১৪ এপ্রিল ১৯৭১: পুরোদেশ শত্রুর কবলে, বিধ্বস্ত এবং বিপর্যস্ত মানুষ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৬ মে ২০২১,   বৈশাখ ২৩ ১৪২৮,   ২৩ রমজান ১৪৪২

১৪ এপ্রিল ১৯৭১: পুরোদেশ শত্রুর কবলে, বিধ্বস্ত এবং বিপর্যস্ত মানুষ

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:১৫ ১৪ এপ্রিল ২০২১  

দেশের মানুষের তখন বিপর্যস্ত অবস্থা, সর্বক্ষণ মৃত্যুর ভয়

দেশের মানুষের তখন বিপর্যস্ত অবস্থা, সর্বক্ষণ মৃত্যুর ভয়

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রদত্ত এক ভাষণে বিশ্বের সকল সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল সফরের জন্যে আমন্ত্রণ জানান। তিনি বন্ধুরাষ্ট্রের সরকার-জনগণ এবং রেডক্রসসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের প্রতি সরাসরি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান।

এদিন নিউইয়র্ক টাইমসে Bengalis form a cabinet as the bloodshed goes on শিরোনামের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার মতো শহরে এখন সম্ভবত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোক রয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাদলের সামরিক আক্রমণে যারা বেঁচে গেছেন তারা প্রায় সবাই প্রতিরোধকারীদের দলে যোগ দিয়েছেন।

ঢাকায় মৌলভী ফরিদ আহমদের সভাপতিত্বে শান্তি কমিটির স্টিয়ারিং কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামকে ‘ব্রাহ্মণ্যবাদীদের চক্রান্ত’ আখ্যা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ধ্বংস করার শপথ ঘোষণা করা হয়। সারাদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশুগঞ্জেও পাকহানাদার বাহিনী বিমান আক্রমণ চালায়। আক্রমণে অগণিত সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু হয়। 

পাকসেনারা একের পর এক জেলা দখল করছে, সেই সঙ্গে চলছে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সংঘর্ষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি বিগ্রেড কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হয়। পাকবাহিনী উজানিসার ব্রিজের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের কাছাকাছি এলে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক আক্রমণ চালায়। এ যুদ্ধে পাকবাহিনীর একজন অফিসারসহ ১৭৩ জন সৈন্য নিহত হয়। 

সারাদিন মধুপুর গড়ে মুক্তিবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত পাকসৈন্যরা প্রাণ বাঁচাতে পিছু হটে কালিহাতি ও ঘাটাইল অঞ্চলে অবস্থান নেয়। প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্ট চৌগাছা থেকে হেড কোয়ার্টার তুলে নিয়ে বেনাপোলের ৩ মাইল পূর্বে কাগজপুকুর গ্রামে স্থাপন করে এবং যশোর বেনাপোল রাস্তার দুধারে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

দিনাজপুরের খানসামা এলাকায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর নীলফামারী থেকে আগত পাকবাহিনী আক্রমণ চালায়। পাকসেনাদের হঠাৎ আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্নভাবে পিছু হটে। পঞ্চগড় এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ পাকসেনারা আক্রমণ করে। পঞ্চগড় শহরে নাপাম বোমা ব্যবহার করে পঞ্চগড়কে ভস্মীভূত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধারা শহর ছেড়ে অমরখানায় অবস্থান নেয়।

সকালে পাকবাহিনী কুড়িগ্রামের খলিলগঞ্জ জেলখানার উত্তরে অবস্থান গ্রহণ করে। পাকসেনারা জেল অফিসে কর্মরত হেড ক্লার্ক ও সিপাইসহ পাঁচজনকে গুলি করে হত্যা করে। রাজশাহী শহরের লক্ষীপুর গার্লস স্কুলের সামনে পাকসৈন্যরা স্থানীয়দের মাঝ থেকে ৩০ জনকে গুলি করে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ধরে নিয়ে আসে। এদের মধ্য থেকে সৌভাগ্যক্রমে মঈনউদ্দিন আহমদ মানিক, আশরাফ হোসেন রতন ও মাসুদ রানা পালাতে সক্ষম হয় এবং মোশারফ হোসেন সন্টু লাশের নীচে চাপা পড়ে আহত অবস্থায় বেঁচে যান।

তুমুল সংঘর্ষের পর কুমিল্লার কসবার কিছু জায়গা মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে পাকবাহিনী সান্তাহার পৌঁছালে বিহারীরা হানাদারদের সঙ্গে মিলিত হয়ে আশেপাশের গ্রামগুলো ঘেরাও করে এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অগণিত মানুষকে হত্যা করে। এ হত্যাযজ্ঞ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘সান্তাহার গণহত্যা’ নামে পরিচিত। পাকবাহিনীর দুটি কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধাদের রাজারহাট ও কুলারহাট অবস্থানের উপর ব্যাপক আক্রমণ চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এলাকাতে ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেরের নেতৃত্বে একটি কোম্পানি, বুড়িঘাট ও রাঙ্গামাটির মধ্যস্থলে একটি কোম্পানি নিয়ে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান, রাঙ্গামাটি ও বরফকলের মধ্যস্থলে লে. মাহফুজ একটি কোম্পানি নিয়ে এবং কুতুবছড়ি এলাকাতে সুবেদার মুতালেব একটি কোম্পানি নিয়ে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নেয়। মুক্তিবাহিনী প্রচন্ড যুদ্ধের পর কুমিল্লার কসবা পাকিস্তান সেনাদের কাছ থেকে পুনর্দখল করে নেয়। অন্যদিকে মুক্তিবাহিনী ও পাকবাহিনীর মধ্যে পাকশী সেতুর কাছে তীব্র সংঘর্ষ হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে