গাছকে কাপড় পরিয়ে রহস্যময়ভাবে ছবি তোলেন এই ফটোগ্রাফার

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ১৪ ১৪২৭,   ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

গাছকে কাপড় পরিয়ে রহস্যময়ভাবে ছবি তোলেন এই ফটোগ্রাফার

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:২৫ ২৪ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৬:৪৬ ২৪ নভেম্বর ২০২০

ছবি: রিতার তোলা একটি ছবি

ছবি: রিতার তোলা একটি ছবি

ফটোগ্রাফি কারো নেশা, কারো বা পেশা। ছবিয়াল বা ফটোগ্রাফার, এক অতি পরিচিত নাম। কেউ শখ করে ছবি তোলে কেউবা পেশা হিসেবেই বেছে নিয়েছে এই কাজকে। মোবাইল থেকে শুরু করে দামী ডিএসএলআর ক্যামেরা, মাধ্যম যেটাই হোক কম বেশি ছবি সবাই তোলে।

সভ্যতার উৎকর্ষে যে কয়টি শিল্প মাধ্যম তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে ফটোগ্রাফি ধরে রেখেছে তার স্বতন্ত্র অবস্থান। ফরাসি উদ্ভাবক জোসেফ নিসেফোর নিপেক প্রথম ছবিটি তোলেন ১৮২৭ সালে। তাকেই বলা হয় ফটোগ্রাফির জনক। বিশ্বের সব ছবিয়ালদের সম্মান জানাতে বিশ্ব  ১৯ আগস্ট আলোকচিত্র দিবস উদযাপিত হয়ে থাকে।

রিতা পাইভাইলাইন একেকটি ছবি ফ্রেমবন্দি করতে তাদের নিতে হত জীবনের ঝুঁকি। অনেক সময় ছবি তুলতে গিয়ে অনেকে বিপন্ন করেছেন নিজের জীবনটাকেই। বিশেষ করে যারা বন্যপ্রাণী বা দুঃসাহসিক ছবিগুলো তোলেন। তবে বিশ্বে কিছু ফটোগ্রাফার আছেন। যারা নিজেদেরকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন খানিকটা ভিন্নভাবে। এজন্য বেছে নিয়েছেন নানা পন্থা।

রিতার তোলা ছবি এমনই একজন রিতা পাইভাইলাইনে। ফিনল্যান্ডের দক্ষিণে একটি জঙ্গল রিতা পাইভাইলাইনেনের জন্য রহস্য ও প্রেরণার উৎস। আলোকচিত্রী হিসেবে তার নিজের অতীতের সঙ্গে রহস্যময় ছবিগুলো কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে রয়েছে। নিজের অনুভূতির বর্ণনা দিতে গিয়ে রিতা বলেন, এই জঙ্গলে ঢুকলে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে, জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর সেই অনুভূতি ফিরে আসে। জঙ্গল যেন আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল।

গাছকে এভাবেই জামাকাপড় পরান রিতানিজের তোলা ছবির মাধ্যমে রিতা সেই আবেগ ফুটিয়ে তুলতে চান। শিল্পীর কাছে যেমন রং প্রধান অনুষঙ্গ, তেমনই রিতার সৃষ্টিকর্মের উপকরণ পুরনো জামা-কাপড়। ছবি তুলতে তিনি এমন সব ম্যাচিং কাপড় খোঁজেন, যেগুলো নিসর্গের সঙ্গেও খাপ খেয়ে যায়। তাই ছবি তোলার সময় সেই রঙের কাপড়গুলো বেছে নেন তিনি। যাতে করে শৈশবের স্মৃতি পুরোপুরি মন্থন করতে পারেন। 

এজন্য রিতা ব্যবহৃত পোশাক ব্যবহার করেন অনেক সময় জঙ্গলে ঘুরতে গেলে আপনার মনে হবে গাছের আড়াল থেকে কেউ বুঝি আপনাকে দেখছে। কিংবা অনেক মানুষ একসঙ্গে ঘোরাফেরা করছে। মূলত এই ধরনের চিত্রই রিতা তুলে ধরেন তার ক্যামেরায়। আর সেট তৈরি করতে ব্যবহার করেন পোশাক, নাইটি, জ্যাকেট, রেইনকোট। এছাড়াও থান কাপড়ও ব্যবহার করেন মাঝে মাঝে। যখন পছন্দ মতো কাপড় খুঁজে পান না তখন নিজেই তৈরি করে নেন পোশাক।

থান কাপড় দিয়ে একেকটি আকৃতি তৈরি করেন তিনি রিতা শুধু পেছনের পটভূমিতে জামাকাপড় রাখেন, তা কিন্তু নয়, অন্য একটি মাত্রা থাকতেই হবে তার ছবিতে। তা হচ্ছে আবেগ। রিতা তার ছবির জন্য বেশিরভাগ সময়ে ব্যবহৃত জামাকাপড় ব্যবহার করেন, কারণ সেগুলোর মধ্যে আগের মালিকের কাহিনী লুকিয়ে রয়েছে। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রিতা বলেন, আমি চিরকালই সেকেন্ড-হ্যান্ড জামাকাপড় এবং মানুষের দৈনন্দিন ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহী ছিলাম। সেই জামাকাপড়ের নেপথ্য ইতিহাস আমাকে অত্যন্ত নাড়া দেয়। কে সেটির মালিক ছিল, তার জীবন কেমন ছিল, তা জানতে ইচ্ছা করত।

যেন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পথচারীকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে তারা জাপানে তোলা একটি ছবিতে জঙ্গলে ঐতিহাসিক সামুরাই যোদ্ধাদের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছিলেন রিতা। ফিনল্যান্ডের সংস্কৃতি তহবিল থেকে রিতা-র প্রকল্পগুলো সহায়তা পেয়ে আসছে বেশ অনেক বছর ধরে। সে কারণেই তিনি নিজের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে ইউরোপ, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পেরেছেন। সমান্তরাল নামের প্রকল্পের আওতায় তিনি জঙ্গলে আরো একটি মোটিফ সাজিয়েছেন। সেটা হচ্ছে ধরুন কেউ জঙ্গলের রাস্তা ধরে যাচ্ছেন, তখন জঙ্গলের কিছু আদিবাসী আপনাকে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। 

একটি মেয়ে পানির ধারে দাঁড়িয়ে আছে ছবি তুলতে রিতা অ্যানালগ ক্যামেরার মাধ্যমে বড় ফরম্যাটে ছবি তোলেন। ফলে অনেক বেশি রেজোলিউশন পাওয়া যায়। তার মতে, ছবিতে জাদুময় কোনো উপাদান ঢোকানো সবচেয়ে কঠিন কাজ। সেটা হাসিল করাটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রিতার ছবিগুলো যেন প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হবার বাসনার সঙ্গে অন্য কোনো জগতে প্রাণের সন্ধানের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটায়।

জঙ্গলের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর উপরে তৈরি করেছেন কাল্পনিক ব্রিজ আর এভাবেই ছোটবেলায় জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর এবং সেই সময়কার স্মৃতি ছবির ফ্রেমে তুলে ধরছেন। বলা যায়, শৈশবের স্মৃতিগুলোকে জাগিয়ে রাখার প্রচেষ্টাই করে যাচ্ছেন রিতা। এই কাজে রিতাকে বিভিন্ন জঙ্গলে ঘুরতে হয়। ফ্রেম ঠিক করতে হয়। তারপর কি ধরনের ছবি তুলবেন কিংবা ছবির সাবজেক্ট ঠিক রেখে জায়গা বাছাই, কাপড় কেনা, সে অনেক লম্বা সময়ের ব্যাপার। সবকিছুই রিতা করেন একা হাতে। এজন্য দিনের পর দিন একাই জঙ্গলে কাটিয়ে দেন তিনি। সঙ্গে থাকে নিত্য সঙ্গী ক্যামেরা, সেলাই মেশিন আর অন্যান্য কিছু জিনিসপত্র। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে/জেএমএস