বিশ্ব ঐতি‌হ্যে বাংলা‌দেশের তিন জায়গা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস আজ

বিশ্ব ঐতি‌হ্যে বাংলা‌দেশের তিন জায়গা

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৩৭ ১৮ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১১:৪৫ ১৮ এপ্রিল ২০২১

ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট (ষাট গম্বুজ মসজিদ) । ছবি: সংগৃহীত

ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট (ষাট গম্বুজ মসজিদ) । ছবি: সংগৃহীত

১৮ এপ্রিল, বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস আজ। ১৯৮২ সালে তিউনিশিয়ায় একটি আলোচনাসভার আয়োজন করে ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস’। সভায় ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস’ হিসাবে ১৮ এপ্রিল এ দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস হিসাবে ১৯৮৩ সালে দিনটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পায়।

এরপর ১৬ থেকে ২৫ জুন ২০১৪ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি। সেই কমিটির ৩৮তম বৈঠকে নতুন করে ২৬টি স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নতুন অন্তর্ভুক্ত ২৬টি স্থানের মধ্যে ২১টি সাংস্কৃতিক, ৪টি প্রাকৃতিক ও ১টি মিশ্র ঐতিহ্য। প্রথমবারের মতো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় মিয়ানমারের একটি ঐতিহ্য।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ইউনেস্কো ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রায় ৮৯০ টি অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে ঘোষণা করেছে। এগুলোর মধ্যে ৬৮৯টি সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, ১৭৬টি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও ২৫টি উভয় বৈশিষ্ট্যের। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি বিশ্বের দেশগুলোকে পাঁচটি ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করেছে। এগুলো হলো- 

১. আফ্রিকা ও আরব অঞ্চল (মধ্যপ্রাচ্য সহ)। 
২. এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল (অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়া এ অঞ্চলভুক্ত)।
৩. ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা। 
৪. ল্যাটিন আমেরিকা। 
৫. ক্যারিবিয় অঞ্চল।

২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ৩টি স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো হলো নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, বাগেরহাটের মসজিদ শহর ও সুন্দরবন। পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ও বাগেরহাট মসজিদ শহর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যভুক্ত হয়। অন্যদিকে সুন্দরবন বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যভুক্ত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন।

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি যে কয়টি মানদন্ডের ভিত্তিতে পাহাড়পুরকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। তা হলো-এটি হিমালয়ের দক্ষিণে প্রাক-মুসলিম যুগের অনন্য এক স্থাপত্য কীর্তি। প্রাচীন যুগের এ একক বৃহত্তম স্থাপত্য কমপ্লেক্সে মন্দিরের প্রস্তর ভাস্কর্য ও পাল যুগের পোড়ামাটির ফলকচিত্রের অলঙ্করণে ফুটে উঠেছে অসাধারণ নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গী।

ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক গুরুত্বের জন্য বাংলাদেশের তিনটি নিদর্শন বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্বমহিমায় জায়গা করে নিয়েছে। আসুন জেনে নেই সে সম্পর্কে- 

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার
পাহাড়পুরকে বিশ্বের অন্যতম বড় বৌদ্ধ বিহার বলা যেতে পারে। পাহাড়পুর নামে পরিচিতি পেলেও বিহারটির প্রকৃত নাম সোমপুর বিহার। আয়তনে এটির সঙ্গে ভারতের নালন্দা মহাবিহারের তুলনা হতে পারে। ৩০০ বছর ধরে বৌদ্ধদের বিখ্যাত ধর্মচর্চার কেন্দ্র ছিল এটি। শুধু উপমহাদেশই নয়, চীন, তিব্বত, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধরা এখানে ধর্মচর্চা ও ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে আসতেন। দশম শতকে বিহারের আচার্য ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী পুণ্ড্রনগর এবং অপর শহর কোটিবর্ষের মাঝামাঝি জায়গায় ছিল সোমপুর মহাবিহার। এটির ধ্বংসাবশেষটি এখন নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে। 

অনেকের ধারণা, ৭৭৭-৮১০ সালে পাল রাজা গোপালের পুত্র ধর্মপাল নিজের রাজত্বকালে এই বিহারটি তৈরি করেন। আবার কেউ কেউ এটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ধর্মপালের পুত্র দেবপালের (রাজত্বকাল ৮১০-৮৫০) কথাও বলে থাকে। দশম শতাব্দীর শেষভাগে পাল বংশীয় রাজা মহীপাল (৯৯৫-১০৪৩) আবার সোমপুর বিহার মেরামত করেন। তবে মহীপাল ও তার পুত্র নয়াপালের মৃত্যুর পর আবার পাল বংশের পতন শুরু হয়। একই সঙ্গে সোমপুর বিহারের ধ্বংসকালও শুরু হয়।

বৌদ্ধ বিহারটির ভূমি-পরিকল্পনা চতুষ্কোণাকার। উত্তর ও দক্ষিণ বাহুদ্বয় প্রতিটি ২৭৩.৭ মিটার এবং পূর্ব ও পশ্চিম বাহুদ্বয় ২৭৪.১৫ মিটার। এটির চারদিক চওড়া সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। সীমানাপ্রাচীর বরাবর অভ্যন্তর ভাগে সারিবদ্ধ ছিল ছোট ছোট কক্ষ। উত্তর দিকের বাহুতে ৪৫টি এবং অন্য তিন দিকের বাহুতে রয়েছে ৪৪টি করে কক্ষ। এই কক্ষগুলোর তিনটি মেঝে আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এই বিশাল কীর্তি আবিষ্কার করেন। ইউনেসকো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়  ১৯৮৫ সালে।

বাগেরহাট মসজিদ শহর (ষাট গম্বুজ মসজিদ)

ষাট গম্বুজ মসজিদ (বাগেরহাট)
ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট ১৯৮৫ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ইউনেস্কো এ শহরটিকে তালিকাভুক্ত করে ‘স্থাপত্য কর্মের একটি অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে’, যা মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বর্নণা করে। এদের মধ্যে ষাট গম্বুজ মসজিদ অন্যতম। এছাড়া খান জাহান সমাধি রয়েছে।

খান জাহান ছিলেন দিল্লির তুঘলক সুলতানদের অধীনে আমির। সম্ভবত তৈমুরের দিল্লি আক্রমণের (১৩৯৮ সাল) পরপরই বাংলায় আসেন তিনি। তার সমাধিতে খোদাই করে নাম হিসেবে লেখা আছে ‘উলুঘ খান-ই-আজম খান জাহান’। এ থেকে অনুমান করা হয়, তিনি তুর্কি (উলুঘ) দেশ থেকে এসেছিলেন এবং বাংলা সালতানাতের একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা (খান-ই-আজম) ছিলেন। বাংলার সুলতান শাসক নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহর রাজত্বকালে (১৪৩৫-৫৯ সাল) খুলনা অঞ্চলে (যশোর-খুলনা) আসেন খানজাহান। তার নেতৃত্বে দক্ষিণবঙ্গের একটি বৃহৎ অঞ্চলে মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রথমে দিল্লির সুলতানের এবং পরে বাংলার সুলতানের কাছ থেকে সুন্দরবন অঞ্চল জায়গির হিসেবে পান। সুন্দরবন এলাকায় গভীর বন কেটে সেখানে জনবসতি গড়ে তোলেন। খানজাহান ছিলেন একজন প্রখ্যাত নির্মাতা। তিনি বৃহত্তর যশোর ও খুলনা জেলায় কয়েকটি শহর প্রতিষ্ঠা, মসজিদ, মাদরাসা, সরাইখানা, মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ এবং বহুসংখ্যক দিঘি খনন করেন। তার দুর্গবেষ্টিত সুরক্ষিত রাজধানী শহর ‘খলিফাতাবাদ’ ছাড়াও তিনি মারুলি কসবা, পৈগ্রাম কসবা ও বারোবাজারে তিনটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তার প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল খলিফাতাবাদ, যা বর্তমান বাগেরহাট জেলা। এক জরিপে দেখা গেছে, খলিফাতাবাদকে কেন্দ্র করে ৫০টিরও বেশি স্থাপনা তিনি তৈরি করেছিলেন। কথিত আছে, খানজাহান ৩৬০টি মসজিদ ও বহু বড় দিঘিও খনন করেছিলেন। ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’ খানজাহানের সবচেয়ে বিখ্যাত কীর্তি। নামাজ আদায়ের পাশাপাশি মসজিদটি খানজাহানের দরবার হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

স্থাপত্যকৌশলে ও লাল পোড়ামাটির ওপর লতাপাতার অলংকরণে মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশিল্পে মসজিদটি এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মসজিদটিকে ‘ষাট গম্বুজ’ বলা হলেও আদতে এতে মোট গম্বুজ আছে ৮১টি। ১৫২৬ সালে দিল্লিতে মোগলদের শাসন শুরু হলে ধীরে ধীরে এখানকার গুরুত্ব কমতে থাকে। ১৬১০ সালে ঢাকা বাংলার রাজধানী হওয়ায় এই অঞ্চল এক প্রকার লোকচক্ষুর অন্তরালে যেতে থাকে। বনজঙ্গলে গ্রাস করে মসজিদটিকে।

১৮৯৫ সালে এলাকাটিতে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ১৯০৩-০৪ সালের দিকে ষাট গম্বুজ মসজিদের পুনরুদ্ধার দৃশ্যমান হয়। ১৯০৭-০৮ সালে ছাদের এবং ২৮টি গম্বুজ পুনরুদ্ধার করা হয়। ১৯৮২-৮৩ সালে ইউনেসকো বাগেরহাট এলাকার জন্য একটি বেশ বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৯৮৫ সালে এটিকে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য স্থানের (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

সুন্দরবন

সুন্দরবন
ইতিহাস বলে থাকে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায় সুন্দরবনের সৃষ্টি হয়। খানজাহানের সূত্র ধরে বলা যায় সেই সুলতানি আমলেও (১২০৬-১৫২৬) এখানে জনপদ তৈরির প্রচেষ্টা ছিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে জনপদও গড়ে উঠেছিল। সেই সময়ের অনেক নিদর্শন এখন আবিষ্কৃত হচ্ছে।

মোগল আমল (১৫২৬) থেকেই সুন্দরবনকে স্থানীয় রাজাদের কাছে পত্তন বা ইজারা দেয়া হতো। মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরের কাছ থেকে ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি সুন্দরবনের স্বত্ব লাভ করে এবং ১৭৬৪ সালে সার্ভেয়ার জেনারেল কর্তৃক জরিপপূর্বক মানচিত্র তৈরি করে। বেঙ্গল বন বিভাগ স্থাপনের পর বন আইন ১৮৬৫ অনুযায়ী ১৮৭৫-১৮৭৬ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৬৯-৭৩ সালে সুন্দরবনে প্রথম জরিপ করা হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় সুন্দরবনের ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে পড়ে, যা বাংলাদেশের সমগ্র বনভূমির ৪৪ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বের অন্যতম বড় ম্যানগ্রোভ বন হচ্ছে এই সুন্দরবন। ১৯৯৬ সালে সুন্দরবনে তিনটি অভয়ারণ্য এবং ২০১২ সালে তিনটি ডলফিন অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনের এক লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য এলাকাকে ৭৯৮তম বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে ইউনেসকো।

পৃথিবীর অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বনের উদ্ভিদের তুলনায় সুন্দরবনের উদ্ভিজ্জের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কেননা সুন্দরবনের বুক চিরে শুধু নোনা পানি নয়, ক্ষেত্রবিশেষে প্রবাহিত হয় স্বাদু পানির ধারা। এই বৈশিষ্ট্যই সুন্দরবনকে পৃথক করেছে বিশ্বব্যাপী অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বন থেকে। এই বনের বিশ্বখ্যাত প্রাণীটি হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ