অন্ধ ও বধিরদের নিয়ে গড়ে ওঠা বিশ্বের প্রথম থিয়েটার 

ঢাকা, রোববার   ০৭ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ২৩ ১৪২৭,   ২২ রজব ১৪৪২

অন্ধ ও বধিরদের নিয়ে গড়ে ওঠা বিশ্বের প্রথম থিয়েটার 

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:২৩ ২৮ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৮:৩৪ ২৮ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: অন্ধ ও বধিরদের থিয়েটার

ছবি: অন্ধ ও বধিরদের থিয়েটার

নাটক বা থিয়েটার হলো এমন এক বিনোদনের মাধ্যম যা সাধারণত ভিসুয়াল আর্ট হিসেবেই পরিগণিত হয়। তবে বিশ্বে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাদের নিজস্ব অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার বিভিন্ন ইন্দ্রিয়গুলোর অভাব রয়েছে। বহু মানুষ রয়েছেন যাদের দৃষ্টি কিংবা গলার স্বর নেই। তবে তাদেরও এই সমাজকে অনেক কিছু কথা বলার রয়েছে। 

ইসরায়েলের জাফা বন্দরে এমনই এক থিয়েটার প্রতিষ্ঠান আছে, যার সমস্ত সদস্য অন্ধ এবং বোবা। তার নাম নালাগ’আত। এই নালাগ’আতটি হলো একটি হিব্রু শব্দ যার অর্থ ছোঁয়া। বিশ্বের ইতিহাসে এটাই প্রথম প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটি সদস্য দৃষ্টিহীন এবং বোবা। এই প্রতিষ্ঠানটি ২০০২ সালে গড়ে ওঠে। আদিনা তাল ও ইরান গূড় এই সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা।

এভাবেই থিয়েটারের সদস্যরা একে অপরের হাত ধরে অনুষ্ঠান শুরু করতো এই সংস্থার প্রযোজিত নাটকের বিশেষত্ব হলো, যখন স্টেজের আলো কমে আসে, সিটে বসে থাকা দর্শকরা অপেক্ষা করেন নাটক কখন শুরু হবে, ঠিক তখনই নালাগ’আতের সদস্যরা একে অপরের হাত ধরে,পরস্পরকে বন্ধুর ছলে ঘুষি মেরে নাটক শুরু করেন। থার্ড বেল পড়লেই দর্শকের চোখের সামনে গোটা পৃথিবী একটা হুডিনির ম্যাজিক হয়ে যায় তখন।

সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ, ছোঁয়া, মূকাভিনয়ের মাধ্যমে এই সংস্থার সদস্যরা নিজেদের সামাজিক অক্ষমতাকে পেরিয়ে দর্শকদের সামনে নিজেদের বেড়ে ওঠার স্বপ্ন। জীবনবোধক উপস্থাপিত করেন অভিনয়ের মাধ্যমে। থিয়েটার গ্রুপের পাশাপাশি নালাগ’আত প্রতিষ্ঠানের দুটো ক্যাফেও রয়েছে। একটির নাম ক্যাফে কাপিশ, যার সমস্ত কর্মীরা বধির্‌। আর অন্যটির নাম ব্ল্যাকআউট। এর সমস্ত কর্মীরা অন্ধ।

অন্ধ ও বধিরদের নিয়ে অনুষ্ঠান এই ক্যাফেতে আসা প্রতিটি মানুষের মোবাইলে আগে থেকে মেন্যু পাঠিয়ে দেয়া হয়, পরে তারা টেবিলে রাখা ছোট একটা ঘন্টা বাজিয়ে ওয়েটারদের ডাকেন। এই সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আদিনা তাল তার একটি ইন্টারভিউয়ে বলেছিলেন তিনি অন্ধ এবং বধির মানুষদের নিয়ে কাজ করতে যথেষ্ট ভীত ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না সদস্যদের সঙ্গে ঠিক কীভাবে যোগাযোগ করবেন। 

পরে তিনি সদস্যদের সঙ্গে বসেন। পরস্পরের হাঁটুতে মেরে বা হাত চেপে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের একটি উপায় খুঁজে পান। আদিনা তাল আরো বলেন,'যেহেতু প্রত্যেক সদস্য অন্ধ এবং বধির, তাই এরা পরস্পরের অভিনয় কখনো অনুকরণ করতে পারবে না। এটা একটা সুবিধের বিষয়।'

অন্ধ ও বধিরদের থিয়েটার প্রচুর ওয়ার্কশপের পর নালাগাতের প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল যার নাম ' লাইট ইজ হার্ড ইন জিগ জ্যাগ'। এই নাটকটি কানাডার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জেনেভার ইউনাইটেড নেশনের হেডকোয়ার্টারে। এছাড়াও নিউ ইয়র্ক, বোস্টন, ওয়াশিংটনের বিভিন্ন থিয়েটার ফেস্টিভালের পক্ষ থেকে নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য নালাগ’আতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। 

২০০৭ সাল থেকে নালাগ’আত প্রথম দর্শকদের সামনে নাট্যাভিনয় শুরু করে। তাদের দ্বিতীয় নাটক 'নট বাই ব্রেড অ্যালন' বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। নালাগ’আতের উদ্দেশ্য হল সামাজিকভাবে অক্ষম মানুষদের সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের বন্ধনকে আরো দৃঢ় করা। তাদের সুরক্ষিত কাজের জায়গা দেয়া।

থিয়েটারের সবাই একসঙ্গে গান করছেন বাতসেভা রভেনসেরি নামক নালাগ’আত এর এক সদস্য জানান,'নালাগ’আত এ আসার আগে আমার গোটা জীবনটা অন্ধকার ছিল। আমি জন্মগতভাবেই অন্ধ। তবে এখানে আসার পর আমি এখানে আসে একটা নতুন উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছি। সাধারণত আমাদের মতো মানুষদের সমাজের থেকে সাহায্য চাইতে হয়। তবে এখানে ব্যাপারটা উল্টো। 

কাপিশ ক্যাফেতে এসে মানুষজন আমাদের থেকে সাহায্য নেয়। সমাজের বিভিন্ন পরতে এমন অক্ষমতা রয়েছে যা মুছে ফেলার কোনো মাধ্যম নেই। ক্রমশ নাটকের অবস্থান সমাজ থেকে সংকুচিত হয়ে আসছে। শহরের বুকে গড়ে উঠছে একের পর এক শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ