বৈশা‌খে পান্তা ইলিশের সংস্কৃ‌তির শুরু যেদিন থে‌কে

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

বৈশা‌খে পান্তা ইলিশের সংস্কৃ‌তির শুরু যেদিন থে‌কে

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৪ ১৪ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৬:১১ ১৪ এপ্রিল ২০২১

পান্তা ইলিশ পহেলা বৈশাখের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে

পান্তা ইলিশ পহেলা বৈশাখের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে

পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তা ইলিশ। বাজারে ইলিশের দাম যতই বেশি হোক না কেন এইদিন পাতে ইলিশ থাকা চাই-ই-চাই। তবে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি আর পান্তা ইলিশ কীভাবে পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেল। তা হয়তো অনেকবারই ভেবেছেন। এর পেছনে অনেক কারণই থাকতে পারে। 

প্রথমত ইলিশ মাছ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশ ইতিমধ্যে ভৌগলিক নিবন্ধনও পেয়েছে। বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের ৭০-৭৫ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। দিনে দিনে এই ইলিশ উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে। এজন্যই হতে পারে মাছে ভাতে বাঙালির ঐতিহ্য প্রকাশেই পান্তা ইলিশ রাখা হয় পাতে।

বাংলা নববর্ষে পান্তা ইলিশ খাওয়ার প্রচলন আগে একবারেই ছিল না। এর সঙ্গে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির কোনো সংযোগ নেই। বাংলা নববর্ষ সৌর পঞ্জিকা অনুসারে প্রবর্তিত হয়। এই এলাকায় পান্তা ভাত সব সময়ই কৃষকের কাছে পরিচিত খাবার। এর সঙ্গে বিভিন্ন শাকসবজি ও শুটকি ভর্তা ছিল খাবারের তালিকায়। কিছু এলাকায় কচু শাকের ডাঁটা মিশিয়ে চাঁদা মাছের শুটকির প্রচলন বেশি ছিল বলে জানা যায়।

আকবরের সময় থেকেই শুরু পহেলা বৈশাখ উদযাপন ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলা নববর্ষ উৎসবের দুটি দিক আছে। প্রথমটি আবহমান বাংলায় ধারাবাহিক ভাবে চলে আসা সামজিক রীতি। অন্যটি ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন। রমনা পার্ক ঘিরে শুরু হলেও বর্তমানে যার বিকশিত রূপ সারা বাংলাদেশ এবং বিশ্বে প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।

একসময় ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজন অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশে অনেক দোকান বসত। সেখানে পান্তা-ইলিশ খাওয়ানো হতো। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এসব দোকান দিত। নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ইলিশ খেতেই হবে- এমনটা কোথাও দেখা যায়নি। তবে গ্রামের মানুষ এ সময় কাঁচা মরিচ সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে অথবা শুকনো মরিচ পুড়িয়ে পান্তা ভাত খায়। সেখানে ইলিশ থাকে না। সেখান থেকেই হয়তো বাঙালি পান্তা খাওয়ার চল এনেছে এই দিনে। 

মানিক বন্দ্যোপাধায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস ইলিশ ধরা জেলেদের জীবন নিয়ে লেখা হয়েছে। উপন্যাসের চরিত্র কুবের ও অন্যান্য জেলেদের দুঃখ কষ্ট আনন্দ বেদনার বিষয়টি এসেছে সেখানে। ঋতুভিত্তিক সামাজিক অবস্থাও ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। কিন্তু পুরো উপন্যাসের কোথাও বৈশাখ মাসে নববর্ষ পালনের জন্য ইলিশের যোগান দেয়ার কথা লেখা হয় নি।

ইলিশ মাছ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ লোক গবেষক শামসুজ্জামান খান মনে করেন, ‘বৈশাখে খরার মাসে যখন কোনো ফসল হতো না তখন কৃষকদের হাতে পয়সাও থাকতো না। সুতরাং তাদের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভব হতো না। সুতরাং এটা  মোটেও সত্যি নয় যে, কৃষকরা নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ইলিশ খেয়ে বছর শুরু করতো। গ্রামবাংলায় নববর্ষের উৎসবই ছিল খুব ছোট আকারে। কৃষাণী আগের রাতে একটি নতুন ঘটে কাঁচা আমের ডাল ভিজিয়ে রাখতো, চাল ভিজিয়ে রাখতো। সকালে কৃষক সেই চাল পানি খেত এবং শরীরে কৃষাণী পানিটা ছিটিয়ে দিত। তারপর সে হালচাষ করতে যেত। দুপুরবেলায় পান্তা খেতে পারতো কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে। কখনো কখনো একটু শুটকি, একটু বেগুন ভর্তা ও একটু আলু ভর্তা দিয়ে  খেত।’

যতটুকু জানা যায়- আশির দশকে রমনাকে কেন্দ্র করে নববর্ষে কিছু খাবারের দোকান বসে। যারা ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখতে যেতেন তারা সেখানে খেয়ে নিতেন। এমনই একবার অল্প কয়েকজন মিলে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা বিক্রি করলেন এবং তা সব বিক্রি হয়ে গেল। কয়েকজন বেকার তরুণ এই কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদেরকে উৎসাহিত করতে এবং ‘নতুন একটা কিছু প্রবর্তন’ করার মানসিকতা নিয়ে একটি গ্রুপ এর প্রচারণা চালাতে লাগলেন। যাদের মধ্যে দুই একজন গণমাধ্যমকর্মীও ছিলেন।  বিষয়টা আর কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি। মুনাফালোভী গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে বৈশাখের অনেক কিছুই কর্পোরেটদের দখলে চলে যায়।

ছায়ানটের পাশেই প্রথম পান্তা ইলিশের দোকান বসেছিল কর্পোরেট সংস্কৃতি সব কিছুকেই পণ্য বানাতে চায়। সেজন্য তারা উপকরণ খোঁজে। পান্তা ইলিশ হয়ে যায় সেই উপকরণ। বৈশাখী খাবারের ব্র্যান্ডে পরিণত হয় পান্তা ইলিশ। মিডিয়ায় ইলিশের নানাপদের রেসিপি, বিজ্ঞাপন, নাটক, সামাজিক অনুষ্ঠানসহ সবখানে এমন ভাবেই বৈশাখের সঙ্গে ইলিশের সংযোগ ঘটানো হয় যে, মনে হয় পান্তা ইলিশ ছাড়া বৈশাখের কোনো মানে নেই। যার প্রভাব পড়ে আর্থ-সামজিক পরিমণ্ডলে। ইলিশের চাহিদা কেবল বাড়তেই থাকে। এক হালি ইলিশের দাম এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ইলিশ বলতে নির্বিচারে জাটকা নিধন শুরু হয়। দেশে সারা বছর যতো জাটকা ধরা হয় তার অন্তত শতকরা ৬৫ ভাগ মার্চ এপ্রিল মাসে নিধন হয়। তা কেবল এই বৈশাখকে কেন্দ্র করে। এ সময় মা ইলিশের ডিমসহ নিধন কেবল একটি মাছ নয়, লাখ লাখ ভবিষ্যতের ইলিশকেও ধ্বংস করা হয়।

সামাজিক এই অনাচারের প্রতি প্রথম নীরব প্রতিবাদ জানায় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। ২০১৩ সালে এই সংগঠনের সদস্যরা বৈশাখে ইলিশ বর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তারা ইলিশের বিকল্প হিসেবে বাজারে সুলভ তেলাপিয়া মাছকে বেছে নেন এবং পান্তার সঙ্গে তেলাপিয়া মিলিয়ে ‘পান্তপিয়া’ নাম দিয়ে সদস্যদের হাজার হাজার পরিবার নববর্ষকে বরণ করেন। প্রতি বছর তারা নববর্ষে ইলিশ বর্জন করে পান্তাপিয়া দিয়েই উৎসব পালন করছেন। যা অনেকের কাছেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

পরবর্তীতে সুধী সমাজ, মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হন। এ বিষয়ে কবি আসাদ চৌধুরী মন্তব্য করেন, ‘ইলিশ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। তবে বর্ষবরণে পান্তা-ইলিশ কোনোভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির অংশ নয়। এ সময়টা ইলিশ সংরক্ষণের সময়। বৈশাখ উপলক্ষে কিছু লোক পয়সার গরম দেখানোর জন্য চড়া দামে ইলিশ কিনছে, কিছু লোক সুযোগ নিয়ে ব্যবসা করছে; এরা আত্মসম্মানবোধহীন বাঙালি।’

বাঙালির সংস্কৃতির অংশ এখন পান্তা ইলিশ বৈশাখে ইলিশ না খাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে অনেক গণমাধ্যমও এগিয়ে এসেছে। তারা নিয়মিত প্রতিবেদন, টক শো, টিজার, মানববন্ধনসহ নানা উদ্যোগ নেয়। এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে নববর্ষ পালনে ইলিশ বর্জনের ঘোষণা দেন এবং ধারাবাহিক ভাবে তিনি এই সিদ্ধান্ত বজায় রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে সরকারি বৈশাখী আয়োজনগুলো থেকে ইলিশ বাদ পড়ে। নববর্ষের আগে চাঁদপুরসহ ইলিশের জেলাগুলোতে যে বিরূপ চাপ পড়তো তা অনেকটাই কমে আসে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণায়।

দেশের একটি বড় অংশ ইলিশ খাওয়া থেকে বিরত হওয়ায় ইলিশের উৎপাদন বেড়ে চলেছে। তার প্রমাণ পাওয়া যচ্ছে ইলিশ প্রধান এলাকাগুলোতে। সম্প্রতি আড়াই কেজি ওজনের একটি ইলিশ মাছ ধরা পড়েছে নাফ নদীতে। ‘ইলিশের উৎপাদন ৯ বছরে ৬৬ শতাংশ’ বেড়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা ইলিশ সুরক্ষা ও ডিম ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করায় এ সফলতা এসেছে। এ অর্জন ধরে রাখতে হবে।

তবে শুধু মা ইলিশ বা জাটকা নয়, ইলিশ বাঁচাতে এর ডিম সংরক্ষণও বিশেষ ভাবে প্রয়োজন। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, “চাঁদপুর থেকে ইলিশের পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে রপ্তানি করা হচ্ছে ইলিশের ডিম। প্রতিদিন অন্তত ৫০০ কেজি করে ইলিশের ডিম প্রক্রিয়াজাত করার পর ছোট ছোট বাক্সে করে পাঠানো হচ্ছে চট্টগ্রামে। সেখান থেকে এসব ইলিশের ডিম ভারত হয়ে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে।

এভাবে ইলিশের ডিম যদি বিদেশে চলে যেতে থাকে তবে ইলিশের উৎপাদন ব্যাহত হবে চরমভাবে। অবিলম্বে ডিম বিদেশে পাঠানো নিষেধ করা প্রয়োজন। সম্প্রতি মাওয়া ঘাটেসরেজমিনে গিয়ে দেখা গিয়েছে সেখানে ইলিশের ডিম জোরা দুইশ টাকা ভেজে বিক্রি করা হচ্ছে। মা ইলিশ ধরা এবং ডিম বিক্রি করা থেকে সবাইকে বিরত রাখতে হবে।

খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার সালে প্রাচীন ব্যাবিলনে নতুন বছর শুরু হতো নতুন চাঁদ দেখা সাপেক্ষে। পহেলা বৈশাখ বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাসের প্রথম দিন, তাই এটি বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামে নববর্ষ উৎসব আমেজে পালন করা হয়।

বাঙালির বর্ষবরণে থাকে নানান আয়োজন কৃষকদের মধ্যে ‌’ফসলি সন’ হিসেবে প্রচলিত আজকের বাংলা সন শুরু হতো অগ্রহায়ন মাস থেকে। পহেলা অগ্রহায়ন ছিল নববর্ষ। অগ্রাহয়নে কৃষকরা মাঠের ফসল গোলায় তুলে অভাব-অনটন ভুলে একই সঙ্গে নববর্ষ ও নবান্নের উৎসবে মেতে ওঠতো। কৃষকদের সেই ফসলি সনকে নতুন করে বিন্যস্ত করেন মোঘল সম্রাট আকবর।

ঐতিহাসিকদের মতে, আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা হলো একটি নতুন হিসাব বই। এটা বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাঠের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া।

তবে সেই সময়ের পহেলা বৈশাখের উদযাপনের কারণের সঙ্গে এখনকার এই উৎসবের কোনো মিল নেই। এটি এখন শুধুই বাঙালির আনন্দ আয়োজনের উপলক্ষ্য। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক কিছু। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে