১৭ এপ্রিল ১৯৭১: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান

ঢাকা, রোববার   ০৯ মে ২০২১,   বৈশাখ ২৬ ১৪২৮,   ২৬ রমজান ১৪৪২

১৭ এপ্রিল ১৯৭১: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৪৯ ১৭ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১১:০১ ১৭ এপ্রিল ২০২১

এইদিন ভবেরপাড়া গ্রামের মুজিব নগরে প্রায় দশ হাজার মানুষ উপস্থিত হয়

এইদিন ভবেরপাড়া গ্রামের মুজিব নগরে প্রায় দশ হাজার মানুষ উপস্থিত হয়

কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার ভবেরপাড়া গ্রামের ‘মুজিব নগর’-এ প্রায় দশ হাজার মানুষের বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে আওয়ামীলীগ চীফ হুইফ অধ্যাপক ইউসুফ আলীর স্বাধীনতা সনদ পাঠের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।

ঘোষণাপত্র পাঠ করার পর মঞ্চে ধীর পায়ে উঠে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ। একে একে সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী এবং এম মনসুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ মন্ত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করেন।

মুজিব নগরে স্বাধীনতা সনদ পাঠের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয়শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপস্থিত পুলিশ ও আনসার বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা এসডিপিও মাহবুবউদ্দীনের নেতৃত্বে সামরিক অভিবাদন জানান। এদিন প্রদত্ত ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাই। পরস্পরের ভাই হিসেবে বসবাস করতে চাই। মানবতা, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জয় চাই।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন বৈদ্যনাথ তলায় প্রদত্ত এক দীর্ঘ বক্তৃতায় বলেন,বাংলাদেশে আজ যে ব্যাপক গণহত্যা চলছে পাকিস্তান সরকার তার সত্যতা গোপন ও বিকৃত করার জন্যে ওঠে পড়ে লেগেছে। বাংলাদেশ আজ যুদ্ধে লিপ্ত। পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ। এ সংগ্রাম আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সংগ্রাম, জীবন-মৃত্যুও সংগ্রাম। এছাড়া আমাদের আর কোন উপায় ছিল না। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন গণপরিষদ সদস্য আবদুল মান্নান।

 শপথগ্রহণের এ অনুষ্ঠানে বৈদ্যনাথতলায় ৫০ জন দেশী-বিদেশী সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।এদিন শপথগ্রহণের এ অনুষ্ঠানে বৈদ্যনাথতলায় ৫০ জন দেশী-বিদেশী সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। রাঙামাটির মধ্যস্থল বুড়িঘাটে পাকবাহিনীর ২০ জন সৈন্য লঞ্চযোগে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ আক্রমণ করে। ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা আক্রমণ শুরু করলে পাকবাহিনীর অধিকাংশ সৈন্যসহ লঞ্চটি ধ্বংস হয়।

শাহবাজপুওে তিতাস ব্রিজ এলাকায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর পাকবাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ন আর্টিলারি গানবোট সহকারে আক্রমণ চালায়। সারারাত স্থায়ী যুদ্ধে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এতে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে মাধবপুরে গিয়ে ঘাঁটি রচনা করেন। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ৪ টি জঙ্গিবিমান ময়মনসিংহ শহর ও আশেপাশে অন্যান্য এলাকায় আক্রমণ চালায়। এ আক্রমনে কয়েকজন নিরীহ মানুষ নিহত হয়।

নওয়াবগঞ্জের গোদাবাড়িতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ও নওয়াবগঞ্জ শহরের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিমান হামলা চালায়।ময়মনসিংহের কালিহাতীতে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকসেনাদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়। গোয়ালন্দ ঘাট পার হয়ে পাকসেনারা রাজবাড়ি পৌঁছায় এবং ব্যাপক গুলি বর্ষণ করে। এতে আনসার কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা ফকির উদ্দিন শহীদ হন। তিনিই রাজবাড়ির প্রথম শহীদ।

শত্রুর হাত থেকে দেশ কে স্বাধীন করার জন্য দেশের সর্বত্র পাক সেনাদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীদের যুদ্ধ চলছেই যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে পাকসেনারা পুনরায় কুষ্টিয়া দখল করে নেয়। প্রাথমিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা স্টুয়ার্ড মুজিবের নেতৃত্বে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য ভারতের আগরতলার উদ্দেশে মাদারীপুর ত্যাগ করে। ফেনীর গঙ্গাসাগর যুদ্ধে পাকবাহিনীর সার্বিক আক্রমণের মুখে মুক্তিবাহিনী পশ্চাদপসরণ করে। বরিশালের ওপর পাকবিমান নির্বিচারে গোলাবর্ষণ করে। 

রংপুর ক্যান্টমেন্ট থেকে একদল সৈন্য বড়দরগা সানেরহাট রাস্তা ধরে গাইবান্ধা দখলের উদ্দেশে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অগ্রসর হয়। মাদারগঞ্জ ব্রিজের নিকট পৌঁছলে রাস্তা কেটে দিয়ে সুবেদার আফতাবের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যুহ থেকে তাদেও ওপর প্রচন্ড আক্রমণ করা হয়। এ যুদ্ধে ২ জন পাকসৈন্য নিহত ও ৫জন আহত হয়। একজন নিরীহ গ্রামবাসী পাকসৈন্যদের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হয়। পরে পাকবাহিনী পশ্চাদপসারন করার সময় শাখারী পট্টিসহ সমস্ত মাদারগঞ্জ বাজার জ্বালিয়ে দেয়। ৩ জন ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করে।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে