বইয়ের সঙ্গে আলাপচারিতা 

ঢাকা, শনিবার   ১৯ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৫ ১৪২৮,   ০৭ জ্বিলকদ ১৪৪২

বইয়ের সঙ্গে আলাপচারিতা 

আরমীন ইসলাম বিপা  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৩৮ ২৩ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৫:৪৮ ২৩ এপ্রিল ২০২১

একটি নতুন বই যেন তার পাঠকের কাছে নতুন `স্বত্বা`

একটি নতুন বই যেন তার পাঠকের কাছে নতুন `স্বত্বা`

আমাকে সব থেকে বেশি খুশি করে একটি বই; ক্রীত বা উপহারপ্রাপ্ত, নতুন বা পুরোনো, গল্প বা উপন্যাস; আমার আয়ত্বের ভেতরের বা বাইরের - কিছুই বিবেচ্য নয়। একটি বই হাতে এলেই আমি খুশি। মনে হয় একটি 'স্বত্বা' আমার কাছে এল 'অজানা' কিছু কথা নিয়ে যা আমাকে উৎসাহিত করে তার সঙ্গে পরিচিত হতে। 

বই নামক সেই স্বত্বাটির আকার আকৃতি, গন্ধ, মলাট, ফ্লাপ, বাঁধাই, প্রিন্টার্স লাইন - সব কিছু আমি খুঁটে খুঁটে লক্ষ্য করি। জানি, বইটি পড়ার জন্য হয়তো এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়; তবু আমি দেখি। ভালো লাগে আমার। নতুন কোনো মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলে আমরা যেমন তার পোশাক দেখি, জুতা দেখি, চুলের স্টাইল, সাজসজ্জা, চেহারা সবই দেখি; আমিও তেমন করে দেখি। বইকে আমি মনুষ্য জ্ঞান করি এবং বইটি আমার কাছে একজন অপরিচিত মানুষ হিসেবে গণ্য হয়। 

আলাপন যদিও দ্বিপক্ষীয় বিষয় কিন্তু এখানে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে একপাক্ষিক, আমি কিন্তু অন্যভাবে দেখি বিষয়টা। আমি বইটাকে জানছি; বইটাওতো আমার মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করে ক্ষেত্র তৈরি করছে তাকে জানার জন্য। বরং এক্ষেত্রে বইটি কিছুটা এগিয়ে থাকে, আমি তো তাকে পরিবর্তিত করতে পারছিনা কিন্তু সে আমাকে হামেশাই প্রভাবিত করে আমার মনোজগৎ পরিবর্তিত করে দিচ্ছে। বইটি পড়ে আমি রেগে গেলেও সে কিন্তু একই থাকছে, খুশি হলেও ঠিক তাই। আমার কষ্ট বা বেদনাতেও তার কোনোই পরিবর্তন নেই। তার প্রভাবে আমি পরিবর্তিত হই আর সে ঠিক একই রকম থাকে, আগেও যেমন ছিল। বই নামক সেই দৃঢ়চেতা স্বত্বার সঙ্গে আমি পরিচিত হই এভাবেই, ক্রমে ক্রমে।

বইয়ের ভেতরে আছে অনেক কথা; নতুন কোনো ভাবনাচিন্তা, নতুন কোনো দর্শন। যা হয়ত আমাকে সমৃদ্ধ করবে আরো; বিস্তৃত হবে আমার নিজস্ব ভাবনার জগত। ক্রমশ আমি তার সাথে আলাপচারিতায় মগ্ন হই। প্রচ্ছদ দেখে এর বিষয়বস্ত নিয়ে ভাবি। রংরেখার বিন্যাসে নান্দনিকতা খোঁজার চেস্টার ব্যাপৃত হই। মনে ভাবনা আসে - প্রচ্ছদকারক নিশ্চয়ই আগে বইটি পড়ে নিয়েছেন বা নিদেনপক্ষে, বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধরনা পেয়েছেন। তারপর তিনি অনেক চিন্তাভাবনা করে কয়েকধরনের প্রচ্ছদ ঠিক করেছিলেন । সেখান থেকে যাচাই বাছাই ও পরিমার্জিত হয়ে অনুমোদনের পরে এই প্রচ্ছদটি এখন বইটির মুখচ্ছবি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। মনে মনে প্রচ্ছদটিকে সেই ভীষন প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে 'বিজয়ী' হতে পারার জন্য অভিনন্দিত করি ও পৃষ্ঠা উলটে যাই। প্রিন্টার্স লাইন পড়ি। প্রচ্ছদ কে করলেন, বইয়ের স্বত্ব কাকে দেয়া হয়েছে, কবে প্রকাশিত হয়েছে, কয়টি সংস্করণ বের হয়েছে, অক্ষরবিন্যাস কোথায় হল, কোথায় ছাপা হল এইসব। এভাবেই আমার সামনে বই নামক স্বত্বাটির সাকিন উন্মোচিত হয়। তারপর চলে যাই উৎসর্গপত্রে। এখানে কখনো শুধু ব্যক্তির উল্লেখ থাকে, কখনো আবার সঙ্গে কিছুটা বর্ননা। বইটি কেন তাকে উৎসর্গ করা হল, কী তার বিশেষত্ব, জানা হয়ে যায় এভাবে। উৎসর্গপত্রের মানুষকে আমি সর্বদাই বিশেষ চোখে দেখে থাকি কারন উনি বা উনারা এই বইয়ের জন্য বিশেষ কেউ। 

কখনো আবার 'ভূমিকা',  'লেখকের কথা',  'প্রকাশকের কথা',  'প্রসঙ্গ কথা' বা 'কিছু কথা' নামে ভিন্ন পাতা থাকে। সেখান থেকেও কত কিছু জানি বইটির ব্যাপারে। লেখক কোন তাগিদে বইটি লিখলেন, কার কার থেকে সাহায্য পেয়েছেন, পরিবারের কারা কারা কতখানি ছাড় দিয়ে অবদান রেখেছেন এই বইটি লিখতে, প্রকাশকের কী রকম তাড়া ছিল লেখার বিষয়ে - সব জানা হয়ে যায় আমার। সেই মানুষগুলোকে আমিও অনুভব করতে থাকি। কৃতজ্ঞ হই উনাদের প্রতি। উনারা বইয়ের মূল বিষয়বস্তু না হয়েও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন পুরো বইটা জুড়ে।

প্রারম্ভিক আলাপনটুকুর পর আমরা খানিক বিরতিতে যাই। প্রাথমিক পর্যায়ের আত্মিকরন সুসম্পন্ন না হলে পরবর্তী আলাপ গভীর না হবার একটা আশংকা থেকে যায়। একে অপরকে যথাযথভাবে বোঝাপড়ার জন্য তো একটু সময় নেয়া দরকার। তাই নয় কী?
যেহেতু আমি বইটিকে জানতে চাই নিগুঢ়ভাবে, তাই এই যতিচিহ্ন; মূলাংশে যাবার পূর্বে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে