বিলুপ্তির পথে থাকা আরেকটি সম্পদ ‘লজ্জাবতী বানর’

ঢাকা, শনিবার   ১০ এপ্রিল ২০২১,   চৈত্র ২৮ ১৪২৭,   ২৬ শা'বান ১৪৪২

বিলুপ্তির পথে থাকা আরেকটি সম্পদ ‘লজ্জাবতী বানর’

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:২৫ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১২:৩৫ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ছবি: লজ্জাবতী বানর

ছবি: লজ্জাবতী বানর

বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ বানর আর উল্লুক প্রজাতির প্রাণীই এখন বিলুপ্তির পথে। এমনটাই জানাচ্ছেন প্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা আইইউসিএন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ জন্য বনাঞ্চল উজাড় আর ব্যাপক হারে পশু শিকারই দায়ী। বিপন্ন এসব প্রাণীর একটি রেড লিস্টও তৈরি করেছেন তারা। তালিকায় দেখা গেছে, শিম্পাঞ্জি, ওরাং-ওটাং, বানর এবং লেমুরের মতো ৬৩৪ প্রজাতির প্রাণীর ৪৮ শতাংশের অস্তিত্বই এখন ঝুঁকির মুখে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে লজ্জাবতী বানর। 

বাংলায় লজ্জাবতী বানর বা লাজুক বানরও বলা হয়। এর ইংরেজি নাম হল বেঙ্গল স্লো লরিস। এ প্রাণীটা কর্ডাটা পর্বের ম্যামালিয়া শ্রেণীর প্রাইমেটস বর্গের অন্তর্ভুক্ত। এর বৈজ্ঞানিক নাম হলো- নেকটিসিবাস বেংগালিনসিস। এই লজ্জাবতী বানরটি আইইউসিএন এ লাংল তালিকায় সঙ্কটাপন্ন হিসেবে যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ প্রাণীটি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রজাতির বানরকে আর পৃথিবীতে পাওয়া যাবে না।

মায়ের সঙ্গে আদর-সোহাগে মেতে আছে লজ্জাবতী বানরলজ্জাবতী বানর বাংলাদেশের সবুজ বনে পাওয়া যায়। এরা গাছের সবচেয়ে উঁচু শাখায় থাকতে ভালোবাসে। লজ্জাবতী বানর বিভিন্ন আকারের হয়। সবচেয়ে ছোটটি হলো বর্ণিল লজ্জাবতী বানর। ওজন ১০ আউন্স। সবচেয়ে বড়টি আমাদের দেশেই পাওয়া যায়। এদের দেহ ৩৩ সেন্টিমিটার লম্বা, ওজন প্রায় ১.২ থেকে ২ কেজি। এ লাজুক বানরটিকে জামালপুর জেলার গারো পাহাড়ের জঙ্গলসহ দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্ব বনাঞ্চলে দেখা যায়। তবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বেশি দেখা যায়। দেহ হালকা বাদামি লাল হলুদ থেকে ধূসর রঙের ছোট ছোট নরম পশম দ্বারা আবৃত থাকে। 

মাথা গোলাকৃতির। পেঁচার মতো চোখের গঠন। লেজটা তুলনামূলক খাটো। সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা। মাথা থেকে পিঠ পর্যন্ত লম্বা বাদামি দাগ দেখা যায়। এরা একটু ধীরগতির প্রাণী। তবে প্রয়োজনে দ্রুত বেগে কোনো কিছু বেয়ে ওঠার ক্ষমতা আছে এদের। লজ্জাবতী বানর একা একা বসবাস করতে পছন্দ করে। উঁচু শাখাকে শক্ত করে ধরে রাখতে এদের জুড়ি নেই। এরা খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে আর্থ্রোপোডা পর্বে সন্ধিপদি প্রাণী যেমন- তেলাপোকা, পাখির ডিম, গাছের মুকুল, ফল, গাছের আঠা, কষ, ছোট পাখি, পাতা ইত্যাদি। এরা অন্য বানরের মতো হাত দিয়ে খায় না। মুখ লাগিয়ে খায়।

এদের চোখ পেঁচার মতোএবং হাত পায়ের আঙুলগুলো মানুষের মতোলজ্জাবতী বানর নামকরণের পেছনে একটি কারণ রয়েছে। মূলত এরা দিনের বেলায় দুই পায়ের মাঝখানে মাথা গুঁজিয়ে দুই হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে বসে থাকে। এ কারণে অনেকে একে মুখচোরা বানরও বলে। শামুকের মতো কুণ্ডলী পেকে থাকে বলে এদের শামুক বানরও বলে। এরা কখনো কখনো গাছের উঁচু ডালে পা আটকিয়ে দিয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে। দিনের বেলায় খুব একটা এরা বের হয় না। নিজেকে একটু আড়াল করে রাখতেই পছন্দ করে এরা। তাই নিশাচর প্রাণীর তালিকায় ধরা হয় এদের। বাংলাদেশে একমাত্র নিশাচর প্রাইমেট এটি। দিনের বেলায় গভীর জঙ্গলে শামুকের মতো পেঁচিয়ে বসে থাকে।

এরা গাছের ডালগুলো এমন ভাবে ধরে থাকে যা কেউ ছাড়াতে পারেনা নিশাচর হওয়ার কারণে এদের দৃষ্টিশক্তি প্রখর। এরা নিজেদের চোখকে ছোট বড় করতে পারে। ঘ্রাণশক্তিও বেশি। এটি শিকার ধরতে সাহায্য করে। এদের হাত পায়ের আঙুলগুলো মানুষের মতো। তাই এই আঙুলের সাহায্যে ডালের সঙ্গে শক্ত করে ঝুলে থাকে। সহজে এদের ডাল থেকে ছাড়িয়ে আনা যায় না। তবে সিলেট অঞ্চলের আদিবাসী লোকজন যেমন টিপরা ও খাসিয়ারা এই লজ্জাবতী বানর ধরতে খুব অভিজ্ঞ।

আত্মরক্ষার জন্য এই বানরের শরীরে বিষথলি রয়েছে। যার সাহায্যে এরা শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। এদের আয়ু সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছর। মেয়ে লজ্জাবতী বানর বছরে একবার কিংবা দু’বার একটি করে বাচ্চা দেয়। খাদ্যের সঙ্কট, শিকার এবং বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় এদের সংখ্যা হুমকির মুখে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ