জামালপুর গান্ধী আশ্রম: মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর ও ইতিহাসের বাতিঘর

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১,   জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪২

জামালপুর গান্ধী আশ্রম: মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘর ও ইতিহাসের বাতিঘর

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৫১ ১০ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১২:৩২ ১০ এপ্রিল ২০২১

জামালপুর গান্ধী আশ্রম

জামালপুর গান্ধী আশ্রম

ইতিহাস-ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে বাংলার প্রতিটি কোণায়। বিশেষ করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাসের অনেক বড় একটি জায়গা দখল করে আছে। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা। তবে এই স্বাধীনতার সংগ্রামের শুরু বহু আগে থেকেই। বাংলার এসব ইতিহাস বুকে করে আছে দেশের নানান জাদুঘর, প্রতিষ্ঠান এবং স্থান। তেমনই এক স্মৃতিবিজড়িত এবং কালের সাক্ষী জামালপুরের গান্ধী আশ্রম।

নামটি শুনেই মহাত্মা গান্ধীর কথা মনে পড়ে গেছে নিশ্চয় আপনারও? হ্যাঁ, ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতার অগ্রদূত সেই মহাত্মা গান্ধীর নামেই এবং তার উদ্যোগেই গড়ে তোলা হয় এই আশ্রম। স্বদেশী চেতনায় সারা ভারতবর্ষের মতো বাংলায়ও এ সময় গড়ে ওঠে অনেক গান্ধী আশ্রম।

গান্ধী আশ্রম মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম এক জাদুঘর
ব্রিটিশ শাসনামলে ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতার অগ্রদূত মহাত্মা গান্ধীর স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিল ভারতবর্ষের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। এ অঞ্চলের মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর পরাধীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে গান্ধীর আদর্শ অনুপ্রাণিত করেছিল বাংলা ব-দ্বীপের লাখো মানুষকে। আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বাংলার পরিশ্রমী মানুষদের জন্য। সেই লক্ষ্যে ভারতবর্ষের অনেক জায়গাতেই গান্ধীজীর আশ্রম গড়ে উঠেছিল। 

১৯৩৪ সালে জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার কাপাসহাটিয়া গ্রামে গান্ধী আশ্রম তৈরি হয়। পরে অবশ্য এটিকে মুক্তি সংগ্রাম জাদুঘরে উন্নিত করা হয়। প্রতিষ্ঠাতা নাসির সরকার ছিলেন জামালপুরের স্বদেশী নেতা। তিনি এবং তার জ্যেষ্ঠ কন্যা রাজিয়া খাতুন এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ঝিনাই নদীর তীরে তার নিজের গ্রাম কাপাসহাটিয়ায় আশ্রমটির অবস্থান।

এখানে এসেছেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সহ অনেক গুণীজন  গান্ধীভক্ত নাসির সরকার এ আশ্রমে গ্রামের মানুষকে স্বদেশী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতেন। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন বিভিন্নভাবে। চরকায় সুতা তৈরি, হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ, লেখাপড়া ও শরীরচর্চা কার্যক্রম চালাতেন এখানে। এই আশ্রম তখন পরিণত হয়েছিল ওই অঞ্চলের মুক্তিকামী মানুষের মিলনমেলায়। বিভিন্ন সময়ে এ আশ্রমে এসেছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ, বারীন দত্ত, খোকা রায়, অনিল মুখার্জি, প্রফেসর শান্তিময় রায়, কমরেড আশুতোষ দত্ত, আন্দামানফেরত কমরেড রবি নিয়োগী, নগেন মোদক, বিধূভূষণ সেন, সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ, মনোরঞ্জন ধর, নরেন নিয়োগী, রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কৃষক নেতা হাতেম আলী খান, আবদুস সাত্তার, হেমন্ত ভট্টাচার্য, মন্মথনাথ দে, খন্দকার আবদুল বাকীসহ অনেক বিশিষ্টজন। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক বৈঠকেও মিলিত হয়েছিলেন এখানে।

আশ্রম থেকে খাদি কাপড় বোনা, শিক্ষা কার্যক্রম, পাঠাগার, হস্ত-কারুশিল্প, শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যসেবাসহ স্বদেশের মঙ্গলে নানাবিধ কর্ম সম্পাদিত হতো। দেশ ভাগের পর পাকিস্তানি শাসক চক্র ১৯৪৮ সালে হামলা চালিয়ে আশ্রমের বহু স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে শুধু অফিস ঘরটি টিকে ছিল। কালের বিবর্তনে মেলান্দহের বাতিঘর গান্ধী আশ্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালে মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে জামালপুরের গান্ধী আশ্রমটি পুনরায় সচল হয়ে ওঠে। এই অঞ্চলের জনগণের উদ্যোগে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস উদযাপনের মাধ্যমে চালু হয় এই আশ্রম।

জাদুঘরে রয়েছে বাংলার স্মৃতিবিজড়িত নানান জিনিসপত্র ভারতবর্ষের ইতিহাসের ক্রমবিকাশ ও ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশ ও পাকিস্তান পর্বসহ ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে গান্ধী আশ্রমের কর্মীরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। জাদুঘরটি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছে ইতিহাসের আলো।  এক একর জমির ওপর স্থাপিত জামালপুরের এই গান্ধী আশ্রম হাজারো দর্শনার্থীর ইতিহাস চেতনাকে করছে সমৃদ্ধ। নতুন প্রজন্ম ও দর্শনার্থীর মনে ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশপ্রেম, সংগ্রামের সাহস ও প্রেরণা। গ্রামের মানুষকে স্বনির্ভর করতে বিনামূল্যে কম্পিউটার ও সেলাই প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এখানে।

ইতিহাসের সাক্ষী গান্ধী আশ্রম প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে আশ্রমের পরিচালক ব্রিটিশ বিরোধী নেত্রী রাজিয়া খাতুন কর্তৃক ব্যবহৃত চরকার ভগ্নাংশ, আশ্রম পরিচালিত হস্তশিল্প বাঁশের ডালা, গান্ধী আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা কৃষক নেতা নাসির উদ্দিন সরকারের ব্যবহৃত ছোট ও বড় টেবিল, চেয়ার, কাঠের আলমারী, কাঠের পুরনো সিন্দুক ইত্যাদি। বড় টেবিলটি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত প্রকাশ্যে ও গোপনে নানা ধরনের বৈঠকে ব্যবহৃত হয়েছিল। সবকিছু এখনো রয়েছে সাজানো গোছানো।  

গান্ধীজীর একটি ছবিও রয়েছে আশ্রমটিতে আশ্রমের ভেতর মেঝেতে রাখা আছে স্বদেশী আন্দোলনের সময়কার আশ্রমে ব্যবহৃত একটি চরকা। ৪টি কাঠের জানালা ও একটি দরজার সমন্বয়ে গঠিত আশ্রমের দেয়ালে মহাত্মা গান্ধীর নানা ধরনের কাজকর্মের ছবিসহ ঝুলানো রয়েছে নাসির সরকার, মেয়ে ব্রিটিশ বিরোধী নেত্রী রাজিয়া খাতুন ও পুত্র মোয়াজ্জেম হোসেনের ছবি। 

স্ব‌দেশী আন্দোল‌নের সময়কার ছাত্রীদের তৈরি নানা সূচিকর্ম ছাড়াও আশ্রমের পাঠাগারে রয়েছে দুর্লভ বইয়ের এক বিশাল সংগ্রহশালা। এছাড়াও রয়েছে মুক্তিসংগ্রামের নানা স্মৃতিচি‎হ্ন, ছবি, বিভিন্ন বধ্যভূমির মাটি। নিয়মিত প্রদর্শন করা হয় ইতিহাসের প্রামাণ্যচিত্র। চাইলে কোনো এক ছুটির দিন পরিবারের সঙ্গে ঘুরে আসতে পারেন আশ্রমটি। 

যেভাবে যাবেন

গান্ধী আশ্রমে যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে সরাসরি বাসযোগে জামালপুর সদর উপজেলায় আসতে হবে। এছাড়াও ঢাকা থেকে ট্রেনেও জামালপুর আসা যায়। জামালপুর সদর উপজেলার গেট পার থেকে অটোরিকশা দিয়ে যেতে হবে হাজীপুর বাজার অথবা সরাসরি জাদুঘরেও যেতে পারবেন। জামালপুর সদর উপজেলা থেকে কাপাসহাটিয়া যেতে খরচ পড়বে জনপ্রতি ৫০-৬০ টাকা। রাস্তা সরু হওয়ায় মাইক্রোবাস নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও বড় বাস নিয়ে যাওয়া যাবে না।

কোথায় থাকবেন
গান্ধী আশ্রম এলাকায় থাকার কোনো সুব্যবস্থা না থাকলেও জামালপুর শহরে অনেক সুন্দর সুন্দর আবাসিক হোটেল রয়েছে। আবাসিক হোটেলগুলোতে স্বল্প খরচে রাত্রি যাপনের সুযোগ রয়েছে। গান্ধী আশ্রম এলাকায় ছোট ছোট রেস্তোরা পাবেন, সেখানে খুব কমমূল্যে খাবার খেতে পারবেন। এছাড়াও জামালপুর শহরে হোটেল, সম্রাট, তাজ হোটেল নামক কয়েকটি রেস্তোরা সহ অনেক ফাস্টফুডের দোকান আছে, যেখানে আপনি জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী খাবার পাবেন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে