সপ্তম শ্রেণি পাস, তবুও দিয়ে যান কুপি জ্বালিয়ে জ্ঞানের আলো ‘পুঁথিদাদু’

ঢাকা, শনিবার   ১৭ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ৪ ১৪২৮,   ০৪ রমজান ১৪৪২

সপ্তম শ্রেণি পাস, তবুও দিয়ে যান কুপি জ্বালিয়ে জ্ঞানের আলো ‘পুঁথিদাদু’

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৩৫ ৪ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৮:৫৩ ৪ মার্চ ২০২১

ছবি: পুঁথি দাদু

ছবি: পুঁথি দাদু

নাম তার গুরুচরণ গড়াই। তবে সে নাম ছাপিয়ে এখন নাম হয়ে গেছেন পুঁথিদাদু। নিজে স্কুলের গণ্ডি পার করেননি তিনি। অথচ পড়ান কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের। জ্ঞান যে প্রথাগত শিক্ষার ধার ধারে না, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ যেন এই মানুষটা। অবশ্য এ নামে তাকে এলাকার মানুষ চেনে না।

কেউ বলেন পুঁথিদাদু, কেউ বলেন চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া। আর নিন্দুকেরা তো বই পাগলও বলে। তিনি মাত্র সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। অভাব-অনটনের কারণে স্কুল শিক্ষায় সাফল্য পাননি। তবে জ্ঞান অর্জন যে প্রথাগত শিক্ষার ধার ধারে না তার জ্বলন্ত উদাহরণ গুরুচরণ গড়াই। 

পুরুলিয়ার বাগমুন্ডি থানার বুড়দা গ্রামের সকলেই পুঁথিদাদুকে চেনেন এক ডাকে। অবশ্য তার কারণও আছে। সাহিত্য, দর্শন, ব্যাকরণ কিংবা সাধারণ জ্ঞান সমস্ত কিছুর সমাধান পুঁথিদাদু ও তার লাইব্রেরি। সপ্তম শ্রেণি পাস করেন তিনি। গুরুচরণ গড়াই পেশায় কৃষক। এই পুঁথিদাদুর কাছে পড়তে আসেন স্নাতক থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তরের পড়ুয়ারা।

ডিগ্রী না থাকলেও পড়ুয়াদের সমস্যার সমাধান করতে তার জ্ঞানের ভাণ্ডার সর্বদা উন্মুক্ত। নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তিনি গড়ে তুলেছেন একটি গ্রন্থাগার। যার নাম ‘চৈতন্য গ্রন্থাগার’। এখানে বই রয়েছে এক হাজারেরও বেশি। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এখানে পড়তে আসেন বহু পড়ুয়া। তাদের সাহায্যও করেন এই পুঁথিদাদু। কোন বইয়ের কত নম্বর পাতায় কী লেখা রয়েছে তা তার মস্তিষ্কে ছবির মতো আঁকা। 

নিজে টিউশনি করান এবং সেখান থেকে যা অর্থ পান সবটা ব্যয় করেন গ্রন্থাগারের পেছনে। জানা যায়, মাত্র ১১ বছর বয়সে মারা যান তার বাবা। সেই থেকে সংসারের হাল ধরেন তিনি। তার সেই জীবনসংগ্রাম এখনো জারি রয়েছে। তবে তার বই পড়ার ইচ্ছা কখনো যায়নি। বই পড়ার ইচ্ছার জেরেই অন্যের কাছ থেকে বই চেয়ে এনে পড়তেন তিনি। পরে চাষাবাদ করে ধান বিক্রির সেই টাকায় কিনতেন বই।

অর্থাভাবে হতদরিদ্র গুরুচরণ গড়াইয়ের স্কুল যাওয়া বন্ধ হওয়ার তিন বছর পর থেকেই অল্প অল্প করে নিজের বাড়িতে গড়ে তোলেন গ্রন্থাগার। সালটা তখন ১৯৫৩। পুঁথিদাদুর সাহিত্যচর্চাও কম ছিল না। তিনি লিখে গেছেন অনেক কবিতা, গল্প। কোরক নামে একটি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে তার। তবে তার এই আগ্রহ পরিবারের সহযোগিতা যে ভীষণভাবে ছিল সেটা স্বীকার করে নেন পুঁথিদাদু। 

অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন কাটানো এই মানুষটিকে নিয়ে গর্বের শেষ নেই এলাকাবাসীর। বুড়দা গ্রামের সাধারণ মানুষ অকপটে স্বীকার করে নেন পুঁথিদাদু ও তার গ্রন্থাগার না থাকলে এত দ্রুত এলাকায় শিক্ষার প্রসার ঘটতো না। এলাকায় এমন কোনো মানুষ নেই যিনি বৃদ্ধ এই মানুষটির সাহায্য নেননি পড়াশোনা। অবশ্য এলাকায় শিক্ষার প্রসার ঘটানো সারা শরীরে দৈন্যতার ছাপ মেখে আধ ময়লা ধুতি পরিহিত এই মানুষটি মেতে রয়েছেন এক বিশাল সাধনায়।

অন্ধকার নামলেই লাইব্রেরিতে জ্বলে ওঠে কুপি। কালো অক্ষরে ডুবে যান ‘পুঁথিদাদু’। তার না পাওয়ার কোনো ক্ষোভ নেই। অন্ধকার লাইব্রেরিতে বসে বললেন, ‘কিছু না পাই। জ্ঞানের আলো তো ছড়িয়ে দিতে পেরেছি।’

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ