মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা যুগিয়েছিল সেই ‘বজ্রকণ্ঠ’

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৫ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ২ ১৪২৮,   ০২ রমজান ১৪৪২

মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা যুগিয়েছিল সেই ‘বজ্রকণ্ঠ’

ফিচার প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫৭ ৭ মার্চ ২০২১  

রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ৭ মার্চের ভাষণটি এখন বিশ্ব স্বীকৃত। ছবি: সংগৃহীত

রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ৭ মার্চের ভাষণটি এখন বিশ্ব স্বীকৃত। ছবি: সংগৃহীত

‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠের সেই ১৮ মিনিটের ভাষণ বাঙালির পরাধীনতার শিকল ভাঙার প্রেরণা যুগিয়েছিল। বিকেল ২টা ৪৫ মিনিট থেকে ৩টা ৩ মিনিট পর্যন্ত বক্তৃতা করেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি খেয়াল করে শুনলে বোঝা যায়, এর প্রতিটি বাক্যই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এটি পূর্বলিখিত বক্তব্য ছিল না। কারোর ধারণাও ছিল না, ভাষণে কী বলা হতে পারে। তবে স্বাধীনতার ঘোষণা আসতে পারে, এমন আভাস অনেকে পেয়েছিলেন।

২৫ মার্চের গণহত্যার পর তাই আপামর বাঙালি যুদ্ধে নাম লিখিয়েছিলেন। কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, তাঁতি, জেলে, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ তাদের অধিকার আদায়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হায়নাদের বিরুদ্ধে। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা পেলাম একটি স্বাধীন দেশ।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা। সেদিন বঙ্গবন্ধুর ডাকেই রাতারাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিকামী সাড়ে সাত কোটি বঙ্গসন্তান। একাত্তরের অগ্নিঝরা ৭ মার্চ দিনটি বাঙালি জাতির জীবনে গর্বের ও গৌরবের। তাই যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন তার এ ভাষণ মানুষের মণিকোঠায় থাকবে।

শুধু বাঙালির জন্যই নয়, এই ভাষণ বিশ্ব স্বীকৃত। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবরে ইউনেস্কো ৭ মার্চের ভাষণকে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ (বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই ভাষণটিসহ মোট ৭৭ টি গুরুত্বপুর্ণ নথিকে একইসঙ্গে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ইংরেজিসহ মোট ১২ টি ভাষায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি অনুবাদ করা হয়। 

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা অবিভক্ত ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান সিরাজ। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচরদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শাহজাহান সিরাজ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের রাজসাক্ষী। সেদিন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত উত্তাল জনতার আবেগ-অনুভূতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন।  

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে আমরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভা ডাকি। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় আমাদের অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেন। একইসঙ্গে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানান। আমরা ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক জনসভার প্রস্তুতি নিতে থাকি। এদিন ছিল রোববার। বাঙালি জাতীর জীবনে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। পূর্বনির্ধারিত এ জনসভায় ভোর না হতেই সারা দেশ থেকে লাখ লাখ লোক রেসকোর্সের উদ্দেশে ঢাকা আসতে থাকে। 

বাঙালি জাতি সেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। মুক্তিকামী মানুষ তাদের নেতার মুখে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা শোনার জন্য এসেছিলেন। দেশের সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে করণীয় কী, তা জানতে অধীর আগ্রহে ছিলেন মুক্তিকামী জনতা। তাদের দেহ ভঙ্গিমা দেখে মনে হয়েছিল তারা ঘর থেকে বের হয়েছে দেশ স্বাধীন করে বাড়ি ফিরবেন- এমন প্রত্যাশা নিয়ে। তাদের মুখে নানা ধরনের স্বাধীনতার পক্ষের স্লোগান। এক হাতে গাঢ় সবুজ জমিনের মধ্যখানে লাল সূর্য এবং তার মধ্যখানে সোনালি মানচিত্রখচিত পতাকা এবং অন্য হাতে বাঁশের লাঠি। 

বঙ্গবন্ধুর সভাস্থলে আসতে দেরি হল। তিনি বিকাল ৩টা ১০ মিনিটে ১০ লাখের বেশি জনতার সম্মুখে ঐতিহাসিক সভামঞ্চে উঠলেন। তখন উত্তাল জনতার মুহুর্মুহু স্লোগানে ঢাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে যায়। সর্বকালের সর্ববৃহৎ এই জনসভায় বঙ্গবন্ধু ১৯ মিনিটের ভাষণ দিলেন। সেই ভাষণে সারা দেশের মানুষের জন্য একটা সুনির্দিষ্ট বার্তা তিনি দিলেন। ঐতিহাসিক এ ভাষণটি দীর্ঘ না হলে সবদিক থেকেই তা ছিল পরিপূর্ণ।

ওইদিন তিনি তার বক্তৃতায় ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান এবং যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- তার এই বক্তৃতার মধ্য দিয়ে বোঝা গিয়েছিল মুক্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধে এ ভাষণ প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন এ ভাষণ মানুষের মনের মণিকোঠায় থাকবে। এই ভাষণ, এই দেশ, এই ভাষা, বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির গর্বের এবং অহংকারের জায়গা।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে