কাজ নেই, গৃহকর্মী সন্ধ্যা-মালতি-শ্যামলীরা এখন যৌনকর্মী

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৩ আগস্ট ২০২১,   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৮,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

কাজ নেই, গৃহকর্মী সন্ধ্যা-মালতি-শ্যামলীরা এখন যৌনকর্মী

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৫১ ১৮ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৮:০১ ১৮ ডিসেম্বর ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

লকডাউনের আগে সন্ধ্যা গৃহকর্মী ছিলেন। মহামারির কারণে তার কাজ বন্ধ হয়েছে। এখন উপায়? বেশ কয়েক মাস বেকার থাকার পর পেটের ক্ষুধা মেটাতে অবশেষে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন সন্ধ্যা। তার বয়স ৩০ এর কোঠায়। বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর।

সন্ধ্যার স্বামী পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে গত দু’বছর ধরে শয্যাশায়ী। তার কথায়, প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। দুটি সন্তানও রয়েছে তার। তিনি জানান, আগে কলকাতায় পরিচারিকার কাজ করতে যেতাম। সকালে যাওয়া, রাতে ফেরা। 

আরো পড়ুন: দিন-রাত পাপ কর্মে ডুবে আছে কুখ্যাত এক দ্বীপ

তবে করোনার সময় আমাকে সে সব বাড়ি থেকে যেতে বারণ করে দিল। আমার জন্য করোনা হতে পারে তাদের। তারপর তো ট্রেন-বাসই বন্ধ হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত কোনো কাজ না পাওয়ায় আমার এক দিদি এই কাজে নামার কথা বলে। সংসার চালানোর জন্য আমিও রাজি হয়ে যাই।

যৌন পেশায় নেমেছেন তারা বাধ্য হয়েসন্ধ্যার মতোই আরেক নারী হলেন মালতি সর্দার। তার বয়স ৩৬। বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলি। আগে বানতলার একটি চামড়ার কারখানায় কাজ করতেন। লকডাউনের সময় কাজে যেতে পারছিলেন না। সে কাজ টেকেনি। অনেক কাজ খুঁজে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে শেষমেষ যৌনকর্মী পেশা বেছে নেন।

হুগলি নদীর পানিতে সূর্য ডুবলেই ডায়মন্ড হারবারের ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক বা নদীর ধারে ভিড় করেন এ রকম সন্ধ্যা, মালতির মতো আরও অনেকে। তারা কেউ কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিলেন পরিচারিকা, কেউ বা শ্রমিক, কেউ আবার সবজি ব্যবসায়ী। 

আরো পড়ুন: ‘অন্তর্বাস’ খুলে ঢুকতে হয় যে গ্রামে

জেটি ঘাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ধরে সড়কের দু’ধারে রোজ সন্ধ্যাতেই দেখা মেলে তাদের। প্রসাধনের মোড়কে নিজেদের ঢেকে তারা দাঁড়িয়ে থাকেন রাস্তায়। মহামারি করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকা স্বত্ত্বেও বাধ্য হয়ে রোজগারের আশায় এই পেশায় ভিড় বাড়ছে রোজ। স্থানীয় সমাজকর্মীদের একাংশের এমনটাই দাবি।

রাত হলেই শুরু হয় তাদের কাজলকডাউনের সময় কাজ হারানোর পর এই পেশাকেই সম্বল করেছেন অনেকে। তবে এখানেও রোজগারে টান পড়ায় দিশেহারা যৌনকর্মীদের অনেকেই এখন সরকারি সাহায্যের দাবি তুলছেন। সন্ধ্যা যেমন বলছিলেন, ভারত সরকার যদি কোনো রকম একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে উপকার হত। এখানে তেমন রোজগার নেই। আর ভয়ও করে। যদি কিছু হয়ে যায়!

ডায়মন্ড হারবারের মহকুমাশাসক সুকান্ত সাহা যদিও বলছেন, করোনা পরিস্থিতিতে যৌনকর্মীদের জন্য প্রতিটি ব্লক ও পুরসভা এলাকায় বিভিন্ন কাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বনির্ভর প্রকল্পেও তাদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সন্ধ্যা-মালতিরা যদিও সেসব কাজের সন্ধান পাননি এখনো।

যৌনপল্লী বাদ দিয়ে ডায়মন্ড হারবারে যৌনকর্মীর সংখ্যা কত, তার কোনো পরিসংখ্যান প্রশাসনের কাছে নেই। নেই সমাজকর্মীদের কাছেও। স্থানীয় সমাজকর্মী স্বপ্না মিদ্যা যেমন বললেন, যৌনপল্লীর একটা হিসাব আমাদের কাছে আছে। 

রোজগারের আশায় এ পথে নামেন নারীরাতবে এই পেশার অনেকেই এখন রাস্তার ধারে দাঁড়ান। তাদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে জানা নেই। কারণ বেশিরভাগই নিজেদের পরিচয় গোপন করে রাখেন। তবুও আমাদের অনুমান, এই মুহূর্তে সংখ্যাটা ১০০-র উপরে তো হবেই।

সংখ্যাটা যে ধীরে ধীরে বাড়ছে তাও মেনে নিয়েছেন স্বপ্না। তার মতে, দু’বেলা খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্যই অসহায় নারীরা এই পথ বেছে নিচ্ছেন। তবে সমাজে একাজের কোনো মর্যাদা নেই। পুলিশও মানবিকভাবে দেখে না এই পেশাকে। 

করোনাকালে নিজের শরীর নিয়ে চিন্তা নেই? ভয় পেলে যে পরিবার, সংসার চলবে কীভাবে? সন্ধ্যা বলেন, রোগে মরার চেয়ে না খেতে পেয়ে মরা অনেক বেশি কষ্টের। করোনার ভয় নেই আমাদের। ভয় পেয়ে কী লাভ! ভয় দিয়ে তো আর পেট ভরবে না। সাহায্যের হাত এগিয়ে এলে এ পথে নামতেই হত না।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/টিআরএইচ