানে পাংখাটি এদিক ওদিক করতে পারে এবং রশিটি চলে যেত পাশের রুমে। সেখানে সারাদিন সারারাত একজন কর্মচারী রশি টেনে পাংখা চালাত। এই পাংখা নিয়ে অনেক অমানবিক নিষ্ঠুর কাহিনী শোনা যায়। রশিটানা কর্মচারী যাতে রুমের ভেতরের কথা শুনতে না পায় সেজন্য নাকি তাদের শ্রবণশক্তি নষ্ট করে দেয়া হত ইচ্ছা করেই!  

ঘরের বাইরে এমন করেই পাখাওয়ালারা সারাদিন রাত পাখা টানতে থাকত

ধূসর অতীত থেকে রংবাহারি বর্তমানে আসা যাক। এবার যেই পাখার কথা বলবো সেটির রুপে গুণে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। তালপাখা যদি একটু রুক্ষ কর্কশ 'নায়ক'গোছের হয় তবে এ হলো পাখার জগতের চিত্তাকর্ষক 'নায়িকা'! বলছিলাম কাপড়ের তৈরি নকশাদার ও ঝালরওয়ালা রঙিন পাখার কথা। একে চিনতে বেগ পেতে হয় না। যখনই দেখবেন গোল সাদা কাপড়ে রঙিন সুতার ফুল লতাপাতা, পরিধি বরাবর লাল ঝালর ঝুলিয়ে কারো হাতে ঘুরে ঘুরে নেচে বেড়াচ্ছে, বুঝে নিবেন এই'ই আমাদের 'নায়িকা' পাখা। এটি একটু বিশেষ ধরনের পাখা। অন্য পাখাগুলো নির্দিষ্ট কারিগরেরা বানালেও এই পাখায় বাড়ির মেয়েমহলের গুণপনা প্রকাশ পায়। 

সাধারণ পাখার পাশাপাশি গ্রামের বউ ঝিরা তইর করত সুতার বুননে এমন নকশাদার পাখা সাধারণত বাড়ির বৌ ঝিয়েরাই তাদের শিল্পীস্বত্বার বিকাশ ঘটাতে নৈমিত্তিক ব্যবহারের জন্য অবসরে এমন নকশাদার পাখা বানাত। সাদা একটুকরা কাপড়ে রঙিন সুতার বাহারি ফুল, কলি সঙ্গে ডাল লতা পাতা ফুটে উঠত সুঁচের ফোঁড়ে ফোঁড়ে; যেন একটি ফুল বাগান। কিনার ঘেঁষে গোল করে আরেকটি নকশা যেন ফুলের বাগানের বাঁশের বেড়াটি। আসলে এভাবেইতো চারপাশের সুন্দর জিনিসগুলো অবচেতন মানবমনে আলোড়ন তুলে তাকে শিল্পী বানিয়ে তোলে, তাই না?  এরপরে বাঁশের একটি গোল চাকতি বানিয়ে সেটি কাপড়ের চারধারে জুড়ে দেয়া হয় সেলাই করে। কাপড়টি থাকে টানটান। বাহ! এইতো, মাঝের নকশাটি কী সুন্দর ফুটে উঠেছে এবার! এইবেলা আরো একটু সাজের পালা। লম্বা লাল কাপড় ঘন কুঁচি দিয়ে বসানো হয় চাকটির পরিধি বরাবর। পরিপূর্ণ হয়ে গেল 'নায়িকার' সাজসজ্জা। গোলাকৃতির একটি চমৎকার শিল্পে পরিণত হল এটি। এখন হবে তাকে কর্মক্ষম করে  গড়ে তোলা।

গ্রামবাংলার মেলাতেও বিক্রি হত এই হাতপাখা তালপাখার মত এই নকশিপাখা জন্মগতভাবেই ডাঁটির অধিকারী নয়। আলাদা করে বানিয়ে জুড়তে হয় গোল অংশের সঙ্গে। হাতখানেক লম্বা চিকন পোক্ত বাঁশের কঞ্চি বা পরিণত বাঁশের অংশবিশেষ ছেঁটে চিকন করে নিয়ে উপরের অর্ধাংশ দুই ভাগে ফেঁড়ে এর মাঝখানে গোল নকশাদার অংশটিকে খানিকটা ঢুকিয়ে শক্ত সেলাই করে দেয়া হয়। এর আগে অবশ্য একবিঘত এক কঞ্চির টুকরার মধ্যদিয়ে ডাঁটিটাকে গলিয়ে নেয়া হয়। এই চলৎসই কঞ্চিটুকরাটা গোল অংশের নীচে ডাঁটি ঘিরে থাকে যেটা পরবর্তীতে পাখাটিকে ঘুরাতে আসল ঘুঁটি হিসেবে কাজ করে। হয়ে গেল নায়িকাকথন। এবার আসি অন্য হাতপাখা কড়চায়।

পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও বাড়ির কাছের পাশাপাশি পাখা তৈরির কাজ করে বাড়তি উপার্জন করেহোগলার পাখা, মুর্তার পাখা বা বাঁশের বেতির পাখা - এগুলো উপাদানে ভিন্ন হলেও চেহারা সুরত একই। এদের বুনাতে হয় বলে সবাই এগুলো বানাতে পারেনা। দেখতে চৌকোনা এই পাখাগুলোও বহুল ব্যবহৃত হত একসময়। এখন আর উপাদানের সহজলভ্যতা নেই, কারিগরদের সংখ্যাও দিনকে দিন কমে এসেছে। তাই এরা আজকাল বেশ দুর্লভ। তবু গ্রামেগঞ্জের বাড়িতে এখনো চোখে পড়ে।

একটি দৃশ্য কল্পনা করুন- কাজ শেষে গোসল সেরে দুপুরবেলায় খেতে বসেছেন বাড়ির কর্তা। গিন্নি খাবার সাজিয়ে বেড়ে দিচ্ছেন। গিন্নির সঙ্গে গল্প করতে করতে কর্তা খেতে থাকলেন আর গিন্নির হাতে ঘুরতে থাকল হাতপাখা। 

তালপাখার পাশাপাশি হোগলার পাখা, মুর্তার পাখা বা বাঁশের বেতির পাখাও তৈরি হয় এবার আরেকটি দৃশ্য- কুটুম এসেছে বাড়িতে। ছোটদের লাগিয়ে দেয়া হল বাতাস করতে। কুটুমের সন্মান রক্ষার্থে তার স্বস্তির দিকে তো খেয়াল রাখতেই হবে। ছোটরাও বোঝে এগুলো, তারাও প্রাণপণে বাতাস করে যাচ্ছে মেহমানদারিতে যেন খুঁত না থেকে যায়।

এই যে আবহমান কালের বাংলার সুখী পারিবারিক ও সামাজিক জীবনছবি, হাতপাখা ছাড়া কী এটি পূর্ণতা পেত? যদিও কালের আবর্তে কমে এসেছে হাতপাখার ব্যবহার, তবু এর মায়াময় শীতল হাওয়া আমাদের জড়িয়ে আছে আষ্টেপৃষ্ঠে। এই সুন্দর ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে মাঝে মাঝে আমরা ব্যবহার করতেই পারি আলমারির পিছনে বা বাথরুমের ফলস সিলিংয়ের উপরে অবহেলায় পড়ে থাকা হাতপাখাটি। কী বলেন?

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে